মুসলিমরা দক্ষিন এশিয়া শাসন করেছে ৮০০ বছরেরও অধিক। কিন্তু একমাত্র বাংলা ছাড়া এর আশেপাশে আর কোথাও মুসলিম মেজরিটি নেই। ১৮৮১ সালের গননায় ধরা পরে বাংলা মুসলিম মেজরিটি। বাংলায় ৯৯% ই ধর্মান্তরিত মুসলিম, যাদের পুর্ব পুরুষ এক সময় হিন্দু বা বৌদ্ধ ছিলো। কারোর মনে কি আসে না সারা ভারতের এতোগুলো রাজ্যের মধ্যে বাংলা কিভাবে মুসলিম মেজরিটি হল? কি ছিলো সে একটা আসল ফ্যাক্টর যার জন্য হিন্দু বাংলা মুসলিম বাংলায় রুপান্তর হলো?
.
এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে একজন ব্যাক্তি। রাজা গণেশের পুত্র যদু তথা জালালউদ্দিন মুহাম্মাদ শাহ। রাজা গনেশ ছিলো হিন্দু জমিদার। সুলতান গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের শাসন আমলে সে অনেক প্রতাপশালী হয়ে উঠে এবং ছলচাতুরির মাধ্যমে সুলতানকে হত্যা করে ক্ষমতা নেয়। তার শাসনামলে মুসলিম সুফি ও আলেমদের প্রভাব ক্ষুণ্ণ হতে থাকে। গনেশ ধর্মীয় বিদ্দেষ এর কারনে বহু মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকাহ ভেংগে দেয়। অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে বাংলার বিখ্যাত সুফি সাধক নূর কুতুবুল আলম তখন জৌনপুরের সুলতান ইব্রাহিম শর্কীকে বাংলা আক্রমণের আমন্ত্রণ জানান। এই চরম সংকটের মুহূর্তে রাজা গণেশ আপস করতে বাধ্য হন। সুফি সাধক শর্ত দেন গনেশকে মুসলিম হতে হবে। গনেশ বলে এই বুড়ো বয়সে সে পাপ করতে পারবে না। তখন গনেশ তার পুত্র যদুকে জোর করে মুসলিম বানায় এবং পাপেট হিসাবে ক্ষমতায় বসায়। ইব্রাহিম শার্কি চলে গেলে গনেশ আবার ক্ষমতা নিয়ে আগের রুপে আসে এবং আবারও মুসলিমদের উপর অত্যাচার শুরু করে।
.
যদুকে আবারও হিন্দু বানানোর জন্য সে স্বর্নের গরুর মুর্তি বানিয়ে যজ্ঞ করে। কিন্তু এইবার যদু বেকে বসে। সে হিন্দু হতে অস্বীকার করলে গনেশ যদুকে জেলে ঢুকিয়ে রাখে। বলা হয় বাংলায় অরাজের সুযোগে শক্তিশালি আমর্ত্যদের সাহায্যে যদু তার পিতার মৃত্যু হলে বাংলার ক্ষমতা নিজের আয়ত্বে নেয়। সে জালাল উদ্দিন মুহাম্মাদ শাহ নাম দিয়ে তার ১৭ বছরের ঐতিহাসিক বাংলা শাসনের শুরু করে। বাংলার সুলতানদের মধ্যে তিনিই প্রথম মক্কা ও মদীনায় অর্থ প্রেরণ করে সেখানকার খলিফার স্বীকৃতি আদায় করেছিলেন। পিতা যত মসজিদ ভেঙ্গেছিল , তিনি তার দ্বিগুন মসজিদ তৈরি করেন।
প্রাচীন প্রবাদ রয়েছে, "যথা রাজা, তথা প্রজা"। রাজা গণেশের মতো প্রতাপশালী হিন্দু রাজার ছেলের স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ তৎকালীন হিন্দু সমাজে বিশাল মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ফেলেছিল। ইতিহাসবিদদের মতে, রাজার পদাঙ্ক অনুসরণ করে সেসময় বহু উচ্চপদস্থ হিন্দু রাজকর্মকর্তা এবং সাধারণ মানুষ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য, সামাজিক মর্যাদা লাভ এবং বর্ণপ্রথার প্রভাব থেকে মুক্ত হতে এই সময়ে ব্যাপক ধর্মান্তরের ঘটনা ঘটে। জালালউদ্দিন কেবল ধর্ম পরিবর্তনই করেননি, তিনি বাংলার স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে ইসলামী প্রশাসনের এক চমৎকার মেলবন্ধন ঘটিয়েছিলেন। তিনি ফার্সি ও আরবি ভাষার পাশাপাশি স্থানীয় বাংলা ভাষারও পৃষ্ঠপোষকতা করেন। তার এই স্থানীয়করণের নীতির কারণে সাধারণ হিন্দু-বৌদ্ধ কৃষক ও মজুর শ্রেণি মুসলিম শাসনকে নিজেদের শাসন বলে মেনে নেয়, যা সামাজিক স্তরে ইসলামের প্রসারকে আরও দ্রুত ও সহজ করে দেয়।
.
ব্রিটিশ ঐতিহাসিক জেমস ওয়াইজ তার এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বেংগল (১৮৯৪) বই তে উল্লেখ করেন "তার শাসনে বাংলায় যত মানুষ মুসলিম হয়, তা পরবর্তী ৩০০ বছরের চাইতেও বেশী" । গোটা দক্ষিন এশিয়াতে একমাত্র মুসলিম বাংলার পেছনে তার অবদান আছে।
.
Collected






