১৩৫০ সালের ২৭ নভেম্বর,
বাংলার সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ নেপালের তরাই অঞ্চলে এক দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন। ইতঃপূর্বে কোনো মুসলিম বাহিনী, কোন বাংলার শাসক, বাংলার অধিবাসী এ অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে নি। তিনি রাজধানী কাঠমুন্ডু পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং বিপুল ধনসম্পদ নিয়ে ফিরে আসেন।
নেপাল রাজ বংশাবলিতে পূর্ব দেশীয় সুলতান শামসুদ্দীনের নেপাল আক্রমণের উল্লেখ আছে ।
কাঠমণ্ডুর নিকটস্থ স্বয়ম্ভুনাথের মন্দিরে প্রাপ্ত শিলালিপিতে এই আক্রমণের প্রমান পাওয়া যায় এবং এই লিপিতে আক্রমণের তারিখ ৪৭০ নেওয়ারী সম্বৎ (১৩৫০খৃষ্টাব্দ) বলে উল্লিখিত আছে ।
মধ্যযুগের বাংলার সুলতানদের মধ্যে সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ এক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। তিনি শুধুমাত্র ইলিয়াস শাহী বংশেরই প্রতিষ্ঠাতা নন, তিনি বাঙালী জাতীয়তাবাদেরও জনক। তিনিই প্রথম বাঙ্গালি জাতিকে বাঙ্গালি হিসেবে পরিচিত করেন। তিনি উড়িষ্যা ও নেপাল এলাকার ত্রিহুত পর্যন্ত বাংলার সীমানায় অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর প্রভাব কাশী-বেনারস পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তিনিই প্রথম ‘‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’’ উপাধি ধারন করেন। তিনিই প্রথম শাসক যিনি বাংলা নামক বর্তমান যে অঞ্চলগুলোকে বোঝানো হয় সেসব অঞ্চলকে সর্বপ্রথম ভৌগলিকভাবে একীভূত করার কৃতিত্বের দাবীদার। এর আগে বাংলার বিভিন্ন এলাকা বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল, যেমন গৌড়, রাঢ়, পুন্ড্রবর্ধণ, সমতট ইত্যাদি। তাদের শাসন ব্যবস্থাও ছিল আলাদা আলাদা। তিনি ১৩৪২ সাল থেকে ১৩৫৮ সাল পর্যন্ত রাজত্বকালে উড়িষ্যা, নেপাল এবং কামরূপ বাংলার সাম্রাজ্যভুক্ত করে এতদাঞ্চলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এ সম্মিলিত রাজ্যের নামকরণ করেন বাঙ্গালাহ এবং এর অধিবাসীদের বাঙালী নামে অভিহিত করেন।
ইলিয়াস শাহ পূর্ব পারস্যের সিজিস্তানের অধিবাসী ছিলেন। তার পিতার নাম ছিল সুলতান। প্রাথমিক জীবনে তিনি দিল্লীর মালিক ফিরোজের অধীনে চাকরী করতেন। কিন্তু সেখানে কোন এক অপরাধ করে তিনি বাংলায় পালিয়ে আসেন এবং সাতগাঁও এর শাসক ইজ্জুদ্দীন ইয়াহইয়ার অধীনে চাকরী নেন। নিজ যোগ্যতাবলে তিনি মালিক পদে উন্নীত হন। পরবর্তীতে ইজ্জুদ্দীনের মৃত্যুর পরে তিনি ১৩৩৮ সালে সাতগাঁওয়ের অধীশ্বর হন। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ইলিয়াস শাহ ১৩৪২ সনে বাংলার ক্ষমতায় আরোহণ করেন। বাংলার রাজধানী তিনি লক্ষণাবতী (গৌড়) থেকে পান্ডুয়ায় সরিয়ে নেন। পান্ডুয়ার অবস্থান ছিল গৌড়ের ৩২ কিলোমিটার উত্তরে। তারপর থেকে পান্ডুয়া একটি গুরুত্বপূর্ন নগর হিসেবে গড়ে ওঠে। পান্ডুয়ার বর্তমান অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায়।
তিনি যখন সিংহাসনে বসেন তখন দিল্লীতে তুঘলক বংশের ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসন চলতেছিল। গিয়াসউদ্দীন তুঘলক বাংলাকে তিন ভাগে ভাগ করেছিলেন যেমন– (ক) লক্ষ্মণাবতী; (খ) সাতগাঁও বা সপ্তগ্রাম; (গ) সোনারগাঁও। এই তিন প্রদেশের রাজধানীও ছিল আলাদা এবং শাসনকর্তা ছিলেন তিনজন। এরা ছিলেন দিল্লির অধিনস্ত এবং এই তিনজন শাসনকর্তার মধ্যে বিরোধ অব্যাহত ছিল। সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ এই সুযোগটি গ্রহন করলেন। তিনি ১৩৫২ সালে ইখতিয়ারউদ্দীন গাজী শাহকে পরাজিত করে সোনারগাও দখল করেন। এরূপে তিনি সমগ্র বাংলা অঞ্চলের অধিপতি হন। বাংলার তিনটি প্রদেশ জয় করে বাংলাকে একীভূত করে ‘শাহ–ই–বাঙ্গালিয়ান’ উপাধি গ্রহন করলেন। বাংলার ইতিহাসে বাংলা এই প্রথম ‘বাঙ্গলা’ নামে পরিচিত হল। এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা সন্দেহ নেই। কেননা, এর আগে বাংলা প্রাচীন কাল থেকে গৌড়, পুন্ড্র, বঙ্গ এসব জনপদে বিভক্ত ছিল।
এর পূর্বে ১৩৪৪ সালে ত্রিহুত ও ১৩৫০ সালে নেপাল অভিযান করেন। বাংলা অঞ্চলকে একীভূত করার সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে তিনি জাজনগর (উড়িষ্যা) আক্রমন করেন। অতঃপর ইলিয়াস শাহ ১৩৫৩ সালে বিহার আক্রমন করেন। বিহারের পরেও তিনি তাঁর কর্তৃত্ব চম্পারন, গোরখপূর, ও বেনারস পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। রাজত্বের শেষদিকে ১৩৫৭ সালে তিনি কামরূপ দখল করেন।
ইলিয়াস শাহ তাঁর সাম্রাজ্য সম্প্রসারন করতে গিয়ে দিল্লীর শাসক ফিরোজ শাহ তুঘলকের বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন, ফিরোজ শাহ তাকে দমন করার জন্য বাংলা অভিযান করলে অভিজ্ঞ কূটনীতিকের মত সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করে তাঁর দিল্লীর আক্রমন মোকাবিলা করেছেন। সাহসী যোদ্ধা ইলিয়াস শাহ সফল সামরিক গুনের অধিকারী ছিলেন। তিনি বাংলা ও বাংলার বাইরে তাঁর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কৃতিত্বপূর্ন বিজয় অর্জন করেন।
সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ শুধুমাত্র বাংলা অঞ্চলকে একীভূত করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি এতদাঞ্চলে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হন এবং বাংলার স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে জনসমর্থন লাভে প্রয়সী হন। স্থানীয় জনগনকে উদারভাবে সুযোগ সুবিধা দিয়ে শাসনব্যাবস্থাকে গনশাসনে রূপ দেন। তিনিই সর্বপ্রথম স্থানীয় জনগনকে অধিক সংখ্যায় সামরিক বাহিনীতে চাকরীর সুযোগ দেন।
বাঙালী জাতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনিই সর্বপ্রথম লক্ষ্মণাবতী, সাতগাঁও বা সপ্তগ্রাম এবং সোনারগাঁও এই তিন অঞ্চলে বিভক্ত বাংলাকে একত্রিত করে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষাভাষীদের মাঝে জাতীয়তাবাদের চেতনা জাগ্রত করেন।
জিয়াউদ্দীন বারানীই হলেন প্রথম মুসলিম ঐতিহাসিক যিনি ইকলিম-ই-বাঙ্গালাহ অথবা দিয়ার-ই-বাঙ্গালাহ (যার দ্বারা তিনি বাংলাকে বুঝিয়েছেন) শব্দগুলি ব্যবহার করেন। ইলিয়াস শাহ কর্তৃক লখনৌতি,সাতগাঁও এবং সোনারগাঁও একত্রিত হওয়ার পর শামস-ই-সিরাজ ইলিয়াস শাহকে ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’, ‘সুলতান-ই-বাঙ্গালাহ’ এবং ‘শাহ-ই-বাঙালিয়ান’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ইলিয়াস শাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন সালতানাত প্রায় দুশ বছর টিকে ছিল এবং এ সময় বাঙ্গালাহ নামের বহুল পরিচিতি ঘটে। এ অঞ্চলে মুগলদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মুগলগণ বাঙ্গালাহকে মুগল সাম্রাজ্যে একটি সুবাহ (প্রদেশ) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং এ প্রদেশ সুবাহ-ই-বাঙ্গালাহ নামে পরিচিতি লাভ করে। এ নামই পর্তুগিজ বিবরণে বেঙ্গালা রূপে দেখা যায়। ইংরেজরা বেঙ্গলাকে বেঙ্গল বলে অভিহিত করেন। এভাবে দেখা যায় যে, চৌদ্দ শতক থেকেই বাঙ্গালাহ নামের পরিচিতি ঘটে এবং এ অঞ্চল বলতে বর্তমানের বাংলাদেশ ও ভারতীয় পশ্চিম বাংলা প্রদেশের অন্তর্গত প্রায় সব ভূভাগকেই বোঝায়।
তথ্যসূত্র:
১। ভারতবর্ষের ইতিহাস-কোকো আন্তোনোভা,
২। শাসসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ ও বাঙালীজাতিয়তাবাদ-সানাউল্লাহ সামি,
৩। তারিখ-ই-ফিরোজশাহী-জিয়াউদ্দিন বারানী,
৪। বাংলার ইতিহাস-সুলতানি আমল-আবদুল করিম
৫। বাংলার ইতিহাসের দুশো বছর-শ্রীসুখময় মুখোপাধ্যায়
কলমেঃ শেখ নজরুল
ইতিহাসের নানা জানা-অজানা তথ্যাবলি জানতে ও জানাতে যুক্ত হতে পারেন আমাদের পেজ ইতিহাস অন্বেষণ এ।

