Search This Blog

Monday, June 1, 2026

ইতিহাস না জেনেই ভারত বিরোধীতা করবেন না

ইতিহাস না জেনেই ভারত বিরোধীতা করবেন না.. আমাদের কে কিভাবে বাঁশ দিসে 

১. যুদ্ধ শেষে প্রায় দুইশো ওয়াগন রেলগাড়ী ভর্তি করে ২৭০০ কোটি টাকার অস্ত্রসস্ত্র লুটের অভিযোগ ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার।
(সূত্রঃ দৈনিক অমৃতবাজার, ১২ মে,১৯৭৪)
২. শস্য লুটঃ
★ধান-চাল-গম (৭০-৮০ লাখ টন, গড়ে ১০০ টাকা ধরে): ২১৬০ কোটি টাকা। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।
★পাট(৫০ লাখ বেলের উপরে): ৪০০ কোটি টাকা। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার।
★ত্রাণ-সামগ্রী পাচার: ১৫০০ কোটি টাকা। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার।
★যুদ্ধাস্ত্র, ঔষধ, মাছ, গরু, বনজ সম্পদ: ১০০০ কোটি টাকা। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার।
সর্বমোট: ৫০০০ কোটি টাকা যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার।
(সূত্র: জনতার মুখপাত্র, ১ নভেম্বর ১৯৭৫)
৩.বাংলাদেশের শিল্প কারখানা থেকে যন্ত্রাংশ চুরি করে আগরতলায় পাঁচটি নতুন পাটকল স্থাপন! (সূত্রঃ আখতারুল আলম, দু:শাসনের ১৩৩৮ রজনী, পৃষ্ঠা: ১১৫-১১৬)
৪.যুদ্ধের পর সীমান্তের ১০ মাইল এলাকা ট্রেডের জন্য উম্মুক্ত ঘোষনা। এর ফলে চোরাচালানের মুক্ত এলাকা গড়ে উঠে। পাচার হয়ে যায় দেশের সম্পদ।
( সূত্রঃ আবুল মনসুর আহমদ: আমার দেখা রাজনীতির ৫০ বছর, পৃষ্ঠা: ৪৯৮)
৫.ভারতে বাংলাদেশী জাল টাকা ছেপে এদেশে ছেড়ে দেয়া হত। অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ সে সময় বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘জালনোট আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস করিয়া দিয়াছে’।
(সূত্রঃ আব্দুর রহিম আজাদ: ৭১ এর গণহত্যার নায়ক কে: পৃষ্ঠা: ৫২)
৬.আমাদের চোখের সামনে চাল-পাট পাচার হয়ে গেছে সীমান্তের ওপারে, আর বাংলার অসহায় মানুষ ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বিশ্বের দ্বারে দ্বারে। (মেজর অব. রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম: :দুঃশাসনের ১৩৩৮ রজনী, পৃষ্ঠা: ১১৯-১২৬)
৭.১৯৭১ এর অবাঙ্গালীদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তির হরিলুট (সূত্রঃ এম এ মোহায়মেন: বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামীলীগ, পৃষ্ঠা ১৪, ৪৪)
৮. ফারাক্কা বাধের নামে মরুভূমি করার চক্রান্ত, টাকা বিনিময়ের নামে জাল টাকা ছড়ানো, বর্ডার বানিজ্যের নামে ভারতের বস্তাপঁচা মালের বাজার সৃষ্টি।
(সূত্রঃ আখতারুল আলম, দু:শাসনের ১৩৩৮ রজনী, পৃষ্ঠা: ১১৫-১১৬)
৯.জয়দেবপুর অর্ডিনেন্স ফ্যাক্টরী থেকে অস্ত্র নির্মানের কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ভারতে স্থানান্তরিত হয়। (অলি আহাদ: জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ‘৭৫, পৃ:৫২৮-৫৩১)
১০.❝ ঢাকায় এতসব বিদেশী জিনিস পাওয়া যায়! এসব তো আগে  দেখেনি ভারতীয়রা। রেফ্রিজারেটর, টিভি, টু-ইন-ওয়ান, কার্পেট, টিনের খাবার-এইসব ভর্তি হতে লাগলো ভারতীয় সৈন্যদের ট্রাকে। ❞ — সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পূর্ব-পশ্চিম, পৃ: ৯২৩
এই তথ্যগুলো মোটামুটিভাবে সবার জানা আছে।  
ভবিষ্যতে কেউ ভারতের এই অবদান, ওই অবদান বললে এই তথ্যগুলা দেখিয়ে দেবেন রেফারেন্স সহ। 
তারপরও আবার উল্লেখ করার কারন খুব চিন্তা হয়.... ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের  সময়ে ভারত দ্বারা লুট করে নিয়ে যাওয়া এই সম্পদ রক্ষা করতে যেয়েই, অস্ত্র জমা না দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশ বিদ্রোহ করেছিল,  তার ফলাফল কথিত আছে , ৩০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা নিহত বা গুম হয়েছিল। 
এখন স্বাধীনতা তথা পুরো দেশটাই লুট করতে চাচ্ছে,  কত রক্ত ঝরবে  ???

Wednesday, May 6, 2026

সিংহের মত এক দিন বাঁচা শেয়ালের মত একশ বছর বাঁচার চেয়ে শ্রেয়”— টিপু সুলতান


“সিংহের মত এক দিন বাঁচা শেয়ালের মত একশ বছর বাঁচার চেয়ে শ্রেয়”— টিপু সুলতান

আজ ৪মে ঠিক এই দিনে, ১৭৯৯ সালে চতুর্থ ইঙ্গ-মহীশূর যুদ্ধে বীরের মতো যুদ্ধ করতে করতেই শাহাদাত বরণ করেন টিপু সুলতান। ইতিহাসে “মহীশূরের বাঘ” নামে পরিচিত এই মহান শাসক শুধু একজন যোদ্ধাই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন এক দূরদর্শী রাষ্ট্রনায়ক, সংস্কারক এবং উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের এক অনন্য প্রতীক।

টিপু সুলতানের প্রকৃত নাম ছিল ফতেহ আলী খান। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৭৫০ সালে দক্ষিণ ভারতের মহীশূর রাজ্যে। তাঁর পিতা হায়দার আলী ছিলেন মহীশূরের শক্তিশালী শাসক এবং একজন দক্ষ সামরিক নেতা। শৈশব থেকেই টিপু সুলতান যুদ্ধকৌশল, প্রশাসন ও কূটনীতির শিক্ষা লাভ করেন। পিতার সান্নিধ্যে থেকে তিনি অল্প বয়সেই যুদ্ধক্ষেত্রে অংশগ্রহণ করতে শুরু করেন এবং দ্রুতই নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন। ১৭৮২ সালে হায়দার আলীর মৃত্যুর পর তিনি মহীশূরের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং শাসনভার গ্রহণ করেন।

শাসক হিসেবে টিপু সুলতান ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ়চেতা ও প্রগতিশীল। তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্রমবর্ধমান আধিপত্যকে ভারতের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখতেন এবং তাদের বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম চালিয়ে যান। তাঁর শাসনামলে মহীশূর একটি শক্তিশালী ও সংগঠিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তিনি প্রশাসনিক সংস্কার, রাজস্বব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সামরিক শক্তি বৃদ্ধিতে বিশেষ মনোযোগ দেন।

টিপু সুলতানের অন্যতম বড় অবদান ছিল সামরিক প্রযুক্তিতে নবতর উদ্ভাবন। তিনি লোহার নলযুক্ত রকেট অস্ত্রের উন্নত ব্যবহার করেন, যা সে সময়ের জন্য ছিল অত্যন্ত আধুনিক। এই রকেট প্রযুক্তি ব্রিটিশদের বিস্মিত করে এবং পরবর্তীতে তারা এই প্রযুক্তি অনুসরণ করে ইউরোপে নতুন ধরনের রকেট উদ্ভাবন করে। যুদ্ধক্ষেত্রে তাঁর কৌশল, সাহসিকতা এবং নেতৃত্বগুণ তাকে ব্রিটিশদের অন্যতম ভয়ংকর প্রতিপক্ষে পরিণত করে।

তাঁর জীবনের সঙ্গে “বাঘ” প্রতীকটি বিশেষভাবে জড়িত। কথিত আছে, একবার শিকারের সময় তিনি খালি হাতে একটি বাঘের সঙ্গে লড়াই করে তাকে হত্যা করেন, এরপর থেকেই তিনি “শের-ই মহীশুর" তথা মহীশূরের বাঘ উপাধিতে ভূষিত হন। তাঁর সিংহাসন, রাজকীয় পোশাক, অস্ত্র এবং সামরিক পতাকায় বাঘের প্রতীক ব্যবহৃত হতো, যা তাঁর সাহস ও শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও টিপু সুলতান ছিলেন সক্রিয়। তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জোট গঠনের উদ্দেশ্যে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট-এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। যদিও সেই জোট বাস্তবায়িত হয়নি, তবুও এটি তাঁর দূরদর্শিতা ও কৌশলগত চিন্তাভাবনার প্রমাণ বহন করে।

অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও তিনি উল্লেখযোগ্য সংস্কার সাধন করেন। তিনি রাষ্ট্রীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা, নতুন ক্যালেন্ডার প্রবর্তন, রেশম শিল্পের উন্নয়ন এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনামলে মহীশূর অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হয়।

টিপু সুলতান নিজেকে মুসলিম বিশ্বের একজন গুরুত্বপূর্ণ শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন এবং সে সময়ে উসমানীয় খলিফা ৩য় সেলিমের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন। এই প্রচেষ্টার মূল উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সমর্থন ও বৈধতা অর্জন করা।
তিনি ওসমানীয় দরবারে দূত পাঠান এবং চিঠির মাধ্যমে নিজের সালতানাতকে স্বীকৃতি দেওয়ার অনুরোধ করেন। পাশাপাশি তিনি আশা করেছিলেন যে, খলিফার সমর্থন পেলে ভারতের মুসলিমদের মধ্যে তাঁর প্রভাব আরও বাড়বে এবং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, উসমানীয় সুলতান টিপুর প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং তাকে সম্মানজনকভাবে গ্রহণ করেন। তবে বাস্তবিক সামরিক সহায়তা বা জোট গঠন তেমন কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়নি, কারণ সে সময় উসমানীয় সাম্রাজ্য নিজেই ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল।

১৭৯৯ সালে শ্রীরঙ্গপত্তনম-এ সংঘটিত যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার ফলে মহীশূরের পতন ঘটে। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত টিপু সুলতান যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই করেন এবং বীরের মতো শহীদ হন। তাঁর এই শাহাদাত তাঁকে ইতিহাসে অমর করে রেখেছে।

#searchinghistory
#muslimhistory 
#TipuSultan

Saturday, May 2, 2026

ইতিহাস কি তবে আমাদের ভুল শেখাচ্ছে? বাংলাদেশের আজকের অবকাঠামো কি পাকিস্তান আমলেরই দান?

ইতিহাস কি তবে আমাদের ভুল শেখাচ্ছে?
বাংলাদেশের আজকের অবকাঠামো কি পাকিস্তান আমলেরই দান?

‎ব্রিটিশ ২০০ বছর শাসন আমলে পূর্ব বাংলায় মাত্র একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল "ঢাকা বিশ্বিবদ্যালয়। সেটিরও বিরোধিতা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কলকাতার প্রভাবশালী মহল।
‎ব্রিটিশরা প্রায় ২০০ বছরে পূর্ব বাংলায় কোনো উন্নয়ন করেনি। যদি কিছু করার উদ্যোগও নেওয়া হতো, সেগুলোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াত কলকাতার দাদা-বাবুরা। কলকাতাকে তারা ভারতের রাজধানী বানিয়েছিল।
‎বাংলাদেশের ইতিহাসে আমাদের শেখানো হয় যে পাকিস্তান ২৪ বছর আমাদের শোষণ করেছে। অথচ বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন গুলো পাকিস্তান আমলেই হয়েছিল। 
‎ পাকিস্তান আমলে মোট ৫ টি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে।
‎◾রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৫৩)
‎◾চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৬)
‎◾জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭০)
‎◾জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৬৮)
‎◾পূর্ব পাকিস্তান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাংলাদেশ কৃষি বিঃ) (১৯৬১)
‎▶ পাকিস্তান আমলে মোট ৪ টি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়েছে।
‎◾বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ১৯৬২ সাল
‎◾রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) ১৯৬৪ সাল
‎◾চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) ১৯৬৮ সাল
‎◾খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) ১৯৬৯ সাল
‎উল্লেখ্য বর্তমানে বাংলাদেশে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় আছে মোট ৫ টা, যার মধ্যে ৪ টাই পাকিস্তান আমলের। আর পরবর্তী ৫০ বছরে হয়েছে ১ টা। 
‎ ▶পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সরকার মোট ৮৭ টি কলেজ প্রতিষ্ঠা করে৷ যার মধ্যে রয়েছে 
‎◾নটর ডেম কলেজ, ঢাকা (১৯৪৯)
‎◾সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ (১৯৪৯)
‎◾বাঙলা কলেজ (১৯৬২)
‎◾ভিকারুননিসা নুন স্কুল ও কলেজ
‎উল্লেখ্য বর্তমানে ঢাকা শহরে মোট ৩৯ টি কলেজ আছে, যার ভেতর ৮ টি তৈরি হয়েছে ইংরেজ আমলে, ২১ তৈরি হয়েছে পাকিস্তান আমলে, আর মাত্র ১০ টি তৈরি হয়েছে স্বাধীনতার পর ৫০ বছরে। 
‎▶ পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সরকার ৮ টা সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। 
‎◾চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (১৯৫৭)
‎◾রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (১৯৫৮)
‎◾ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ (১৯৬২)
‎◾সিলেট এম.এ.জি. ওসমানী মেডিকেল কলেজ (১৯৬২)
‎◾স্যার সলিমুলস্নাহ মেডিকেল কলেজ (১৯৬৩)
‎◾স্নাতকোত্তর চিকিৎসা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বর্তমান নামঃ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়) (১৯৬৬)
‎◾শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (১৯৬৮)
‎◾রংপুর মেডিকেল কলেজ (১৯৭০)
‎উল্লেখ্য ইংরেজ শাসন আমলের ২০০ বছরে মোট ১টি মেডিকেল তৈরি হয়েছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ৷ 
‎ঢাকা মেডিকেল কলেজ ১৯৪৭ সালের আগে প্রতিষ্ঠিত হলেও পাকিস্তান আমলে এর কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়। 
‎▶পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সরকার ১৭ টি পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট প্রতিষ্ঠা করে। বর্তমানে বাংলাদেশে ৪৯টি সরকারী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট রয়েছে। অর্থাৎ পাকিস্তান সরকার ২৪ বছরে করেছে ১৭ টি। আর বাংলাদেশ সরকার ৫০ বছরে করেছে ৩২টি৷ 
‎▶ পাকিস্তান আমলে পাকিস্তান সরকার ৪ টি ক্যাডেট কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। 
‎◾ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ(১৯৫৮)
‎◾মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ(১৯৬৩)
‎◾ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ ( ১৯৬৩)
‎◾রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ (১৯৬৫)
‎উল্লেখ্য বর্তমানে বাংলাদেশে ক্যাডেট কলেজ আছে ১২ টা এর ভেতর ৪ টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পাকিস্তান আমলে। 
‎▶ চট্টগ্রাম মেরিন একাডেমী, নৌ অফিসার, মেরিন ইঞ্জিনিয়ার গড়ে তোলার জন্য ১৯৬২ সালে পাকিস্তান নৌবাহিনী কর্তিক এই একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এর নাম "বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি (BMA)" 
‎▶ এছাড়াও প্রতিষ্ঠা হয়েছে.... 
‎◾ইস্ট পাকিস্তান টেক্সটাইল ইন্সটিটিউট’ (১৯৫০) যার বর্তমান নাম "বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় (বুটেক্স)"। 
‎◾ চট্টগ্রাম কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ১৯৬২ সালে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলাদেশে কারিগরি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়।
‎◾এরকম আরো অনেক বিশেষায়িত কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট, নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পাকিস্তান আমলে। এছাড়া দেশ ব্যাপি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কয়েক হাজার প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং হাই স্কুল। 
‎★অনেকেই অভিযোগ করেন পশ্চিম পাকিস্তানের চেয়ে পুর্ব পাকিস্তান পিছিয়ে ছিলো, কারন পূর্ব পাকিস্তানে কম উন্নয়ন করা হয়েছে। লক্ষ করুন, ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মাত্র ১ টা, বিপরিতে পাকিস্তানে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল ১৮ টা। অর্থাৎ পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র সৃষ্টির আগ থেকেই আমরা উচ্চ শিক্ষার দিক দিয়ে পাকিস্তানের চেয়ে ১৮ গুন পিছিয়ে ছিলাম আমরা!
‎১৯৪৭ সালের পরবর্তী ১০ বছরে পুর্ব পাকিস্তানে যদি ১০ টা বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করা হতো আর পশ্চিম পাকিস্তানে যদি একটাও তৈরি করা না হতো, তবুও তো আমরা পাকিস্তানের চেয়ে পিছিয়েই থাকতাম। আসলে ব্রিটিশ আমল থেকেই আমরা পাকিস্তানের তুলনায় এত বেশি পিছিয়ে ছিলাম, যার ফলে এই অঞ্চল কখনোই পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে উন্নয়নের দৌড়ে খাপ খাওয়াতে পারেনি।
‎★ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির আগে এই অঞ্চলের স্বাক্ষরতার হার ছিলো মাত্র ১২%। ১৯৬১ সালের আদমশুমারিতে স্বাক্ষরতার হার দাড়ায় ২৪.৭%। অর্থাৎ মাত্র ১৩ বছরে এই অঞ্চলের স্বাক্ষরতার হার দ্বীগুন হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালের আদমশুমারী না হওয়ায় পাকিস্তান আমলের প্রকৃত স্বাক্ষরতার হার জানা যায়নি।
‎▶শিল্প প্রতিষ্ঠান, মিল ও কল-কারখানা
‎◾ বাংলাদেশ সচিবালয় ( ১৯৭১ সালের পর এ সচিবালয়ের পুরাতন ৬ নং ভবনটি ভেঙ্গে ২০ তলা ভবন তৈরী করা হয়)
‎◾ পাকিস্তানের সেকেন্ড ক্যাপিটাল হিসাবে শেরেবাংলা নগর কে পরিকল্পিতভাবে তৈরী
‎◾ সংসদ ভবন
‎◾ বাইতুল মোকাররম মসজিদ 
‎◾ বাংলা একাডেমি 
‎◾ ইসলামিক একাডেমি (বর্তমান ইসলামিক ফাউন্ডেশন) 
‎◾ রাজশাহী, চট্টগ্রাম, খুলনা, রংপুর, সিলেট বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা
‎◾ কমলাপুর রেলস্টেশন (পূর্বতন রেলস্টেশন টি ছিলো গুলিস্তান-ফুলবারিয়ায়)
‎◾ মীরপুর চিড়িয়াখানা 
‎◾ কুর্মিটোলা বিমানবন্দর (ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর)
‎◾ যমুনা সেতু (১৯৬৬ সনে সংসদে অনুমোদিত) 
‎◾ রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ( ১৯৬১ সালে এর পরিকল্পনা গ্রহন করে তখনকার পূর্বপাকিস্তানের অনেক কর্মকর্তাকে বিদেশে প্রশিক্ষনে প্রেরণ করা হয়, যারা এখন ইরান ইরাকে কর্মরত। ১৯৭২ সালে প্রকল্পটি বন্ধ করে দেয়া হয়)
‎◾ শাহজীবাজার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র
‎◾ আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র 
‎◾ কর্ণফুলী বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র 
‎◾ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল 
‎◾ গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্প
‎◾ রামপুরা টেলিভিশন ভবন
‎◾ ঢাকা স্টেডিয়াম
‎◾ ঢাকা যাদুঘর (বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আবাসিক ভবন)
‎◾ WAPDA এবং এর অধিনে শতশত বাধ ও সেচ প্রকল্প
‎◾ ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, মিরপুর, গুলশান, বনানী প্রভৃতি আবাসিক এলাকা গঠন ও নগরায়ন 
‎◾ শত শত পাট ও কাপড়ের কল যা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতীয়করণের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়।
‎◾ শিল্পায়নের জন্য গড়ে তোলা হয় East Pakistan Industrial Development Corporation (EPIDC)
‎◾ গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখান
‎◾ গাজীপুর মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি 
‎◾ মংলা সামুদ্রিক বন্দর ( চট্টগ্রাম বন্দরটি মুঘল আমলে তৈরী)
‎◾ঢাকার নিউমার্কেট সহ বিভাগীয় শহরে একটি করে নিউমার্কেট তৈরী
‎◾তেজগাঁও শিল্প এলাকা
‎◾হাজারীবাগ ট্যানারি শিল্প এলাকা
‎◾খালিশপুর শিল্প এলাকা।
‎◾আদমজী জুট মিলস (নারায়ণগঞ্জ): ১৯৫১
‎◾খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলস: ১৯৫৯
‎◾চিটাগং ড্রাই ডক: ১৯৬০
‎◾ ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (চট্টগ্রাম): ১৯৬৮
‎◾ঢাকা জুট মিলস লিমিটেড: ১৯৫০ এর দশক
‎◾ আমিন জুট মিলস লিমিটেড (চট্টগ্রাম): ১৯৫৩
‎◾ খুলনা জুট মিলস: ১৯৫০ এর দশক
‎◾ ইস্পাহানী কটন মিলস: পাকিস্তান আমলে প্রতিষ্ঠিত হয়।
‎◾ কাপ্তাই জল বিদ্যুত - ১৯৬২
‎◾ চন্দ্রঘোনা পেপার মিল - ১৯৫৩
‎◾ কর্ণফূলী রেয়ন মিল – ১৯৫৩
‎◾ প্রগতি ইন্ড্রাস্ট্রিজ – ১৯৫৩
‎◾বাংলাদেশে একটিমাত্র তেল শোধনাগার সেটিও পাকিস্তান করে দিয়েছে।
‎১৯৭১ সালের যুদ্ধের পর পাকিস্তান ঘাস খেয়ে পারমাণবিক বোমা তৈরি করেছে। বর্তমানে পাকিস্তানের কাছে আনুমানিক ১৭০টি পারমাণবিক ওয়ারহেডসহ একটি পারমাণবিক অস্ত্রাগার রয়েছে।
‎তাদের বিমান বাহিনীর আকাশ ছোঁয়া সাফল্যের কারণে দেশটি সৌদি আরবের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বিমান বাহিনীর মধ্যে পাকিস্তান বিমান বাহিনী ১৪৩৪ টি যুদ্ধবিমান ও রনকৌশল নিয়ে সপ্তম স্থানে রয়েছে। যার মেরুদণ্ড হিসেবে আছে আমেরিকান এফ-১৬, জেএফ-১৭ থান্ডার এবং আধুনিক চীনা জে-১০সি।
‎তাদের কাছে আছে শাহীন-৩ (২,৭৫০ কিমি পর্যন্ত পাল্লার), গৌরী এবং গজনভীর মতো একাধিক উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। তাদের কাছে বাবর ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা পারমাণবিক এবং প্রচলিত উভয় ধরনের ওয়ারহেড বহন করতে সক্ষম এবং যা স্থল ও সমুদ্র থেকে উৎক্ষেপণ করা যায়।
‎তাদের সেনাবাহিনীর কাছে ২,৬০০টিরও বেশি প্রধান যুদ্ধ ট্যাঙ্কের একটি বহর রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উন্নত খালিদ, ভিটি-৪ এবং টি-৮০ইউডি ট্যাঙ্ক।
‎দেশটি তার প্রতিরক্ষা খাতকে আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে গিয়েছে। চীনের সাথে যৌথ উদ্যোগে নিজস্ব জঙ্গি বিমান বানিয়েছে। তাদের কাছে বুরাকের মতো উন্নত ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে এবং উইং লুং ড্রোনের জন্য চীনের সাথে সহযোগিতা করে। 
‎তাদের কাছে আটটি সাবমেরিন রয়েছে, উপকূলরেখা এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত করার জন্য নৌবহরে আধুনিক ফ্রিগেট, করভেট এবং দ্রুতগামী মিসাইল বোট রয়েছে।
‎এছাড়াও তাদের কাছে ৩,০০০টিরও বেশি কামান (টানা ও স্ব-চালিত উভয়ই) এবং একাধিক রকেট লঞ্চার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
‎এমনকি পাকিস্তানের ১১ টি বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক মানের স্বীকৃতি পেয়েছে। শিক্ষার মানেও পাকিস্তান অনেক এগিয়ে। সবচেয়ে বড় কথা আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে দেশটি বড় খেল দেখিয়েছে ইরান যুদ্ধ বন্ধ করতে। তারা আন্তর্জাতিক রাজনীতি তে নিজেকে একটা গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে কূটনীতি ও সামরিক পার্সপেক্টিভে। যারা আমেরিকা এবং ইরানকে ও এক টেবিলে বসাতে পারছে। 
‎আর ১৯৭১ সালে বিজয়ী বাংলাদেশের যুদ্ধ করে দাসত্বের সার্টিফিকেট নিয়েছে। তারা বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দিয়ে পৃথিবীর প্রথম চেতনা বোমা বানিয়েছে। যা চীনের হাইড্রোজেন বোমার চেয়েও ভয়ংকর। 
‎ এই পর্যন্ত সংসদের মতো একটা স্থানে চেতনা বড় নাকি আধুনিকতা বড়! এই নিয়ে কয়েকশ অধিবেশন চলছে।আফসোস🙂
‎#কপিপোষ্ট

Friday, May 1, 2026

ফাতেহুল হিন্দ' খ্যাত বীর সুলতান আবুল কাসেম মাহমুদ আল-গজনবি রাহি.। তিনি ছিলেন গজনভি সাম্রাজ্যের সুলতান।



আজ ৩০ এপ্রিল ঠিক এই দিনে, ১০৩০ সালে ইন্তেকাল করেন মুসলিমদের ইতিহাসে 'ফাতেহুল হিন্দ' খ্যাত বীর সুলতান আবুল কাসেম মাহমুদ আল-গজনবি রাহি.। তিনি ছিলেন গজনভি সাম্রাজ্যের সুলতান। তার সাম্রাজ্য মূলত আধুনিক আফগানিস্তান, ইরান এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তার জীবদ্দশায় তিনি ১৭বার ভারতে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ঐতিহাসিক সূত্রে সুলতান মাহমুদকে ইসলামের একজন একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে দেখা যায়। আব্বাসীয় খলিফার আনুগত্য স্বীকার করে তিনি 'ইয়ামিন-উদ-দৌল্লা এবং আমিন-উল-মিল্লাত' উপাধি ধারণ করেছিলেন।

সুলতান মাহমুদ একজন অসাধারণ সামরিক কৌশলবিদ, ইনসাফপরায়ণ ও দক্ষ শাসক ছিলেন। তার সামরিক দক্ষতা এতটাই উন্নত ছিল যে তিনি তার ১৭টি ভারত অভিযানের একটিতেও পরাজিত হননি। তিনি একটি সুসংহত এবং শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে তুর্কি, আরব এবং ভারতীয় সৈন্যদের সমন্বয় ছিল। প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও তিনি যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি জ্ঞানী ও গুণীদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং তার দরবারে বিখ্যাত পণ্ডিত ও কবি যেমন আল-বেরুনী এবং ফেরদৌসী সমাদৃত ছিলেন।

ভারতে প্রেরিত সুলতান মাহমুদ গজনবীর ১৭টি সফল অভিযানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো:

১. ১০০০: খ্রিস্টাব্দ: এসময় সুলতান মাহমুদের প্রথম ভারত অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযানে তিনি খাইবার গিরিপথে অবস্থিত ভারতের সীমান্ত দুর্গ ও কয়েকটি সীমান্ত নগরীর অধিকার করেন।

২. ১০০১ খ্রিষ্টাব্দ: এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল পাঞ্জাবের হিন্দু শাহী শাসক জয়পাল। মাহমুদ পেশোয়ারের কাছে তাকে পরাজিত করেন এবং বিপুল ধনসম্পদ লাভ করেন। জয়পাল বন্দি হন, তবে পরে মুক্তি পান এবং অপমানে আত্মহত্যা করেন।

২. ১০০৪ খ্রিষ্টাব্দ: এই অভিযানে মাহমুদ মুলতান আক্রমণ করেন। সেখানকার শাসক দাউদ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন এবং মাহমুদ প্রচুর কর আদায় করেন।

৩. ১০০৪ খ্রিষ্টাব্দ: মাহমুদ ভাতিন্ডার শাসক বিজয় রায়কে পরাজিত করেন। ভাটিণ্ডার রাজার সাথে মাহমুদের পিতার ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু মাহমুদের আমলে সেই সম্পর্ক ছিন্ন করে বিজয় রায়। ফলস্বরূপ পরাজিত হতে হয় তাকে এবং তিনিও আত্মহত্যা করেন।

৪. ১০০৫ খ্রিস্টাব্দ: তিনি মুলতানের শাসনকর্তা বিদ্রোহী ইসমাইলী শাসক আবুল ফতেহ দাউদকে দমন করেন এবং সাথে সাথে মুলতানও অধিকৃত করেন।

৫. ১০০৭ খ্রিস্টাব্দ: এ সময় সুলতান মাহমুদ সুখপালের বিরুদ্ধে তার পঞ্চম অভিযান পরিচালনা করেন।

৬. ১০০৮ খ্রিষ্টাব্দ: এই অভিযানটি ছিল রাজা আনন্দপালের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। আনন্দপাল কনৌজের প্রতিহার শাসক এবং অন্যান্য ভারতীয় রাজাদের সাথে জোট গঠন করেও মাহমুদের কাছে পরাজিত হন।

৭. ১০০৯ খ্রিষ্টাব্দ: মাহমুদ  নগর কাটের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। তেমন কোন বাধা না পাওয়ায় খুব সহজেই এ শহর জয় করেন এবং বিপুল পরিমাণ গনিমত লাভ করেন।

৮. ১০১০ খ্রিষ্টাব্দ: এসময় সুলতান মাহমুদ মুলতানে আরো একটি অভিযান পরিচালনা করেন। সেখানকার বিদ্রোহী শিয়া মুসলিমদের বিতাড়িত করেন।

৯. ১০১৪ খ্রিষ্টাব্দ: এই অভিযানে মাহমুদ নন্দনা অধিকার করেন এবং ত্রিলোচন পালকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন।

১০. ১০১৪ খ্রিস্টাব্দ: মাহমুদ থানেশ্বর আক্রমণ করেন এবং সেখানকার হিন্দুরা তার বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত তারা পরাজিত হয়।

১১. ১০১৫-১০২১ খ্রিষ্টাব্দ: এই অভিযানে মাহমুদ দুবার কাশ্মীর আক্রমণ করেন, তবে দুর্গম ভূখণ্ড এবং প্রবল প্রতিরোধের কারণে তেমন সুবিধা করতে পারেননি।

১২. ১০১৮-১০১৯ খ্রিষ্টাব্দ: এটি ছিল মাহমুদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযান। তিনি কনৌজ আক্রমণ করেন এবং সেখানকার প্রতিহার শাসক রাজ্যপাল পালিয়ে গেলে কনৌজ সহজেই মাহমুদের হস্তগত হয়। 

১৩. ১০২০-১০২১ খ্রিষ্টাব্দ: এই অভিযানে মাহমুদ বুন্দেলখণ্ডের কালিঞ্জর দুর্গ অবরোধ করেন। চান্দেল্ল শাসক গণ্ড দেব প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের মুহূর্তে সে রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যায়।

১৪. ১০২১-১০২২ খ্রিষ্টাব্দ: মাহমুদ গোয়ালিয়রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। এর ফলে গোয়ালিয়রের রাজা তার বশ্যতা স্বীকার করে।

১৫. ১০২৩ খ্রিস্টাব্দ: গোয়ালিয়রের রাজা সুলতান মাহমুদের বশ্যতা স্বীকার করার পর তিনি ১০২৩ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় হিন্দু রাজা নন্দার বিরুদ্ধে সৈন্যসামন্ত নিয়ে কালিঞ্জর আক্রমণ করেন। এই অভিযানকালে তিনি গোন্ডার বিখ্যাত দুর্গ অবরাধে করেন। কালিঞ্জরের রাজা তখন বার্ষিক কর প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আত্মরক্ষা করেন।

১৬. ১০২৬ খ্রিষ্টাব্দ: এটি ছিল মাহমুদের সবচেয়ে বিখ্যাত অভিযান। তিনি গুজরাটের সোমনাথ মন্দিরে অভিযান পরিচালনা করেন। হিন্দুরা এখানে তীর্থ করতে আসত। মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী ছিল অশ্লীল চিত্র দ্বারা শোভিত। সোমনাথ বিগ্রহের খ্যাতি ছিল সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী এবং কর্মরত ব্রাহ্মণগণ মনে করতেন যে, বিগ্রহসমূহের অলৌকিক ক্ষমতা মাহমুদের আক্রমণ প্রতিরোধে সক্ষম। হিন্দুদের বিশ্বাস যে ভ্রান্তিমূলক ছিল, তা প্রমাণ করার জন্যই সুলতান মাহমুদ সোমনাথ জয় করতে মনস্থ করেছিলেন। ইবনে খালদুন, ফিরিস্তা এবং ডব্লিউ হেগ প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ এই মত সমর্থন করেন।

১৭. ১০২৭ খ্রিষ্টাব্দ: সোমনাথ অভিযানের পর ফেরার পথে মাহমুদ জাঠদের দ্বারা আক্রান্ত হন। এই অভিযানে তিনি জাঠদের পরাজিত করেন।

সুলতান মাহমুদ এর ভারত অভিযানের উদ্দেশ্য–
ধর্মীয় উদ্দেশ্য: পৌত্তলিকতার ধ্বংস সাধন করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সুলতান মাহমুদ ভারতে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ইসলামের এই সুমহান দায়িত্ব পেয়ে মাহমুদ হিন্দুস্তানে ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে ব্রত ছিলেন। ফলস্বরূপ এ সকল অভিযানে কয়েকজন রাজাসহ অসংখ্য হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। তবে তিনি উদার এবং ইনসাফরায়ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, কারও উপর ধর্ম চাপিয়ে দেননি কখনো। যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ ব্যতীত অবৈধ লুটতারাজ তার দ্বারা হয়নি।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: একথা সত্য যে সুলতান মাহমুদ গজনী সম্রাজ্যের বিস্তারে জোর দিয়েছিলেন। গজনিকেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তৃতে রাজ্য দখল তার জন্য অপরিহার্য ছিল। এছাড়াও উপমহাদেশের হিন্দু রাজন্যবর্গ কর্তৃক চুক্তিভঙ্গ, আনুগত্যহীনতা, শত্রুকে সাহায্য দান ও বিশ্বাসঘাতকতা সুলতান মাহমুদকে বারবার অভিযান পরিচালনা করতে বাধ্য করেছে। 

অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য: প্রতিটি অভিযানেই সুলতান মাহমুদ বিপুল পরিমাণ গনিমত অর্জন করতেন। মধ্য এশিয়ার শত্রু দমন করা ও গজনীকে কেন্দ্র করে বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে তোলার জন্য এর সম্পদের প্রয়োজন ছিল।

এত বড় মুসলিম বিজেতা হয়েও সুলতান মাহমুদ কখনো অহংবোধ করেননি। বরঞ্চ আল্লাহর সাথে তার গভীর সম্পর্ক ছিল। তিনি যুদ্ধের নিয়মের বাইরে কখনো শত্রুকে হত্যা করেননি। অসীম সাহসিকতার মাধ্যমে সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছেন। হিন্দুত্ববাদীরা সবসময় সুলতান মাহমুদকে হিংস্র, বর্বর ও ধ্বংসকারী হিসেবে আখ্যায়িত করলেও প্রকৃত ইতিহাসবিদদের কলমে সুলতান মাহমুদ একজন আল্লাহভীরু দ্বীনদার শাসক হিসেবেই অমর হয়ে আছেন, যিনি যুদ্ধের ময়দানেও নফল সালাত আদায় করেছেন এবং যার রাত্রি কেটেছে কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে।

#searchinghistory 
#muslimhistory 
#mahmudgaznavi

Thursday, March 5, 2026

❝ভারতবর্ষে স্বাধীনতার সূর্যোদয় ও একজন বীর হাবিলদার রজব আলী খান❞

❝ভারতবর্ষে স্বাধীনতার সূর্যোদয় ও একজন বীর হাবিলদার রজব আলী খান❞

প্রায় দুশো বছরের ব্রিটিশ বেনিয়াদের শাসন-শোষণ ও পরাধীনতাকে কাটিয়ে ভারতবর্ষে স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু দেশমাতৃকার টানে যারা জীবন দেওয়ার জন্য ছিল সদা প্রস্তুত, তারা এই অসম্ভবতাকে পরোয়া করেনি কখনো। শত সহস্র বিপ্লবীর রক্ত বিলানো আত্মত্যাগের বিনিময়ে অকল্পনীয় স্বাধীনতার স্বাদ আমরা নিতে পারছি। বাংলার দামাল ছেলেরা প্রথম থেকেই ব্রিটিশ বেনিয়াদের বিরোদ্ধে লড়েছে। পথ দেখিয়েছে বিপ্লবের।

আজকে জানবো এমন এক অসম সাহসী বিপ্লবীর কথা। যার নেতৃত্বে চট্টগ্রাম সম্পূর্ণরুপে ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হয়ে পড়ে। টানা ৩০ ঘণ্টা চট্টগ্রামকে ব্রিটিশ মুক্ত রাখতে সক্ষম হন। চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে বঙ্গোপসাগরে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন ব্রিটিশ বেনিয়াশক্তি।

মানুষের অগোচরে থাকা এমন এক সূর্যসন্তান হাবিলদার রজব আলী।
যাকে উৎসর্গ করে বাংলার বিখ্যাত কবি মোহিনী চৌধুরী রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত কালজয়ী কবিতা:
“মুক্তির মন্দির সোপান তলে
কত প্রাণ হল বলিদান
লেখা আছে অশ্রু জলে।”

হাবিলদার রজব আলীর জন্ম নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। 
অনেক ইতিহাস গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, হাবিলদার রজব আলী সন্দ্বীপের আবার, কারো মতে তিনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের হাইদগাঁও কিংবা আরো কয়েকজন গবেষকের মতে লোহাগাড়া এর চক্রশালা চট্টগ্রাম-এর অধিবাসী। তার জন্মসাল, পরিবার, বংশপরিচয় সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না।

হাবিলদার রজব আলী তরুন বয়সে সিপাহী হিশেবে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। বিদ্রোহের আগে ৪ নম্বর কোম্পানির হাবিলদার পদে উত্তীর্ণ হন এই বীর সিপাহি।
কোম্পানির সেনাবাহিনীর ৩৪ নম্বর নেটিভ বেঙ্গল পদাতিক বাহিনীর ১২০ জন হাবিলদার ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে পরহেজগার ও আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি রজব আলী ছিলেন তাদের একজন। ক্যাপ্টেন পিএইচকে ডিউলের অধীনে চট্টগ্রাম পাহাড়তলী সংলগ্ন প্যারেড গ্রাউন্ডের সেনানিবাসে থাকতেন তিনি।

১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ বেনিয়াদের নানাদিক কূটচাল ও স্বদেশী জগৎশেঠ, মীর জাফরদের বিশ্বাসঘাতকতায় অস্ত হয় বাংলার স্বাধীনতার সূর্য। বাংলার আপামর দেশপ্রমী জনতা মর্মন্তুদ,নির্মম ও বেদনাবিধুর এই ঘটনা কখনোই ভুলেনি। তাই তো ১৮৫৭ সালে দেশপ্রেমী সিপাহীরা শুরু করে পরিকল্পিত ভাবে ব্রিটিশ বেনিয়াদের থেকে স্বদেশমুক্তির সশস্ত্র সংগ্রাম। হাবিলদার রজব আলী ৩৪ নং নেটিভ বেঙ্গল পদাতিক বাহনীর বিপ্লবে নেতৃত্ব প্রদান করেন, সাথে ছিলেন আরেক সিপাহী জামাল খান।

১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের প্যারেড ময়দানে হাবিলদার রজব আলী পূর্ববঙ্গে বিপ্লবের সূচনা করেন। দেশপ্রেমে সমুজ্জ্বল প্রায় চারশত সিপাহী রজব আলীর নেতৃত্বে বন্দর নগরীর অস্ত্রাগার এবং কোষাগার দখল করেন। তারা ফেনী নদী অতিক্রম করে সীতাকু- হয়ে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। নোয়াখালী এবং কুমিল্লায় অবস্থানরত কোম্পানির শক্তিশালী বাহিনীকে এড়িয়ে দ্রুত ঢাকায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে রজব আলী ত্রিপুরা রাজ্যের মধ্যদিয়ে জটিল পাহাড়ি পথ বেয়ে ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকেন।
কলকাতার ব্যারাকপুরে ও বহরমপুরের বিদ্রোহ ছিলো বিচ্ছিন্ন। কিন্তু, চট্টগ্রামে সংঘবদ্ধ অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন রজব আলী খাঁন। ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর রাতে বিদ্রোহীরা গুলি ছুঁড়ে বিদ্রোহের জানান দেন। তারা প্রথমেই জেলের তালা ভেঙে আটক স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মুক্ত করে। বিদ্রোহের ডামাডোলে চট্টগ্রামে থাকা ব্রিটিশরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পালিয়ে গিয়ে সমুদ্রে জাহাজে আশ্রয় নেন। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল মূলত ১২ নভেম্বর হতে। এবং তা পূর্ণতা লাভ করে ১৮ নভেম্বর রাতে।
হাবিলদার রজব আলী খানের নেতৃত্বে বিদ্রোহ বা বিপ্লব এতটাই তীব্র ছিল যে চট্টগ্রাম প্রায় ত্রিশ ঘন্টা বৃটিশ শাসনমুক্ত রাখা হয়েছিল। এই বিদ্রোহের সময় গুলি বিনিময়কালে একাধিক সৈনিক শাহাদাত-সুধা পান করেন। যাঁদের কবর দেয়া হয় ঐতিহ্যবাহী আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের আঙ্গিনায়। পরে মসজিদ সম্প্রসারণের সময় তা সরিয়ে নেওয়া হয়।

তাঁরা ঢাকায় ৭৩ নম্বর দেশীয় পদাতিক বাহিনীর সাথে মিলে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক বিদ্রোহের পরিকল্পনা করেন। সে মোতাবেক ১৯ নভেম্বর রাতে চট্টগ্রাম পিলখানা থেকে হাতি নিয়ে সদলবলে ঢাকা রওনা হন। তবে কুমিল্লা ও নোয়াখালিতে শক্তিশালী ব্রিটিশ বাহিনী এড়াতে দুর্গম পার্বত্য ত্রিপুরা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু ত্রিপুরার রাজার অসহযোগিতায় ছোট ছোট লড়াইয়ের মুখে পড়তে হয় তাদের। 

এরই মধ্যে ২২ নভেম্বর সকালেই ঢাকার ৭৩ পদাতিক বাহিনীর অস্ত্র কেড়ে নিতে শুরু করে ইংরেজরা। সরকারি খাজাঞ্চিখানার সিপাহীদের অস্ত্র কেড়ে নিলেও লালবাগ কেল্লায় প্রতিরোধের মুখোমুখি হয় তারা। সামান্য জনবল আর রসদের বলেই প্রতিরোধের দুঃসাহস এই সিপাহীদের নির্মম পরিণতি ডেকে আনে। বুলেট আর বেয়নেটের আঘাতে অনেকেই নিহত হয়। দুর্গের পুকুরে তাদের ফেলে দেওয়া হয়। আর বন্দি যারা তাদের চকবাজার ও আন্টাঘরের ময়দানে গাছে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়। লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয় বেশ কয়েক দিন।

দেশীয় গাদ্দার ও বেঈমানদের চরম অসহযোগীতা ও বিরোধীতায় পরতে পরতে বিভিন্ন যুদ্ধের মুখোমুখি হন এসব দেশপ্রেমী বিপ্লবীরা। রসদ সংকট ও তীব্র ক্ষুধায় এই অসম লড়াইয়ে দেশপ্রেমী বিপ্লবীরা একে একে শাহাদাতের অমীয় শুধা পান করতে থাকেন। হাবিলদার রজব আলী সহ তিন বা চারজন সিপাই শেষ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। ইংরেজ বাহিনীর অব্যাহত অনুসরনের মুখে তারা গহীন পাহাড়ী জঙ্গলে হারিয়ে যান। লোকচক্ষুর অন্তরালেই একসময় হাবিলদার রজব আলীর জীবনের সমাপ্তি ঘটে। কোথায় চট্টগ্রামের এই সূর্যসন্তানের মৃত্যু হয়েছে তা আজো জানা যায়নি।

ইতিহাসে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা হলেও কোন অজ্ঞাত কারণে বাদ পড়ে যান চট্টগ্রামের এই বীর কেশরী বিপ্লবী হাবিলদার রজব আলী খান। যে দেশমাতৃকার জন্য তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন দুঃখের কথা হলো সেই দেশেই বিস্মৃতির অতলে, মানুষের অগোচরে বীর হাবিলদার রজব আলী খাঁন। জাতি যদি আমাদের জাতিসত্তার শেকড়স্বরুপ এই মহানায়কদের যদি ভুলে যায় এ জাতি শিখরে পৌঁছাতে পারবে তো?

কলমেঃ
মঈন উদ্দিন চিশতী,
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি উনার বক্তব্যে শহীদ হাবিলদার রজব আলীর কথা উল্লেখ করে বলেছেন হাবিলদার রজব আলীকে আমরা গোপন করে ফেলেছি। উনাকে নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়না। হ্যাঁ, এটাই সত্য কথা। হাবিলদার রজব আলী খাঁ যতটা প্রচার পাওয়ার কথা, তাকে নিয়ে যতটা আলাপ হওয়ার কথা তা হয় না। শহীদ হাদির সম্মানার্থে আমাদের লেখাটি পুনঃপোস্ট করলাম। শহীদ হাদি অমর হোক। 

আরো জানতে রেফারেন্সঃ
১) হাবিলদার রজব আলী — এ.কে এম মহিউদ্দিন (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)
২। Rare 1857 reports on Bengal uprisings | Times of India.
৩। সত্যেন সেন: মহাবিদ্রোহের কাহিনী
৪। The Political History of Muslim Bengal: An Unfinished Battle of Faith | Mahmudur Rahman
৫। মাস্টারদা সূর্য সেন ও সূর্যসাথীরা- জামাল উদ্দিন, 
৬। ঢাকায় সিপাহী বিদ্রোহ, অধ্যাপক এ কে এম শাহনাওয়াজ |
৭। হাবিলদার রজব আলী ও আধিপত্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম- মুনশী আবদুল মান্নান,
৮। বৃটিশ বিরুদ্ধে সেদিন চট্টগ্রাম সেনা নিবাসে দাবানল জ্বেলেছিলেন হাবিলদার রজব আলী খাঁ - মুহাম্মদ মাহমুদুর রহমান,
৯। হাবিলদার রজব আলী খাঁ ও তাঁর সংগ্রামী জীবনের নানা কথা,মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম, কবি, প্রাবন্ধিক ও গণমাধ্যম কর্মী।
১০। হাবিলদার রজব আলী ও অধিপত্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম- মুনশী আবদুল মান্নান
১১। জাতীয় সংগ্রামের মহানায়ক হাবিলদার রজব আলী, জিয়া হাবীব আহ্সান, দৈনিক সংগ্রাম, নভেম্বর ১১,২০২২

Saturday, February 28, 2026

৩০ লাখ শহীদের তালিকা কোথায়?


৩০ লাখ শহীদের তালিকা কোথায়?
সাহাদত হোসেন খান
এমন কোনো যুদ্ধ খঁুজে পাওয়া যাবে না যেখানে হ*ত্যা*যজ্ঞ ও নারী নির্যাতন ঘটেনি। যুদ্ধে উভয়পক্ষ হ*ত্যা*যজ্ঞ চালায়। একপক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। আরেক পক্ষের ক্ষতি হয় কম। পার্থক্য শুধু এতটুকুই। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশে গণহ**ত্যা সংঘটিত হয়েছে। তবে শুরুতেই নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। সংখ্যাটি একেবারে অসম্ভব। ৬৭৫৭ শহীদ পরিবার সরকারি ভাতা পাচ্ছে। তাদের মধ্যে আবার ১৩৯৯ পরিবার ভাতা নিতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে কার্যত ৫৩৫৮ পরিবার ভাতা নিচ্ছে। যদি সত্যিই ৩০ লাখ লোক শহীদ হয়ে থাকে তাহলে বাকি ২৯ লাখ ৯৩ হাজারেরও বেশি শহীদ পরিবারের কোনো খোঁজ নেই কেন? 
  শহীদদের তালিকা করা না হলেও রাজাকারের তালিকা করা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার ২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর প্রথম ধাপে ১০ হাজার ৭৮৯ জন রাজাকারের একটি তালিকা প্রকাশ করে। এ তালিকায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজাকার ছিল ৮০৬০, পরবর্তীতে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজাকার ছিল ১০২৪ এবং জামায়াতের রাজনীতির  সঙ্গে সম্পৃক্ত রাজাকার ছিল মাত্র ৩৭ জন।  আওয়ামী লীগ কখনো আশা করেনি যে, রাজাকারের তালিকায় তাদের দলের লোকের পাল্লা ভারি হবে। তখন তড়িঘড়ি করে এ তালিকা চাপা দেয়া হয়। শহীদদের সংখ্যা নিয়ে রাজনীতি করা হচ্ছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা হচ্ছে। অব্যক্ত মনোভাব যাচাই করলে বুঝা যায় যে,  শহীদদের তালিকা করা হলে প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ পাবে এবং ৩০ লাখের মিথ মিথ্যা প্রমাণিত হবে। তাই আজ পর্যন্ত কোনো সরকার শহীদদের তালিকা করার গরজ দেখায়নি।  
   ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ৩০ লাখ বা তিন মিলিয়ন আক্ষরিক অর্থে সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য। শেখ মুজিবুর রহমানের মুখ ফসকে বের হয়ে যাওয়া তিন মিলিয়নকে বেদবাক্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। তিনি কিভাবে এবং কোন পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে এ সংখ্যা প্রকাশ করেছেন তা উল্লেখ করেননি। ক্ষমতার দাপটে তিনি এ উদ্ভট দাবি করেছেন এবং জাতি দশকের পর দশক এ অলীক সংখ্যা মুখ বুজে মেনে নিয়েছে। এ সংখ্যা নিয়ে তর্ক করা যাবে না, গবেষণা করা যাবে না, প্রশ্ন তোলা যাবে না। প্রশ্ন তোলা অথবা সন্দেহ প্রকাশ করা হলে হয়তো আইনি ঝামেলায় পড়তে হয় নয়তো দেশপ্রেম নিয়ে কটাক্ষ করা হয়। বিদ্রুপ করা হয়। 
     এ প্রজন্মের যেকোনো গবেষক অবশ্যই এ প্রশ্ন উত্থাপন করবেন যে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ৩০ লাখ লোককে হত্যা করে থাকলে বেলুচিস্তান, সোয়াত অথবা করাচিতে সামরিক অভিযানে গণহত্যা চালায়নি কেন? একই দেশের সেনাবাহিনী দুরকম আচরণ করতে পারে না। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ৯ মাসে বাংলাদেশে ৩০ লাখ লোক হত্যা করে থাকলে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ এবং বেলুচিস্তান তো অনেক আগেই জনশূন্য হয়ে যাওয়ার কথা। ২০০১ সালে সোয়াত উপত্যকা এবং উত্তর ওয়াজিরিস্তানে রীতিমতো যুদ্ধ চলছে। সেখানে সন্ত্রাসী ছাড়া সাধারণ মানুষ হত্যার কোনো নজির নেই। ৩০ লাখের কল্পকথা নিয়ে আলোচনা করলে সদুত্তর পাওয়া যায় না। আমরা বিশ্বাস করছি যে, একাত্তরে পাকিস্তানি সৈন্যরা ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে এবং ২ লাখ মা বোনের ইজ্জত নষ্ট করেছে। একাত্তরে পশ্চিম পাকিস্তানে চার লাখ বেসামরিক বাঙালি এবং ২৮ হাজার বাঙালি সৈন্য অবস্থান করছিল। এখন প্রশ্ন হলো, পাকিস্তানি সৈন্যরা পূর্বাঞ্চলে ৩০ লাখ লোক মেরে ফেললেও হাতের মুঠোর ভেতরে একজন বাঙালিকেও হত্যা না করার কারণ কি। রহস্যের একটি বাতাবরণে সত্য চাপা পড়ে আছে। আমাদেরকে সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে।
শেখ মুজিব ৩ লাখ বলতে গিয়ে ভুলে শহীদের সংখ্যা ৩০ লাখ বলেছেন। এই একটি উক্তি গোটা মুসলিম ইতিহাসকে বিপজ্জনক অবস্থায় নিক্ষেপ করেছে। মুসলিম বিদ্বেষীরা পাকিস্তানিদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়ে দিতে গিয়ে মুসলিম সভ্যতাকে কলঙ্কিত করেছে। পৃথিবীতে হাজার হাজার যুদ্ধ হয়েছে। তবে মাত্র ৯ মাসে ৩০ লাখ লোকের মৃত্যুর পরিসংখ্যান ইতিহাসে কোথাও খঁুজে পাওয়া যাবে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ৬০ লাখ ইহুদি নিধন বা হলোকাস্ট সংঘটিত হয়েছে। তবে ৬০ লাখ ইহুদির মৃত্যু হয়েছে ৬ বছরে। আমরা প্রমাণ ছাড়া দাবি করছি, পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্যরা ৩০ লাখ বাঙালি মুসলমানকে হত্যা করেছে। ইসলামের দুশমনদের জন্য তার চেয়ে বড় সাফল্য আর কিছু হতে পারে না। মুসলমান হয়ে আমরা স্বাধীনতার জন্য আমাদের মুসলিম ভাইয়ের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। তারপরও আমরা মুসলমান হিসেবে গর্ব করি। আমাদের কি গর্ব করার নৈতিক অধিকার আছে?
 স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর ২০২৪ সালে জাতীয় স্বার্থে শহীদের সঠিক সংখ্যা নির্ধারণ এবং তাদের নিভুর্ল সংখ্যা বের করা খুবই জরুরি। একটি জাতি ঐতিহাসিক এবং পরিকল্পিত মিথ্যাচারের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। ২০১৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক বলেছিলেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লাখ (৩ মিলিয়ন) শহীদের মধ্যে মাত্র ৫ হাজার ৭৯৫ জনকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এ উক্তির মধ্য দিয়ে মন্ত্রী একটি পুরনো উপাখ্যানকে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। ৯ মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নথিভুক্ত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে সাভারের গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ডা. মরহুম জাফরুল্লাহ চৌধুরীর একটি উক্তি উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছিলেন যে, জাতির এই বেহাল অবস্থার জন্য অনুভূতিহীন স্তাবক ও দালালরা কম দায়ী নয়। প্রখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা ডা. চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ৩ মিলিয়ন দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দৈনিক নিউ এজ সম্পাদক নূরুল কবির, নিউ এজের বিশেষ প্রতিবেদক ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান, অধ্যাপক ড. তাজ হাশমী, নিউইয়র্কভিত্তিক লেখক এবং সোশ্যাল মিডিয়া কমীর্ ডা. মিনা ফারাহ এবং বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, রুহুল কবির রিজভী, নীলুফার চৌধুরী মনি এবং ফাহিমা নাসরিন মুন্নি প্রমুখ এ সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ম্যাসাকার: দ্য ট্র্যাজেডি অব বাংলাদেশের লেখক রবার্ট পেইনের একটি রিপোর্ট থেকে তিন মিলিয়নের উপ্যাখানের জন্ম হয়েছে। তিনি দাবি করেন যে, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান গণহত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। 
     ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে আসার পর বিবিসির সাংবাদিক সিরাজুর রহমান প্রথম শেখ মুজিবুর রহমানের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। তাকে হিথ্রো বিমান বন্দর থেকে ক্লারিজ হোটেলে নিয়ে এসেছিলেন লন্ডনে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার আপা ভাই পান্থ। পরপরই বিবিসির বাংলা বিভাগের উপপ্রধান সিরাজুর রহমান সেখানে উপস্থিত হন। মিস্টার পান্থ ‘ইওর এক্সিলেন্সি’ বলে সম্বোধন করায় মুজিব অবাক হচ্ছিলেন। সিরাজুর রহমান তাকে বলেন, বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে এবং তার অনুপস্থিতিতে তাকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়েছে। একথা শুনে মুজিব বিস্মিত এমনকি স্তম্ভিত হয়েছিলেন। স্পষ্টত তিনি এমন ধারণা নিয়েই লন্ডনে এসেছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানিদের হয়তো পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দেয়া হয়েছে।২০১১ সালের ২৩ মে লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে সিরাজুর রহমান বলেন: I explained that no accurate figure of the casualties was available but our estimate, based on information from various sources, was that up to "three lakh" (3,00000) died in the conflict. To my surprise and horror he told David Frost later that "three millions of my people" were killed by the Pakistanis. Whether he mistranslated "lakh" as "million" or his confused state of mind was responsible I don't know, but many Bangladeshis still believe a figure of three million is unrealistic and incredible. 
অথার্ৎ আমি তার কাছে ব্যাখ্যা দেই যে, হতাহতের নিভুর্ল সংখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। কিন্তু বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আমাদের অনুমান, যুদ্ধে তিন লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আমাকে বিস্মিত করে দিয়ে পরবর্তীতে ডেভিড ফ্রস্টকে তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তানিরা ‘আমার তিন মিলিয়ন মানুষকে’ হত্যা করেছে। তিনি ‘লাখকে’ ‘মিলিয়নের’ সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেছিলেন নাকি চিত্তবিভ্রমের জন্য এ সংখ্যা উল্লেখ করেছিলেনআমি তা নিশ্চিত নই। বহু বাংলাদেশি এখনো বিশ্বাস করে, তিন মিলিয়ন সংখ্যাটি অবাস্তব এবং অবিশ্বাস্য।
বিবিসির সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মুজিব বেশ কয়েকজন বিশ্ব নেতার প্রশংসা করেন। তাদের মধ্যে আছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিঙ্কন, জন এফ কেনেডি, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্সটন চার্চিল, সোভিয়েত নেতা ভস্নাদিমির লেনিন ও জোসেফ স্টালিন, চীনের চেয়ারম্যান মাও সে তুং, ভারতের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী, প্রধানমন্ত্রী পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, একে ফজলুল হক, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট ড. আহমদ সুকর্নো। কিন্তু তিনি পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর নাম মুখে আনেননি। অন্যদিকে, মাইকেল এইচ হার্ট ইতিহাসের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তিত্বের তালিকায় মুহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ঠাঁই দিয়েছেন এবং র‌্যাংকিংয়ে জিন্নাহ হলেন গান্ধী ও নেহরুর উপরে।
   ৩ মিলিয়নের উপাখ্যান প্রথম প্রচার করেছিল সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘প্রাভদা’ এবং পরে শেখ মুজিব। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর মুজিব যখন ঢাকায় অবতরণ করেন তখন তিনি তাজউদ্দিন আহমদকে জিজ্ঞেস করেন মুক্তিযুদ্ধে কতজন নিহত হয়েছেন। তাজউদ্দিন আহমদ উত্তর দেন, তিন লাখ। কিন্তু শেখ মুজিব ডেভিড ফ্রস্টের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে, ত্রিশ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। গণহত্যার অভিযোগ খতিয়ে দেখার জন্য বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ একটি কমিশন গঠন করে। কিন্তু এ কমিশন গণহত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া পায়নি। পূর্ব পাকিস্তানে একটি গণকবরও পাওয়া যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের লোকসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। এখন যদি গড়ে প্রত্যেক পরিবারে পাঁচ জন করে সদস্য থাকে তাহলে ১৯৭১ সালে মোট পরিবারের সংখ্যা ছিল গড়ে দেড় কোটি। ৩০ লাখ শহীদের সংখ্যা মেনে নিলে বলতে হবে সাড়ে সাত কোটি মানুষের মধ্যে চার শতাংশ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ ৬০ হাজার পরিবারে কেউ না কেউ মৃত্যুবরণ করেছে। ৩০ লাখকে মেনে নিলে আমাদেরকে মেনে নিতে হবে ২৬৭ দিনের মুক্তিযুদ্ধে প্রতিদিন এগারো হাজার এক শো এগারো জনকে হত্যা করা হয়েছে। এত লোক মৃত্যুবরণ করলো। কিন্তু তাদের কবর কোথায়? অবাঙালিদের গণকবরকে বাঙালি হত্যাকাণ্ডের প্রমাণ হিসেবে দাবি করা হয়। 
   ১৯৭১ সালে ৪৮০টি ছিল থানা। ৩০ লাখের উপাখ্যান সঠিক হলে প্রতি থানায় নিহত হওয়ার কথা সাড়ে ৬ হাজার। এ হিসাবে প্রতিটি থানায় প্রতিদিন ২৪ জনকে হত্যা করা হয়েছে। একই হিসাবে প্রতিদিন প্রতি ইউনিয়নে ৩ জনকে হত্যা করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যাবে যে, ৬ বছরে নাৎসি জার্মানি ৬ মিলিয়ন ইহুদিকে হত্যা করেছিল। এ হিসাবে  প্রতিদিন ২ হাজার ৭৪০ জন নিহত হয়েছিল। ইহুদি নিধনের সংখ্যা ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিদিন নিহত বাঙালিদের সংখ্যার চেয়ে কম। বৈজ্ঞানিক জরিপ ছাড়াই পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ সরকার ৩ মিলিয়নকে তাদের রাজনৈতিক সুবিধার জন্য অভ্রান্ত সত্যি হিসেবে গ্রহণ করেছিল। যত প্রতিকূলতাই থাকুক না কেন, ইতিহাসকে জিম্মি করা যাবে না। একটি সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য এবং নির্ভুল জরিপ চালানো হলে সংখ্যাটি কম বেশি যাই হোক, একটি চূড়ান্ত মীমাংসায় পেঁৗছানো সম্ভব।
   পূর্ণাঙ্গ গণনা করা না হলে রাজনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মসহ সব বাংলাদেশি প্রশ্ন উত্থাপন করতে থাকবে এবং ৩ মিলিয়নকে চ্যালেঞ্জ করবে। ২০১৭ সালে প্রখ্যাত পাকিস্তানি শিক্ষাবিদ ও ইতিহাসবিদ ড. জুনাইদ আহমেদ ‘১৯৭১ সালে ত্রিশ লাখ শহীদ এবং ২ লাখ নারী ধর্ষণের মিথ’ শিরোনামে এক নিবন্ধে বলেছেন, ১৯৭৪ সালের এপ্রিলে পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তির পর শহীদের সংখ্যা ৩ মিলিয়ন এবং ২ লাখ বাঙালি নারীকে ধর্ষণের উপযুর্পরি দাবি বন্ধ হয়ে যায়। জেনারেল জিয়া, জেনারেল হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ এবং পরে খালেদা জিয়ার শাসনামলে বাংলাদেশ সরকার পাকিস্তানের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখতো। গাণিতিকি হিসাবেও তিন মিলিয়নকে শুদ্ধ প্রমাণ করা সম্ভব নয়। পূর্ব পাকিস্তানে ২৬ মার্চ থেকে সামরিক অভিযান শুরু হয় এবং ১৬ ডিসেম্বর শেষ হয়। হাসিনা সরকার ভারতকে তুষ্ট এবং ভোটারদের সমর্থন আদায়ে ৩ মিলিয়ন শহীদের অতিরঞ্জিত মিথ্যাকে ব্যবহার করেছে।  
 ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ইসলামাবাদে কায়েদে আজম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘ক্রিয়েশন অব বাংলাদেশ: মিথস এক্সপ্লোডেড’ শিরোনামে বইয়ের লেখক ইতিহাসবিদ ড. জুনাইদ আহমেদ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে আরো বলেন, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসার পর শেখ মুজিব ১৯৭২ সালের ২৯ জানুয়ারি নিহতের সঠিক সংখ্যা নিরূপণে ১২—সদস্যের একটি কমিশন গঠনের নির্দেশ দেন। এ  কমিশন প্রায় দুই বছর অনুসন্ধানের পর ৫৮ হাজার থেকে ৬৫ জনের কাছাকাছি একটি সংখ্যা প্রকাশ করে। অজানা ও রহস্যজনক কারণে কমিশনের কাজ পরবতীর্তে আর অগ্রসর হয়নি। ১৯৭২—৭৩ সালের দিকে শেখ মুজিব বাংলাদেশ রেডক্রস সোসাইটির সেক্রেটারিকে (গাজী গোলাম মোস্তফা ছিলেন চেয়ারম্যান) ১৯৭১ সালে নিহতের সংখ্যা নিরূপণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। প্রায় ৯ মাস গবেষণার পর তারা প্রায় ৬০ হাজার লোকের মৃত্যুর তালিকা করতে সক্ষম হয়। মুজিব তখন তাদের গণনা বন্ধ এবং কাগজপত্র ধ্বংস করতে বলেছিলেন এবং তারা সেই অনুযায়ী কাজ করেন। তারপর থেকে আর কোনো জরিপ করা হয়নি। এ মতবিনিময়ে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইটে অংশগ্রহণকারী পাকিস্তানি ব্রিগেডিয়ার তাজ বলেন, নিহতের সংখ্যা ৩০ হাজারের  বেশি হতে পারে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৫ হাজার ছাত্র নিহত হওয়ার পরিসংখ্যান পুরোপুরি মিথ্যা। পাকিস্তান বিদ্বেষী ভারতীয় এবং বাংলাদেশিরা এ গুজব রটিয়েছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার ছাত্র অবস্থান করে কিভাবে? যারা অবস্থান করছিল তারা ছিল সশস্ত্র মুক্তিবাহিনীর লোক।
  অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র গবেষণা সহযোগী ড. শর্মিলা বসু দাবি করেছেন যে, যুদ্ধের সময় উভয় পক্ষের সৈন্য এবং বেসামরিক লোকসহ নিহতের মোট সংখ্যা সংখ্যা ছিল ৫০ হাজার থেকে এক লাখের মধ্যে।
    ৩০ লাখ বাঙালির প্রাণ দেয়ার যে কথা আওয়ামী লীগাররা প্রচার করেন, সেই সংখ্যাটি কাল্পনিক। এতে কোনো সন্দেহ নেই। কাল্পনিক না বলে আমি বরং বলবো, এ ৩০ লাখের কথাটি তারা পেয়েছেন ছেঁায়াচে রোগের মতো। এজন্য তাদের কোনো মেহনত করতে হয়নি। একজন থেকে কয়েকজন, কয়েকজন থেকে বহুজন, অতঃপর কোটি কোটি জনে ছড়িয়ে পড়েছে। যারা ৩০ লাখ, ৩০ লাখ বলে চিৎকার করেন, তাদের যেকোনো একজনের কাছে অথবা সকলের কাছে চ্যালেঞ্জ দিয়ে প্রশ্ন করছি যে, এ সংখ্যাটি ভুল। আপনারা কখন এবং কিসের ভিত্তিতে হিসাব কষে এ সংখাটি নিরূপণ করেছেন তা কি বলতে পারবেন? আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি যে, তারা আমার এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেন না।
  ১৯৯০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রে একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে ‘ভাষা দিবস’ শীর্ষক এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ আলোচনা সভায় বক্তৃতাকালে তৎকালীন মুজিবনগর সরকারের এমপি এবং ভাষা সৈনিক আবদুল মোহাইমেন বলেন, ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের কাছে সাক্ষাৎকার দানকালে শেখ মুজিবুর রহমানের মুখ থেকে ভুলক্রমে ফসকে যাওয়া একটি শব্দের জন্য দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিহতের সংখ্যা তিন লাখের স্থলে ৩০ লাখ হয়ে গেছে।
   ১৯৯০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি সাপ্তাহিক তারকালোকে আওয়ামী লীগ নেতা এমএ মোহাইমেন একটি সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত যে ঘোষণা দিয়েছি তাতে আমরা নিহতের সংখ্যা তিন লাখ ঘোষণা করেছিলাম এবং এই হিসাবও আমরা তখন কলকাতায় বসে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে খবরাখবর নিয়ে একটি আনুমানিক সংখ্যা দাঁড় করিয়েছিলাম। পরবর্তীকালে ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে আমরা নিহতদের সংখ্যা নিরূপণের প্রয়াস পাই। তখন বৃহত্তর নোয়াখালীর মৃতদের সংখ্যা বের করার দায়িত্ব গণপরিষদের সদস্য হিসেবে আমাকে দেওয়া হয়েছিল। আমি বিভিন্ন থানা ও ইউনিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করে যে সংখ্যা পেয়েছিলাম, সেটা সাত হাজারের কম। নিহত রাজাকারদের সংখ্যা ধরেও সাড়ে সাত হাজারের বেশি দাঁড়ায়নি। তখন বাংলাদেশে ঊনিশটি জেলা ছিল। সবকটি জেলায় যুদ্ধ সমভাবে হয়নি। যেসব জেলায় যুদ্ধের প্রকোপ বেশি হয়েছিল, তার মধ্যে নোয়াখালী ছিল একটি। তাই নোয়াখালী জেলার মৃতের সংখ্যা যা দাঁড়িয়েছিল, গড়ে ঐ সংখ্যাও যদি সব জেলায় ধরা যায় তাতেও লাখ সোয়া লাখের বেশি মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় না। কিন্তু ১৯৭২ সালের প্রথম দিকে ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্টের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে শেখ মুজিবুর রহমান তিন মিলিয়ন বলে ফেলেন। তারপর থেকেই চালু হয়ে গেল ৩০ লাখ লোক মারা গিয়েছে। মুজিববাহিনী ও রক্ষীবাহিনীর ভয়ে কেউ এ সংখ্যা শোধরাননি কিংবা প্রতিবাদ করেননি। এমন কি তখনকার সময় আওয়ামী লীগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজী জহিরুল কাইয়ুম একটি সাক্ষাৎকারে স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩ লাখ লোক নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। আওয়ামী লীগের কোনো নেতা—কমীর্ প্রতিবাদ করেননি। ৩০ লাখ লোক যে মরেনি তার আরেকটি উদাহরণ দিচ্ছি। ১৯৭২ সালে সরকারের তরফ থেকে প্রতি নিহত জনের জন্য ২০০০ টাকা করে ঘোষণা করা হয়েছিল। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে যতটুকু জানা গেছে, মাত্র ৭২ হাজার দরখাস্ত পরেছিল। তার মধ্যে ৫০ হাজার নিহতের আত্মীয়দের ঘোষিত অর্থ দেয়া হয়েছে। এই ৭২ হাজারের মধ্যে আবার বহু ভুয়া দরখাস্তও ছিল এমনকি অনেক রাজাকারও ছিল।
  নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর বড় ভাই ব্যারিস্টার শরৎ চন্দ্র বসুর নাতনি শর্মিলা বসু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আসলে কত লোক নিহত হয়েছে তা নির্ণয় করার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা চালান। তিনি তার লেখা ‘ডেড রেকনিং শিরোনামে গ্রন্থে বলেন, The number three million appears to be nothing more than a gigantic rumour. From the available evidence discussed in this study, it appears possible to estimate with reasonable confidence that at least 50,000-100,000 people perished in the conflict in East Pakistan/Bangladesh in 1971, including combatants and non-combatants, Bengalis and non-Bengalis, Hindus and Muslim, Indians and Pakistanis
 অর্থাৎ তিন মিলিয়ন সংখ্যাটি একটি বিশাল গুজব ছাড়া আর কিছুই নয় বলে মনে হচ্ছে। এই গবেষণায় আলোচিত প্রমাণ থেকে যুক্তিসঙ্গত অনুমান যে, ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান/বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কমপক্ষে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ লোক মারা গিয়েছিল। নিহতদের মধ্যে সৈন্য এবং বেসামরিক লোক, বাঙালি ও অবাঙালি, হিন্দু ও মুসলমান, ভারতীয় ও পাকিস্তানি ছিল।
   ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর একটি দৈনিকের সম্পাদকীয়তে ৩০ লাখের উল্লেখ থাকায় পরীক্ষা—নিরীক্ষা ছাড়াই ‘ইউরেকা’ ‘ইউরেকা’ বলে একটি মহল লাফাতে শুরু করে। জানতে চেষ্টা করা হয়নি এই পত্রিকা এবং পত্রিকার সম্পাদক সাহেবের ভূমিকা মুক্তিযুদ্ধে কি ছিল। এই পত্রিকায় প্রকাশিত ‘৩০ লাখ’ সংখ্যাটি নিয়ে যারা লাফালাফি শুরু করেন তাদের বিরুদ্ধে ৯ মাস পত্রিকাটি ‘বিশেষ ভূমিকা’ পালন করেছে। আলোচ্য পত্রিকার মালিকের নাগরিকত্ব পর্যন্ত মুক্তিযুুদ্ধের পরপর কেড়ে নেয়া হয়। এ মালিকের মালিকানাধীন পত্রিকার প্রিয়ভাজন সম্পাদক ৩০ লাখ সংখ্যাটি নিজের ৯ মাসের পাপ স্ফলণের জন্য উপহার দেন। আর  আওয়ামী—বাকশালীরা এমনকি শেখ মুজিবুর রহমান পর্যন্ত তা গ্রহণ করে নিলেন। সেই সময় থেকে শুরু হয় ৩০ লাখের উচ্চারণ। কেউ জিজ্ঞেস করেনি এবং জানতেও চায়নি এ সংখ্যাটি কোন ফ্যাক্টরিতে তৈরি হয়ে বাজারজাত হলো। 

ভিয়েতনাম যুদ্ধ ৩০ লাখের দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করে 
 কেউ বলবেন না যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভিয়েতনামের মুক্তিসংগ্রামের চেয়ে  বেশি রক্তক্ষয়ী ছিল। ভিয়েতনাম দু’দফা বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে মুক্তিসংগ্রাম পরিচালনা করেছে। ১৯৫৪ সালে ফরাসিরা ইন্দোচীন ছেড়ে যাওয়ার পর আমেরিকা দক্ষিণ ভিয়েতনামের সামরিক নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। ভিয়েতনামে আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ যুদ্ধ ১৯৫৫ সালের পহেলা নভেম্বর থেকে ১৯৭৫ সালের ৩০ এপ্রিল সায়গনের পতন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এ যুদ্ধ ‘দ্বিতীয় ইন্দোচীন যুদ্ধ’ নামে পরিচিত।  এ সময় সরকারিভাবে উত্তর ভিয়েতনাম ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের মধ্যে লড়াই হয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন এবং অন্যান্য কমিউনিস্ট দেশ উত্তর ভিয়েতনামকে সমর্থন দেয়। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড এবং অন্যান্য কমিউনিস্টবিরোধী দেশ দক্ষিণ ভিয়েতনামকে সমর্থন দেয়। 
      ১৯৬৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যক্ষভাবে ভিয়েতনাম যুদ্ধেজড়িত হয় এবং ১৯ বছর যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। যুক্তরাষ্ট্র ভিয়েতনাম যুদ্ধে নিষিদ্ধ নাপাম বোমা ব্যবহার করেছে এবং দৈত্যাকৃতির বোমারু বিমান বি—৫২ মোতায়েন করে। ভিয়েতনাম যুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা ভিন্ন ভিন্ন। যুদ্ধে বেসামরিক দক্ষিণ ভিয়েতনামী নিহত হয় এক লাখ ৯৫ হাজার থেকে ৪ লাখ ৩০ হাজার। বেসামরিক উত্তর ভিয়েতনামী নিহত হয় ৫০ হাজার থেকে সাড়ে ৬ লাখ। ১৯৬০ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ ভিয়েতনামী সৈন্য নিহত হয় আনুমানিক ২ লাখ ৫৪ হাজার ২৫৬ জন। আমেরিকার প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তাদের মতে, ১৯৬৫ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত ভিয়েতনামে ৯ লাখ ৫০ হাজার ৭৬৫ জন কমিউনিস্ট সৈন্য নিহত হয়। আমেরিকান সৈন্য নিহত হয় ৫৮ হাজার ২২০ জন এবং আহত হয় ৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪৪ জন। দীর্ঘস্থায়ী ভিয়েতনাম যুদ্ধে মোট নিহতের সংখ্যা ১২ লাখ ৫২ হাজার ৯৭৭ জন। ৩০ বছর স্থায়ী ভিয়েতনাম যুদ্ধে নিহতের সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখ হলে বাংলাদেশের ৯ মাসের মুক্তিযুুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ হয় কিভাবে? আলজেরিয়ায় ১০ বছরের দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রামে নিহতের সংখ্যা ১০ লাখ। আমাদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ সংখ্যা ১০ লাখ না হয়ে ১০ কোটি হওয়া উচিত ছিল।   
    হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টে বলা হয়, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে ২৬ হাজার লোক নিহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে শুধু বাঙালি নয়, পাকিস্তানি, বিহারী ও অনুগত বাঙালিও রয়েছে। এ ব্যাপারে ১৯৭১ সালের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী পাকিস্তানি মেজর জেনারেল হাকিম আরশাদ কোরেশীর একটি ভাষ্য উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল কোরেশী ২৬ এফএফের (ফ্রন্টিয়ার ফোর্স) কমান্ডিং অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তার অভিজ্ঞতা নিয়ে ‘দ্য নাইনটিন হান্ড্রেড সেভেনটি ওয়ান: ইন্দো—পাক ওয়ার’ শিরোনামে একটি বই লিখেছেন। এ বইয়ে তিনি বাংলাদেশে পাকিস্তানি সৈন্যদের গণহত্যার অভিযোগ খণ্ডন করে লিখেছেন: Can 60 thousand soldiers kill three million people, supported by 100,000 armed personnel and innumberable agents from across the border? Unlikely, unless the majority decide to line up with their hands over their heads and allow themselves to be shot. But human beings sense danger and do their best to get out of harm’s any way as they did with alacrity, whenever we moved in. In order to kill three million the Pakistan army would have had to kill 11,494 persons a day non-stop from 26 March onwards.If on the other hand, they were to kill one million people, their daily killing would come to 3,831. Seen in another way, for 60,000 Pakistan army to kill three million and rape three thousand women, each and every one of them had to kill 50 persons and rape 5 women. 
 অর্থাৎ ৬০ হাজার সৈন্য কি ৩০ লাখ লোককে হত্যা করতে পারে যাদের পেছনে ছিল এক লাখ সশস্ত্র লোকের সমর্থন এবং সীমান্তের ওপার থেকে আগত অগণিত এজেন্ট? সংখ্যাগরিষ্ঠ লোক যদি সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে তাদের হাত মাথার উপরে তুলে গুলি করার সুযোগ দানের সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে সম্ভব। কিন্তু মানুষ বিপদ অঁাচ করতে পারে এবং বিপদ থেকে পালিয়ে যেতে সর্বোত্তম চেষ্টা করে। আমরা অগ্রসর হওয়া মাত্র রুদ্ধশ্বাসে তারা পালিয়ে গেছে। ৩০ লাখ লোককে হত্যা করতে হলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে ২৬ মার্চ থেকে পরবতীর্ দিনগুলোতে বিরতিহীনভাবে প্রতিদিন ১১ হাজার ৪৯৪ জনকে হত্যা করতে হতো। অন্যদিকে ১০ লাখ লোক হত্যা করতে হলে তাদেরকে দৈনিক ৩ হাজার ৮৩১ জনকে হত্যা করতে হতো। অন্যভাবে দেখতে গেলে ৬০ হাজার সৈন্য যদি ৩০ লাখ লোক হত্যা এবং ৩ লাখ মহিলাকে ধর্ষণ করে থাকে তাহলে তাদের প্রত্যেককে ৫০ জনকে হত্যা এবং ৫ জন মহিলাকে ধর্ষণ করতে হতো।

অবাঙালি হ*ত্যা*কাণ্ড
আমরা শুধু বাঙালি গণহত্যার ইতিহাস জানি। জানি না কেবল অবাঙালিদের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার করুণ কাহিনী। আমাদের লেখকরা ইতিহাসের এ অধ্যায়কে চাপা দিয়ে রেখেছেন। ১৯৭১ সালে অবাঙালিদের ওপর নৃশংসতার মর্মবেদনার কথা আমাদের এ অঞ্চলের লোকেরা জানে না। সবাই বিজয়ীদের প্রশস্তি গায়। অন্যদিকে পরাজিতদের বেদনা, তাদের যন্ত্রণার প্রতি সবাই চোখ বন্ধ রাখে। কিন্তু সব মানুষের যন্ত্রণা সমান বেদনাদায়ক। হতে পারে তারা অবাঙালি। কিন্তু তারাও মানুষ। তারাও মুসলমান। মুসলিম পরিচিতি তাদের রক্ষাকবচ হতে পারেনি। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে এমন কোনো অবাঙালি পরিবার ছিল না যে পরিবারে অন্তত দুই তিনজন প্রাণ হারায়নি। কোনো কোনো পরিবারে ৫ জন বা ১০ জন নিহত হয়েছে। নারীরা পাইকারিভাবে সম্ভ্রম হারিয়েছে। উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদী আবেগে সংখ্যালঘু অবাঙালিরা নির্মূল হয়ে গেছে। তাদের সহায় সম্পত্তি কেড়ে নেয়া হয়েছে। তাদের জন্য কারো দয়া হয়নি। নির্মমতা প্রদর্শন করা ছিল তখন বাঙালি দেশপ্রেমের মানদণ্ড। 
    ১৯৪৭ সালের আগে আমরা ব্রিটিশের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছি। এ লড়াইয়ের ইতিহাসে সব গালি ইংরেজদের দেয়া হয়। কিন্তু ১৯৪৭ সালের পরবর্তী স্বাধীনতার ইতিহাসে প্রত্যেকটি গালি দেয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানি মুসলমানদের। আমাদের এ ভূখণ্ডে মুসলিম পরিচিতি নিয়ে বিহারীরা বসবাস করতো। এ দেশকে তারা অন্তর দিয়ে ভালোবাসতো। কিন্তু তাদেরকে বাঙালিরা কচুকাটা করেছে। পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য ছিল তাদের একমাত্র অপরাধ। ভাইকে হ*ত্যা করেও আমরা মুসলমান! সত্যি আমাদের তুলনা হয় না। একই বিশ্বাসের অংশীদার মুসলমান আমাদের শত্রু হয়ে গেল। আর আল্লাহ ও তার রসূলের (সা.) দুশমন কাফেররা হয়ে গেল আমাদের বন্ধু, আমাদের মিত্র। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পড়তে গেলে আপনাকে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পড়তেই হবে। কিন্তু আপনি আমাদের কোনো বইয়ে তার কারণ খুঁজে পাবেন না। পহেলা মার্চ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত অবাঙালি হত্যাযজ্ঞ ছিল ২৫ মার্চ ‘অপারেশন সার্চলাইট’ পরিচালনা করার একমাত্র কারণ। 
(লেখাটি আমার ‘ভারতে মুসলিম—বিরোধী রায়ট’ থেকে নেয়া)

🖊️©️ লেখা শাহাদাত হোসাইন খান ফেসবুক আইডি

৫৭ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা


ভারতের স্বার্থে হাসিনার গ্রীন সিগনালে
৫৭ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা
সাহাদত হোসেন খান
(প্রথম অংশ)  
বিডিআর বিদ্রোহ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সদর দফতর পিলখানায় বিদ্রোহী জওয়ানদের হামলায় নিহত হন ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা। পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে নিহত ৫৭ সেনা কর্মকর্তা: 
১. মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ
২.ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হোসেন
৩. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আবদুল বারী
৪. কর্নেল মজিবুল হক
৫. কর্নেল আনিস—উজ—জামান
৬. কর্নেল মোহাম্মদ মসিউর রহমান
৭. কর্নেল কুদরত ইলাহী রহমান শফিক
৮. কর্নেল মোহাম্মদ আখতার হোসেন
৯. কর্নেল রেজাউল কবীর
১০. কর্নেল নাফিজউদ্দিন আহমেদ
১১. কর্নেল কাজী এমদাদুল হক
১২. কর্নেল বিএম জাহিদ হোসেন
১৩. কর্নেল সামসুল আরেফিন আহামেদ
১৪. কর্নেল নকিবুর রহমান
১৫. কর্নেল কাজী মোয়াজ্জেম হোসেন
১৬. কর্নেল গুলজারউদ্দিন আহমেদ
১৭. কর্নেল শওকত ইমাম
১৮. কর্নেল এমদাদুল ইসলাম
১৯. কর্নেল আফতাবুল ইসলাম
২০. লেফটেন্যান্ট কর্নেল এনশাদ ইবন আমিন
২১. লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসুল আজম
 ২২. লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী রবি রহমান, এনডিসি
 ২৩. লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম কিবরিয়া মোহাম্মদ
২৪. লেফটেন্যান্ট কর্নেল বদরুল হুদা
২৫. লেফটেন্যান্ট কর্নেল এলাহী মঞ্জুর চৌধুরী
২৬. লেফটেন্যান্ট কর্নেল এনায়েতুল হক, পিএসসি
২৭. লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু মুছা আইউব
২৮. লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম
২৯. লেফটেন্যান্ট কর্নেল লুৎফর রহমান
৩০. লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান
 ৩১. লেফটেন্যান্ট কর্নেল লুৎফর রহমান খান
৩২. মেজর মকবুল হোসেন
৩৩. মেজর আবদুস সালাম খান
৩৪. মেজর হোসেন সোহেল শাহনেওয়াজ
৩৫. মেজর কাজী মোছাদ্দেক হোসেন
 ৩৬. মেজর আহমেদ আজিজুল হাকিম
৩৭. মেজর মোহাম্মদ সালেহ
৩৮. মেজর কাজী আশরাফ হোসেন
৩৯. মেজর মাহমুদ হাসান
৪০. মেজর মুস্তাক মাহমুদ
৪১. মেজর মাহমুদুল হাসান
৪২. মেজর হুমায়ুন হায়দার
৪৩. মেজর আজহারুল ইসলাম
৪৪. মেজর হুমায়ুন কবীর সরকার
৪৫. মেজর খালিদ হোসেন
৪৬. মেজর মাহবুবুর রহমান
৪৭. মেজর মিজানুর রহমান
৪৮. মেজর মোহাম্মদ মাকসুম—উল—হাকিম
৪৯. মেজর এসএম মামুনুর রহমান
৫০. মেজর রফিকুল ইসলাম
৫১. মেজর সৈয়দ ইদ্রিস ইকবাল
৫২. মেজর আবু সৈয়দ গাজ্জালী দস্তগীর
৫৩. মেজর মুহাম্মদ মোশারফ হোসেন
৫৪. মেজর মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম সরকার
৫৫. মেজর মোস্তফা আসাদুজ্জামান
 ৫৬. মেজর তানভীর হায়দার নূর
৫৭. ক্যাপ্টেন মাজহারুল হায়দার 
এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদসহ ৫৮ জনের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে অভিযোগ করা হয়। বিডিআর বিদ্রোহের নামে ২০০৯ সালে ঢাকার পিলখানা সদর দফতরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ১৬ বছর পর গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর অন্তর্বতীর্ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। পিলখানায় সংঘটিত বর্বর হত্যাকাণ্ড তদন্তের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন প্রায় ১১ মাস তদন্ত শেষে ৩০ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করে। এই কমিশনের প্রধান হলেন মেজর জেনারেল (অব.) আলম ফজলুর রহমান।  ২০০৯ সালের এ ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন নিহত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের দুই মাসের মধ্যে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। তদন্তে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তি বিশেষ করে ভারতের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আলম ফজলুর রহমানসহ অন্য সদস্যরা প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টার হাতে তুলে দেন।
 কমিশন প্রধান ফজলুর রহমান জানান, ১৬ বছর আগের ঘটনার অনেক আলামত ধ্বংস হয়ে গেছে, অনেক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিদেশে চলে গেছেন। তবুও প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর নিরূপণ করতে তদন্তে সাক্ষ্যগ্রহণ, উপকরণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে চেষ্টা করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত ছিল এবং তার প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস।  
৯২১ জন ভারতীয় নাগরিকের বাংলাদেশে প্রবেশ
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিডিআর বিদ্রোহের সময় ৯২১ জন ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। তাদের মধ্যে অনেকের হিসাব মেলেনি। তাদের মধ্যে ৬৭ জনের অবস্থান অজানা। ভারতের উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনী ও বিডিআরকে দুর্বল করা এবং দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রচনায়, গোয়েন্দা তথ্য ও সাক্ষ্যে দেখা গেছে, বিদ্রোহের ফলাফলে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী দেশ ছিল ভারত। এজন্য সরকারকে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা চাইতে সুপারিশও করেছে তদন্ত দল। ৩০ নভেম্বর সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা শেষে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। ‎সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল আলম ফজলুর রহমান বলেন, বিডিআর বিদ্রোহ পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফল।  দেশকে অস্থিতিশীল করা, শেখ হাসিনার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা, সেনাবাহিনী ও বিডিআরকে দুর্বল করতে এই বিদ্রোহ ঘটানো হয়েছে। ‎আমাদের তদন্তে উঠে এসেছে বিদ্রোহের সঙ্গে কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজনের নাম তদন্তে উঠে এসেছে। তারা হলেন: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাহারা খাতুন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারেক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ, ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল আকবর।  ‎তিনি আরো বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের অনেকগুলো কারণ। ডাল—ভাত কর্মসূচি ও বিডিআর শপ তৈরি করা হয়েছিল। এতে ডিউটি অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এছাড়া যেভাবে প্ররোচিত হয়ে থাকুক, তারা (বিডিআর সদস্য) সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বাহিনীতে চাচ্ছিল না। বিডিআরের ভেতরে নানা ধরনের সংকট ছিল যা আমরা তদন্তে পেয়েছি। এছাড়াও, বিডিআর বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে পাঁচ সেনা কর্মকর্তাকে গুম করা হয়েছিল। এই বিষয়ে আমরা প্রমাণ পেয়েছি। বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে প্রতিবাদ করায় ছয় সেনা সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বিদ্রোহের সময় পিলখানার ৫ নম্বর গেটে র‌্যাবের সদস্যরা মোতায়েন ছিল। সেই সময় র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ছিলেন কর্নেল রেজা নূর। পিলখানায় হত্যাকাণ্ড চললেও তারা কোনো ভূমিকা রাখেনি। কারণ র‌্যাব সদস্যদের কর্নেল রেজা নূর নিষেধ করেছিল। যখন এই ধরনের বিদ্রোহ হয় তখন র‌্যাব অথবা পুলিশের কোনো আদেশের প্রয়োজন হয় না। এই বিষয়টা আমরা সুপারিশ করেছি। প্রতিবেশি দেশ হিসেবে বিডিআর বিদ্রোহ ঘটনার নেপথ্যে আমরা ভারতকে বুঝিয়েছি। যেখানে শেখ হাসিনা তার দলবল নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। বিদেশি সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সেখানে স্পষ্টভাবে ভারতের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ‎তিনি আরো বলেন, অপারেশন ডাল ভাত নয়, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করা ও বিডিআরকে দুর্বল করাই মূল উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু এটাকে আড়াল করে অপারেশন ডাল ভাত ও আর্মি অফিসারদের বিষয়ে ক্ষোভকে সামনে আনা হয়েছে। ‎এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীতে একটা নিয়ম আছে, যে একজন অফিসার ৩ বার বোর্ডে সুপারসেডেট (অন্য কাউকে পদোন্নতি দেয়া) হলে তার আর পদোন্নতি হয় না। এই বিদ্রোহে যারা সরকারকে সহযোগিতা করেছে তাদের মধ্যে এই সুপারসেডেট কর্মকর্তাদের সংখ্যা বেশি। এমন কি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে সুপারসেডেট ছিলেন। তার চাকরি থেকে চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিদ্রোহের পর তাকে পদোন্নতি দিয়ে বিজিবি প্রধান ও পরবর্তীতে সেনাপ্রধান করা হয়েছে। এভাবেই এসকল সেনা কর্মকর্তাকে পরবর্তীতে পদোন্নতি দিয়ে ভালো ভালো জায়গায় পদায়ন করা হয়েছে। দুর্বল জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করে সরকার নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে এটা করেছে। তদন্ত কমিশন দাবি করেন, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত। বিদ্রোহ দমনে সেনা অভিযান হলে শহরের ৩ কিলোমিটার দূরে আর্মিকে সরিয়ে রাখা হতো না। ‎‎এছাড়াও, কমিটির তদন্তে উঠে এসেছে সেনা কর্মকর্তাদের ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র। ভুক্তভোগী সেনা কর্মকর্তাদের স্বজনসহ বিভিন্ন ব্যক্তির জবানবন্দিতে উঠে এসেছে, কারো চোখ তুলে ফেলা হয়, কারো পা ভেঙ্গে দেয়া হয়, শারীরিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের উপর হামলা ও বাসায় লুটপাট করা হয়। স্বাধীন তদন্ত কমিশন পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিভিন্ন স্তরের মোট ৪৯ জনকে দায়ী করেছে। এ তালিকায় রাজনীতিবিদ, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য, র‌্যাব ও বিডিআর কর্মকর্তা, সাবেক ও বর্তমান আইজিপি এবং তিনজন সংবাদমাধ্যমকর্মীর নাম রয়েছে। কমিশন বলেছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার ২৪ জন কর্মকর্তা এ ঘটনায় সরাসরি ভূমিকা পালন করেন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নতুন করে তদন্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন। কমিশনের সূত্র বলেছে, এই ৪৯ ব্যক্তি বিভিন্নভাবে ঘটনা ঘটানো, সহায়তা, উসকানি বা দায়িত্বে অবহেলায় জড়িত ছিলেন। কমিশনের সূত্র বলেছে, অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘটনার মাস কয়েক আগেই তৎকালীন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস বিডিআরের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে পিলখানার কেন্দ্রীয় মসজিদে বৈঠক এবং সৈনিকদের অসন্তোষের তথ্য সংগ্রহ করতেন। পরে তাপসের বাসায় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের উপস্থিতিতে বিডিআর সদস্যদের আরেকটি বৈঠক হয়। বৈঠকে প্রথমে অফিসারদের জিম্মি করার পরিকল্পনা করা হয়। পরে সোহেল তাজ ও শেখ সেলিমের উপস্থিতিতে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার ২৪ জনের একটি দল বৈঠকে অংশ নেয়। সেখানে কর্মকর্তা হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং তাপসকে অভিযুক্তদের নিরাপদে পলায়নে সহায়তার দায়িত্ব দেয়া হয়। এসব বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, লেদার লিটন ও তোরাব আলী। এসব পরিকল্পনা সম্পর্কে ৪৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সিও কর্নেল শামস অবগত ছিলেন এবং তাপস তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে সিদ্ধান্তের অনুমোদন নিতেন। বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্যে বিডিআর সদস্যদের মধ্যে বিপুল অর্থ বিতরণ করা হয়েছিল।
ভারতীয় গোয়েন্দাদের সংশ্লিষ্টতা
তদন্ত কমিশনের সূত্র বলেছে, পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ভারতের সংশ্লিষ্টতার বিভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে বৈঠকের পর পুরো পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয় এবং সমন্বয়ের জন্য শেখ ফজলে নূর তাপসের বাসায় বৈঠক হয়। তদন্তে উঠে আসে, সংসদ সদস্য গোলাম রেজা ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে পিলখানা এলাকায় আলাউদ্দিন নাসিম, সাবেক এমপি মোর্শেদ, শেখ সেলিম ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তাকে দেখেছেন। প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সূত্র বলেছে, বিদ্রোহ শুরুর পর ক্যাপ্টেন তানভীর হায়দার তার নূর স্ত্রীকে পিলখানায় ভারতীয় এনএসজি সদস্যদের উপস্থিতির কথা জানান। তার স্ত্রী তাসনুভা মাহা জানান, তিনি বিডিআরের পোশাক পরা তিনজনকে হিন্দিতে গালাগাল করতে শোনেন। সেদিন পিলখানায় হিন্দি, পশ্চিমবঙ্গীয় টানে বাংলা এবং অচেনা ভাষায় কথোপকথন শোনার কথা একাধিক সাক্ষী জানিয়েছেন।
৮২৭ জন ভারতীয় পাসপোর্টধারী নাগরিকের বাংলাদেশে প্রবেশ
কমিশনের এক সদস্য জানান, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের ২৪ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮২৭ জন ভারতীয় পাসপোর্টধারী এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।  তাদের মধ্যে ৬৫ জনের বহির্গমনের তথ্য পাওয়া যায়নি। একই সময়ে এক হাজার ২২১ জনের বহির্গমনের তথ্য থাকলেও ৫৭ জনের আগমনের কোনো রেকর্ড ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। বিষয়টি আরো তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে কমিশন প্রতিবেদনে সুপারিশ করেছে। বিদেশি ভাষা শোনা, বহিরাগতদের পলায়ন, কল তালিকায় বিদেশি নম্বর, ক্যাপ্টেন তানভীরের শেষ কথোপকথনসহ বিভিন্ন তথ্যকে কমিশন প্রতিবেদনে ভারতের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। 
প্রতিবেদনে ১৭ রাজনীতিকের নাম
তদন্ত কমিশন সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, পিলখানা হত্যাকাণ্ড ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের ফল, যার পেছনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মোট ১৭ জন রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম এ ঘটনায় উঠে এসেছে। তারা হলেন শেখ হাসিনা, ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, কামরুল ইসলাম, সাহারা খাতুন, ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল, মাহবুব আরা গিনি, আসাদুজ্জামান নূর, তানজীম আহমদ সোহেল তাজ, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, শাহীন সিদ্দিক, কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, মেহের আফরোজ চুমকি, লেদার লিটন এবং মেজর (অব.) খন্দকার আবদুল হাফিজ।
 তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়ার পরই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয় এবং বিদ্রোহের শুরুতে তিনি ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ সেনা পাঠিয়ে তাদের উদ্ধারের জন্য শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে সেনা পাঠানো হয়নি এবং রাজনৈতিক সমাধানের নামে সময়ক্ষেপণ করা হয়। এতে হত্যাকারীরা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ঘটনার বিভিন্ন ধাপে উসকানি, তথ্য গোপন এবং অস্ত্র সমর্পণের নামে ‘প্রহসনমূলক’ উদ্যোগের নেতৃত্ব দেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে পিলখানার কোয়ার্টার গার্ডে গিয়ে তিনি উদ্ধারের কোনো উদ্যোগ নেননি। শেখ সেলিমকে হত্যার ‘সংকেতদাতা’ উল্লেখ করে কমিশন প্রতিবেদনে বলেছে, ঘটনার আগে তার বাসায় বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে কয়েকটি বৈঠক হয়। জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজমের ক্ষেত্রেও বিদ্রোহের আগে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার দিন মির্জা আজম সাদা কাপড় দেখিয়ে পিলখানায় প্রবেশ করেন, যা হত্যাকারী বিদ্রোহীদের জন্য এক ধরনের সংকেত ছিল। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজের বিষয়ে কমিশন দায়িত্বে অবহেলা ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উল্লেখ করেছে। 
সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ৩০ কর্মকর্তার নাম
কমিশন সূত্র বলেছে, তদন্তে সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ৩০ জনের বেশি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বহীনতা, অবহেলা ও সন্দেহজনক আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, নৌবাহিনীর প্রধান ভাইস এডমিরাল জহিরউদ্দিন আহমেদ, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল এসএম জিয়াউর রহমানসহ ১২ জন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্য সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) সিনা ইবনে জামালী, জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মইনুল ইসলাম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল হাকিম আজিজ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামসুল আলম চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইমামুল হুদা, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাহমুদ হোসেন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাহবুব সারোয়ার। কমিশনের তদন্ত সূত্র বলছে, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইনের সিদ্ধান্ত এবং আচরণ হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ দেয়। বিডিআরের ডিজি শাকিল পিলখানার ভয়াবহ পরিস্থিতি জানানোর পরও তিনি সেনা পাঠানোর স্পষ্ট নির্দেশ দেননি এবং যুক্তি দেন, অভিযান চালালে ভারতীয় বাহিনী দেশে প্রবেশ করতে পারে। জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ সামরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে ঘটনাস্থলে আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে যান। তার বাইরে ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবর, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মামুন খালেদ, মেজর জেনারেল (অব.) ইমরুল কায়েস ও মেজর জেনারেল (অব.) সুলতানুজ্জামান সালেহউদ্দিন; এনএসআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) শেখ মুনিরুল ইসলাম ও মেজর জেনারেল (অব.) টিএম জোবায়ের, র‌্যাবের চার কর্মকর্তা, বিডিআরের তিন কর্মকর্তা এবং পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তারা হলেন তৎকালীন ডিজি হাসান মাহমুদ খন্দকার, মেজর জেনারেল (অব.) রেজানুর রহমান খান, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আজিম আহমেদ (তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স)। কমিশন বলেছে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও তারা র‌্যাবকে নিষ্ক্রিয় রেখেছেন। বিডিআরের অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তা হলেন কর্নেল (অব.) সাইদুল কবির, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমদ এবং মেজর (অব.) গোলাম মাহবুবুল আলম চৌধুরী। দায়িত্বে অবহেলা, সত্য গোপন করা এবং অপরাধীদের পালানোর সুযোগ দেয়ার অভিযোগ উঠা পুলিশের কর্মকর্তারা হলেন সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার নাঈম আহমেদ, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) বাহারুল আলম, সাবেক অতিরিক্ত আইজি মনিরুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল কাহার আকন্দ ও তার তদন্ত দল। তৎকালীন আইজিপি শুধু নিজের মেয়ে ও পরিবারের কয়েকজনের  নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন।
সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
পিলখানা হত্যাকাণ্ড চলাকালে ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে তদন্ত কমিশন। সূত্র বলেছে, কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম লাইভ অনুষ্ঠান, টক শোসহ বিভিন্ন প্রচারের মাধ্যমে সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উত্তেজনাকর এবং একতরফা খবর প্রচার করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে, বিদ্রোহীরা বিদ্রোহের সময় সাংবাদিকদের হাতে একাধিক চিরকুট দেয়, যেখানে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও বিভ্রান্তিকর তথ্য লেখা ছিল। এই তথ্যগুলো যাচাই না করেই তাৎক্ষণিকভাবে প্রচার করে মিডিয়া ‘অবিবেচনাপ্রসূত আচরণ’ করে। কমিশনের মতে, এসব প্রচার জনমনে সেনাবাহিনীর প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি করে এবং বিদ্রোহীদের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পরও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে সম্পাদকীয় ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। কমিশন মনে করে, ২০০৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টার উপসম্পাদকীয়ও সেই সময়ের বিতর্কিত আলোচনার অংশ ছিল। 
 প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল পুরো হত্যাযজ্ঞে। দায় নিরূপণে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সেনাপ্রধান পর্যন্ত সকলকে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা এবং কিছু গণমাধ্যম ও সাংবাদিকের অপেশাদার ভূমিকাও উঠে এসেছে। কমিশন জানিয়েছে, পিলখানায় নিহত বা যেসব সদস্য রাষ্ট্রীয় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, তাদের নাম—পরিচয় ঠিকভাবে সংরক্ষিত হয়নি। তদন্তে দেখা গেছে, বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তি বিশেষত ভারতের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।
   কমিশনের সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, হত্যাকাণ্ডের বাহ্যিক ও প্রকৃত কারণ চিহ্নিত হয়েছে। রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সিভিলিয়ানদেরও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য নামের মধ্যে আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাহারা খাতুন, জেনারেল তারেক, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন, ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান জেনারেল আকবর। পটভূমি হিসেবে বলা যায়, ২০০৯ সালের ২৫—২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় ৫৮ সেনা সদস্যসহ ডিজির স্ত্রী নাজনীন হোসেন শাকিল ও আরো অনেকে হত্যা করা হয়। দুই বছর আগে থেকেই পরিকল্পনা চলছিল এবং ২০০৭ সালে বিপথগামী বিডিআর সদস্যরা ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছিলেন। তারপর বিভিন্ন বৈঠকের মাধ্যমে ২০০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি হত্যার পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়। 
(লেখাটি আমার ‘ভারতে মুসলিম—বিরোধী রায়ট’ থেকে নেয়া।)