Search This Blog

Monday, September 28, 2026

কালাপানির বাঘ খ্যাত সত্যিকারের শের' শের আলী আফ্রিদি


কালাপানির বাঘ খ্যাত সত্যিকারের শের' শের আলী আফ্রিদি

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে কিশোরযোদ্ধা ক্ষুদিরাম বসু বিহারের ভাগলপুর জেলার মোজাফ্ফরপুরের একজন ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে গিয়ে ভুলক্রমে দুজন নিরীহ ব্রিটিশ মহিলাকে হত্যা করেছিলেন। “একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি,হাসি হাসি পড়ব ফাঁসি দেখবে জগৎ বাসী! , বড় লাটকে মারতে গিয়ে মারলাম আরেক ইংল্যান্ডবাসী।" সহ নানা গান, কবিতা, সিনেমা, নাটক রচিত হয়েছে ক্ষুদিরামকে নিয়ে। দেশবাসী ক্ষুদিরাম বসুর ত্যাগ ও অবদানের প্রতি সকলেই কৃতজ্ঞ। অথচ ক্ষুদিরাম ব্রিটিশ কোন বড় লাটকে মারেন নি, মারতেও যান নাই। মিসেস কেনেডি নামক নিরীহ ব্রিটিশ মহিলাকে হত্যার দায়ে তাঁর ফাঁসি হয়। তারপরও দেশপ্রেমের মানদন্ডে ত্যাগী ক্ষুদিরাম বসুর অবস্থান অনেক উঁচুতে!

কিন্তু,

সমগ্র ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বেনিয়াদের প্রায় ২০০ বছর শাসনে একজন মাত্র বড় লাটকে হত্যা করা সম্ভব হয়েছিল। ভাইসরয় পদবির মানে হচ্ছে ব্রিটেনের রাণির প্রতিনিধি। ব্রিটেনের রাণী ও প্রধানমন্ত্রীর পরে ভারতে নিয়োজিত ভাইসরয় হচ্ছেন তাদের প্রশাসনের তৃতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি। ব্রিটিশ ভারতের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। সেই বড় লাট লর্ড মেয়ো'কে হত্যাকারী উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের একমাত্র শের' বিপ্লবী শের আলী আফ্রিদি'র ইতিহাসকে কেন দাবিয়ে রাখা হয়েছে?
ছোটখাটো পুলিশ কর্মকর্তা, সেনা সদস্য, বেসামরিক ব্রিটিশ নাগরিক, ইংলিশ ক্লাবে আক্রমন, কোন প্রদেশের জেলার মহকুমার অধীন কোন ম্যাজিস্ট্রেটকে হত্যা করা কোন কোন বিপ্লবীকে নিয়ে হাজারো গান, কবিতা, শহীদ বেদি, স্থানের নাম করা হলেও কেন একমাত্র ব্যক্তি যিনি বড় লাটকে হত্যা করেছেন, সেই বাঘের বাচ্চাকে নিয়ে কোন আলোচনা কেন হয়না?

কে ছিলেন এই শের আলী আফ্রিদি?

শের আলী আফ্রিদির আদি নিবাস পাকিস্তানের খাইবারপাস প্রদেশের নিকটবর্তি জামরুদ গ্রামে। পিতার নাম ঊলি আলি খান। ধারণা করা হয় তিনি ছিলেন কথিত ওয়াহাবী* আন্দোলনের সাথে যুক্ত।

প্রথম জীবনে তিনি ব্রিটিশ সরকারের অধীনে মাউন্ট পুলিশে দক্ষতা ও সততার সাথে কাজ করেন। পরে কমিশনারের অধীনেও কাজ করেন।

১৮৬৭ সালে শীর্ষস্থানীয় ওয়াহাবী নেতা মৌলানা জাফর থানেশ্বরী সহ অন্যান্য বিপ্লবীকে ধরিয়ে দেওয়া ও পুলিশের গুপ্তচরবৃত্তির সন্দেহে হায়দার আলি নামক এক যুবককে হত্যা করেন শের আলি। এতে সাজা হিশেবে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত হন তিনি।
অনেক ইতিহাস আবার এটাকে পারিবারিক কলহে হত্যাকাণ্ড বলে চালিয়েছেন। কেননা, ওয়াহাবী আন্দোলনের কারণে ফাঁসি হলে শহীদ হিশেবে তিনি আরো অনেকের অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবেন।
যাইহোক, তাকে পেশোয়ার থেকে গ্রেফতার করা হয়। তিনি প্রথম থেকেই নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ও নিরপরাধ বলে দাবি করেন। পরে আপিলে তার সাজা কমে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। 
তাকে নির্বাসন করা হয় আন্দামানে।। বলা জরুরী যে, ইতোমধ্যে যারা ব্রিটিশদের বিরোদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিল তাদেরকে আন্দামানে নির্বাসন দেওয়া হয়েছিল।

শের আলী আফ্রিদি ছিলেন বেশ ধার্মিক ও দয়ালু। জেলখানায়ও তার ব্যবহার ছিল অনন্য। সদা শান্ত-শিষ্টভাবে থাকতেন। তিনি নাপিতের কাজ করে যা আয় করতেন তা জেলে থাকা সহযোগীদের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। জেলে তিনি খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। কিন্তু তার হৃদয়ে জ্বলছিল আগুন। নির্জন দ্বীপে শত শত বিপ্লবীদের নির্বাসন ও অত্যাচারের বদলা নেওয়ার কথা ভাবতে থাকেন তিনি।

অবশেষে সে সুযোগও চলে আসলো। ১৮৭২ সালের ০৮ ফেব্রুয়ারি বিকেলে লর্ড মেয়ো হ্যারিয়েট দ্বীপের সানসেট পয়েন্টে সূর্যাস্ত দেখতে যান।বসেসময় দেহরক্ষী বেষ্টিত থাকলেও তাকে অতর্কিতে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন শের আলি। ভারতবর্ষের বৃট্রিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে শের আলি খান এমন এক ব্যক্তি যিনিই একমাত্র ভারতের গভর্নর জেনারেল কে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার এই হত্যা, বৃটেন তথা ভারতবর্ষ ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তি নাড়িয়ে দেয়। 
ইতোমধ্যে শের আলী গ্রেফতার হন। বলা বাহুল্য যে, তিনি পালিয়ে যান নি। এবং বড় লাটের নিরাপত্তারক্ষীরাও কাছে ছিলেন। পরের দিন খুবই দ্রুততার সহিত বিচার কাজ শুরু হয়। আদালত তাকে জিজ্ঞাসা করে, লর্ড মেয়ো হত্যায় তার সাথে আর কেউ জড়িত আছে কিনা।
শের আলী বিশ্বাস করতেন স্বয়ং আল্লাহই তাকে বড় লাটকে হত্যা করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। আদালতের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খুদা নে হুকুম দিয়া। মেরা শরীক কোই আদমি নেহি। মেরা শরীক খুদা হ্যায়।’ অর্থাৎ আমাকে একাজ করার জন্য খোদা হুকুম দিয়েছেন। আমার শরীক অন্য কেউ নাই, আমার শরীক হচ্ছেন খোদা।

বিচারে শের আলির ফাঁসি হয়। ১৮৭৩ সালের ১১ মার্চ আন্দামানের ভাইপার দ্বীপে তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। ফাঁসির দিন ফাঁসির দড়িকে চুমু খেয়ে সেই দড়ি পড়ে নেন এবং"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু"এই কথা দুবার বলার পরই তাঁর শ্বাস রোধ হয়ে যায়। 

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের অমর শহীদ ‘শের আলী আফ্রিদি’।  
বড়লাটকে হত্যা করে ব্রিটিশ শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েও যিনি স্থান পান নি ইতিহাসের পাতায়! 
কারন বড় লাটকে হত্যা করা শের আলী কোন আর্যরা ছিলনা, নাম ছিল আলী, তিনি ছিলেন একজন মুসলিম! মুসলিম বলেই তাকে কেউ চিনে না বা চিনতে দেওয়া হয়নি। দাবিয়ে রাখা হয়েছে ইতিহাস। 

আচ্ছা, ইতিহাস দাবায়া রাখা যায়?

বিস্তারিত জানতে রেফারেন্সঃ

১ ) শের ই শহীদ দ্বীপ , লেখকঃ- নারায়ণ সান্যাল, দেব সাহিত্য কুটীর , কলকাতা ২০০৩। 
( ২) ক খ মুক্তির সংগ্রামে ভারত । বাংলা আকাদেমী পশ্চিমবঙ্গ ভারত ১৯৯৬। 
( ৩) "উনি বীর ; বাকীরা ?" আনন্দবাজার পত্রিকা , ২৪ শে ডিসেম্বর ২০১৭।
৪) কালাপানির কেচ্ছা, পর্ব ৬, বাংলা ট্রিবিউন।
৫) আন্দামানের আর্তনাদ, সাবিনা আহমদ, অন্যদিগন্ত।
৬) Delhi Red port Museum Gallay, Delhi, India.
৭) ভাইসরয়ের খুন, ইমরান রাইহান।

কলমেঃ 
মঈন উদ্দিন চিশতী, 
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। 

ইতিহাসের নানা জানা-অজানা তথ্যাদি জানতে ও জানাতে যুক্ত হোন আমাদের ইতিহাস অন্বেষণ এ।

মোহসীনউদ্দীন দুদু মিয়া: তিনি‌ ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সমাজ সংস্কারক ও ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবক্তা হাজী শরীয়তউল্লাহর একমাত্র পুত্র ।


মোহসীনউদ্দীন দুদু মিয়া: তিনি‌ ছিলেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত সমাজ সংস্কারক ও ফরায়েজী আন্দোলনের প্রবক্তা হাজী শরীয়তউল্লাহর একমাত্র পুত্র । ১৮১৯ সালে মাদারীপুরে জন্ম নেওয়া এই মহান পুরুষ ১৮৪০ সালে পিতার ওফাতের পর ফরায়েজী আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণ নেন। 

সে সময় বাংলার নিপীড়িত কৃষকসমাজ একদিকে হিন্দু জমিদার, অন্যদিকে ইউরোপীয় নীলকরদের দ্বিমুখী শোষণে জর্জরিত ছিল। দুদু মিয়া নিরস্ত্র নিপীড়িত কৃষকদের সংগঠিত করে জমিদার ও নীলকরদের ভাড়াটে লাঠিয়াল বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, এবং তাদের শক্তিমত্তা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে দেন। ফলে ১৮৩৮ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ দুই দশক ফরায়েজী অধ্যুষিত এলাকায় শান্তি বজায় ছিল।

দুদু মিয়ার সবচেয়ে বিপ্লবী ঘোষণা ছিল যে, জমি থেকে অন্যায় ভাবে খাজনা আদায় আল্লাহর আইনের পরিপন্থী। জমির হক একমাত্র কৃষকের। শ্রমের ওপরই যে জমির প্রকৃত মালিকানা নিহিত, এই মতবাদ সেকালের বাংলায় ছিল এক যুগান্তকারী চিন্তা। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নিপীড়িত কৃষকরা তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে তাঁর পতাকাতলে সমবেত হয়। একইসাথে তিনি গ্রামীণ সমাজে নিজস্ব বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে ফরায়েজী খলিফার অনুমতি ছাড়া সরকারি আদালতে যাওয়া নিষিদ্ধ করেন। এটি ছিল এক ধরনের সমান্তরাল সামাজিক শাসনব্যবস্থা, যা জনগণকে ঐক্যবদ্ধ ও স্বনির্ভর করে তোলে।

১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লবের পর তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়, ১৮৬১ সালে মুক্তি পান এবং ১৮৬২ সালের ২৪/২৫ সেপ্টেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন।

#searchinghistory 
#MuslimHistory 
#farayezimovement

মাত্র ১৫ মাস শাসন - এপ্রিল ১৭৫৬ থেকে জুন ১৭৫৭ - তবুও সিরাজ ইতিহাসে এত বড় কেন, তার ৩ টে কারণ আছে:


♦️মাত্র ১৫ মাস শাসন - এপ্রিল ১৭৫৬ থেকে জুন ১৭৫৭ - তবুও সিরাজ ইতিহাসে এত বড় কেন, তার ৩ টে কারণ আছে:
⚔️*১. ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শুরুটা ওকে দিয়েই:*
সিরাজ হারলেন বলেই পলাশীর যুদ্ধ হলো, আর পলাশী থেকেই ব্রিটিশরা বাংলার দেওয়ানি পেলো, তারপর ২০০ বছরের শাসন। মানে ভারতে ব্রিটিশ রাজের দরজাটা সিরাজের পতন দিয়েই খুলেছিল। ও জিতলে ভারতের ইতিহাস অন্যরকম হতো। তাই ব্রিটিশরা নিজেরাই ওকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি লিখেছে।
🍁*২. বয়স আর বিশ্বাসঘাতকতার নাটক:*
গদিতে বসার সময় বয়স মাত্র ২৩। চারপাশে ছিল নিজের লোক - নানা আলিবর্দী খাঁ, মাসি ঘসেটি বেগম, সেনাপতি মীরজাফর, জগৎ শেঠ, রায়দুর্লভ। এত কম বয়সে সবার ষড়যন্ত্র সামলাতে পারেননি। এই অল্পবয়সী নবাবের বিশ্বাসঘাতকতায় মৃত্যুটা বাঙালির কাছে একটা ট্র্যাজেডি হয়ে গেছে, ইতিহাসের চেয়েও বেশি আবেগ।
🚨*৩. কলকাতা আর কৃষ্ণনগরের রাজনীতি:*
সিরাজ ইংরেজদের বিনা অনুমতিতে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ বানানো বন্ধ করতে বলেছিলেন, ইংরেজরা শোনেনি। তাই কলকাতা আক্রমণ করেন। তখনকার "অন্ধকূপ হত্যা"র কাহিনী ইংরেজরা সারা ইউরোপে প্রচার করে সিরাজকে নিষ্ঠুর বানিয়ে দেয়। আবার পরবর্তীতে জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিকরা - যেমন অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় - ওকেই আবার দেশপ্রেমিক, স্বাধীনতার শেষ প্রদীপ বানিয়ে দেন।
📚মানে ১৫ মাসের শাসক হলেও, সিরাজ হলেন সেই মোড় - যেখানে বাংলা স্বাধীন ছিল আর পরদিন থেকে পরাধীন হয়ে গেল। তাই ৩০০ বছর পরেও বাঙালি ওকে ভুলতে পারে না।
#NawabSirajudDulah, #BattleOfPlassey, #BengalHistory, #BritishColonialism, #IndianLeaders, #HistoricalFigures, #ColonialResistance, #BengalNawabs, #IndiaHistory #fbpost

Saturday, September 26, 2026

১৫ মিনিটের জায়গায় ১০০ মিনিটের ভাষণ! বিশ্বনেতাদের সামনেই জাতিসংঘ সনদ ছিঁড়ে মেঝেতে ছুড়ে মেরেছিলেন গাদ্দাফি.....!😮


১৫ মিনিটের জায়গায় ১০০ মিনিটের ভাষণ! বিশ্বনেতাদের সামনেই জাতিসংঘ সনদ ছিঁড়ে মেঝেতে ছুড়ে মেরেছিলেন গাদ্দাফি.....!😮

মুয়াম্মার গাদ্দাফি ​ক্ষমতায় আসার দীর্ঘ ৪০ বছরে গাদ্দাফি কখনো জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যাননি। ২০০৯ সালে যখন প্রথমবার নিউইয়র্কে পা রাখলেন, পুরো বিশ্বই অনুধাবন করেছিলো, কিছু একটা ধামাকা হতে চলেছে। আর ঠিক সেটাই হয়েছিলো....
​
জাতিসংঘের নিয়মানুযায়ী প্রতি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্য দেওয়ার জন্য বরাদ্দ সময় থাকে মাত্র ১৫ মিনিট। কিন্তু গাদ্দাফি যখন পডিয়ামে উঠলেন, ​ঘড়ির কাঁটার তোয়াক্কা না করে অনর্গল আরবি ভাষায় কথা বলা শুরু করলেন তিনি। ১ মিনিট, ২ মিনিট করতে করতে সময় পার হয়ে গেল টানা ১ ঘণ্টা ৩৭ মিনিট (প্রায় ১০০ মিনিট)!
​বেচারা জাতিসংঘের অফিশিয়াল লিবীয় দোভাষী ফুয়াদ জালিট গাদ্দাফির সেই হাই-ভোল্টেজ ভাষণ নন-স্টপ অনুবাদ করতে করতে এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন যে, ভাষণের ৮০ মিনিটের মাথায় লাইভ মাইক্রোফোনেই প্রায় মূর্ছা যাওয়ার মতো অবস্থায় চিৎকার করে বলে ওঠেন, "আই কান্ট টেক ইট অ্যানিমোর!" (আমি আর পারছি না!)। এরপর বাধ্য হয়ে অন্য একজন দোভাষী এসে বাকি ২০ মিনিট সামলান! 😂
​
গাদ্দাফির মূল ক্ষোভটা ছিল জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ৫টি দেশের (আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন) একচেটিয়া "ভেটো" পাওয়ারের ওপর। তিনি সরাসরি পরাশক্তিগুলোর মুখের ওপর আ--ক্র--মণ করে বসেছিলেন।
​তিনি সোচ্চার কণ্ঠে বলেন, ১৯৪৫ সাল থেকে আজ পর্যন্ত এই নিরাপত্তা পরিষদ ছোট দেশগুলোকে কোনো নিরাপত্তা দিতে পারেনি। তারা দিয়েছে শুধু যু**, আ-ক্র-ম-ণ আর নিষেধাজ্ঞা! এটাকে নিরাপত্তা পরিষদ বলা ভুল, এটা আসলে একটা স**সী পরিষদ!
​এখানেই শেষ নয়, তিনি আমেরিকার দিকে আঙুল তুলে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি হ** এবং ২০০৩ সালের অন্যায্য ইরাক যু**-এর আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেন। এমনকি সেসময় ছড়িয়ে পড়া সোয়াইন ফ্লু ভাইরাস কোনো ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা সামরিক জৈবাস্ত্র কি না তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেন!
​
ভাষণের একপর্যায়ে গাদ্দাফি তাঁর হাতে থাকা জাতিসংঘ সনদের অফিসিয়াল বইটা সবার সামনে উঁচিয়ে ধরেন। তিনি বলেন, এই সনদের প্রস্তাবনায় বিশ্বের সব দেশের সমান অধিকারের কথা লেখা আছে, কিন্তু বাস্তবে পরাশক্তি দেশ
গুলোর কাছে ছোট দেশগুলোর এক পয়সারও দাম নেই!
​এই কথা বলতে বলতেই চরম ক্ষোভে বিশ্বনেতাদের সামনে জাতিসংঘ সনদের পাতা তোড়মোড় করে ছিঁড়ে ফেলেন! এরপর সেই ছিঁড়ে ফেলা কাগজের টুকরোগুলো চরম বিরক্তি নিয়ে সামনে বসা জাতিসংঘের সভাপতি ও কর্মকর্তাদের ডেস্কে ছুড়ে মারেন। পুরো হলরুমে তখন পিনপতন নীরবতা, বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা হা হয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন!
​
গাদ্দাফি যেখানেই যেতেন, নিজের সাথে ঐতিহ্যবাহী বিলাসবহুল ‘বেদুঈন তাঁবু’ নিয়ে যেতেন। নিউইয়র্কে এসেও তিনি কোনো ফাইভ স্টার হোটেলে না থেকে তাঁবুতে থাকার বায়না ধরেন!
​ম্যানহাটনের সেন্ট্রাল পার্ক থেকে শুরু করে বিভিন্ন জায়গায় তাঁবু খাটানোর চেষ্টা করে যখন মার্কিন সিকিউরিটি টিমের কাছে বাধা পান, তখন তিনি সোজা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মালিকানাধীন একটা এস্টেটের লন ভাড়া নিয়ে বিশাল তাঁবু টাঙিয়ে দেন! পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসন আইন ভঙ্গের নোটিশ দিলে রাতের আঁধারে সেই তাঁবু গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয় তাঁর সিকিউরিটি টিম।

গাদ্দাফির এই ভাষণ আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যে হয়তো পড়ে না। অনেকে একে তাঁর খামখেয়ালী বা পাগলামি বলতেই পছন্দ করেন। কিন্তু পরাশক্তিগুলোর দ্বিমুখী নীতি এবং জাতিসংঘের অকার্যকারিতা নিয়ে সেদিন ওই ১০০ মিনিটে তিনি যে যে তেতো সত্যগুলো বলে গিয়েছিলেন, তা আজও আন্তর্জাতিক রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা।

আজকে যেখানে পরাশক্তিগুলোর জুতো চা* *টতে আর তাদের পায়ের নিচে পড়ে থাকতে পছন্দ করে, নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে জি-হুজুর করে চলে সেখানে গাদ্দাফির মতো বুক টান টান করে দাঁড়ানোর মতো সাহসী কলিজা কজনের আছে?
গাদ্দাফির লাইফস্টাইল বা রাজনীতি নিয়ে হাজারটা বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু আমেরিকার বুকের ভেতর ঢুকে তাদেরই নাকের ডগায় দাঁড়িয়ে বিশ্বশোষণের বিরুদ্ধে কথা বলার মতো ডেয়ারিং পাওয়ার মুভ ক'জনের আছে! আজকের বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে তাকালে বোঝা যায়,  দিনশেষে, ইতিহাস দাসদের মনে রাখে না, ইতিহাস মনে রাখে সিংহের মতো গর্জন করা এই রাজাদেরই! 🫡

​
​
   #diaryofshe #UNGeneralAssembly

Thursday, September 24, 2026

পাকিস্তানি সেনারা ২৫ মার্চ নিরীহ বাঙালির উপর ঝাপিয়ে পড়ে। বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা একটা ফিকশনকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে তা হল বাঙালিরা একদম চুপচাপ ছিল। পাকিস্তানিরা নিরীহ বাঙালির উপর হামলা করে।


🖋পাকিস্তানি সেনারা ২৫ মার্চ নিরীহ বাঙালির উপর ঝাপিয়ে পড়ে। বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা একটা ফিকশনকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে তা হল বাঙালিরা একদম চুপচাপ ছিল। পাকিস্তানিরা নিরীহ বাঙালির উপর হামলা করে।

তবে বাস্তবতা হল শেখ মুজিব একদিকে বক্তব্য দিচ্ছিলেন বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। অন্যদিকে ভারত থেকে সামরিক প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত তার ক্যাডার বাহীনিকে লেলিয়ে দেয় অবাঙালিদের পেছনে।

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা মহিউদ্দিন আহমেদ একটা ঘটনা উল্লেখ করেছেন(গর্ব সহকারে), ❝ ২৬ অক্টোবর (১৯৬৯) শেখ মুজিব কয়েক দিনের জন্য লন্ডন সফরে যান। সবাই জানত তিনি আগরতলা মামলা চলাকালে প্রবাসী বাঙালিদের এবং তাঁর কৌসুলি স্যার টমাস উইলিয়ামকে কৃতজ্ঞতা জানাতে লন্ডনে যাচ্ছেন । যাওয়ার আগে তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ সহচর নীলক্ষেত-বাবুপুরা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ও আজিমপুর-নিউ পল্টন ইউনিয়ন কাউন্সিলের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম তালুকদারকে ইঙ্গিতে বলেন, ‘লাল ফিতা পেলেই ধরবে।' লাল ফিতা বলতে তালুকদার বুঝলেন পাঞ্জাবি সেনা। ৩ নভেম্বর তালুকদার নীলক্ষেতে তাঁর অফিসে বসে কাজ করছিলেন। সেখানে মন্টু, খসরু এবং আরও কয়েকজন ছিলেন। খবর এল, নিউমার্কেটের ভেতরে সেনা ঢুকেছে । কয়েকজনের গায়ে ইউনিফর্ম, বাকিরা সাদাপোশাকে। তখন বেলা ১১টা। নিউমার্কেটের ১ নম্বর ও ২ নম্বর গেটের মাঝামাঝি জায়গায় তাঁদের ওপর অতর্কিতে হামলা হলো । পিটিয়ে এবং ছুরি মেরে কয়েকজনকে হত্যা করা হয়। ❞

১৯৭১ সালে তাদের সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ব্যপকভাবে ছড়িয়ে পরে। ২ মার্চ আওয়ামী লীগের ক্যাডারেরা নিউমার্কেট ও বায়তুল মোকাররমের অস্ত্র দোকানগুলো থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে। তারা এসব অস্ত্র ট্রাকে করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিয়ে যায়। সেখানে ছাত্ররা একটি উন্মুক্ত ফায়ারিং রেঞ্জে অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। তারা অবাঙালিদের মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, দোকানপাট ও সিনেমা হল লুট করতো।

এছাড়া তারা ঢাকা শহরে বিহারি, গুজরাটি, মনিপুরী, আসামি সহ সব অবাঙালিদের আবাসিক এলাকায় হামলা করে। মুক্তিপণ আদায়ে ধনী পশ্চিম পাকিস্তানিদের অপহরণ করা হয়। ফলে আতঙ্কিত বহু অবাঙালি সেনানিবাসে আশ্রয় গ্রহন করে। 

৩ মার্চ পল্টন ময়দানে এক সমাবেশে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শাজাহান সিরাজ ‘স্বাধীনতার ইশতেহার' পাঠ করেন। অনুষ্ঠানে স্বাধীনতার পক্ষে চার ছাত্র নেতা নূরে আলম সিদ্দিকী, শাজাহান সিরাজ, আ স ম আবদুর রব এবং আবদুল কুদ্দুস মাখন শপথ বাক্য পাঠ শেষে ‘জয়বাংলা বাহিনী'র উপ-প্রধান (ডেপুটি চীফ) কামরুল আলম খান খসরু আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গান ফায়ার’ করে সশস্ত্র যুদ্ধের ঘোষণা জানান।

একই দিনে ৩ মার্চ আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীদের নেতৃত্বে উন্মত্ত জনতা ঢাকার নবাবপুর, ইসলামপুর ও পাটুয়াটুলির মতো জায়গায় হাজার হাজার অবাঙালির বাড়িঘরে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ড চালায়। জিন্নাহ এভিনিউতে অবাঙালি মালিকানাধীন বহু দোকানপাট লুট করা হয়। শহরের উপকণ্ঠে একটি বস্তিতে অবাঙালিদের ৫০টি ঘর পুড়িয়ে দেয়া হয় এবং তাদের অনেকে জীবন্ত দগ্ধ হয়। আওয়ামী লীগ হাইকমান্ডের নির্দেশে ঢাকায় টেলিভিশন ও রেডিও স্টেশনে পাকিস্তানের জাতীয় সঙ্গীতের পরিবর্তে রবীন্দ্রনাথের পূর্ব বাংলা বিরোধী গান ‘আমার সোনার বাংলা' বাজানো হয়।

৬ মার্চ ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগার ভেঙ্গে ৩৪১জন কয়েদী পালিয়ে গিয়ে আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের সঙ্গে যোগ দেয়।  ককটেল এবং বোমা তৈরির উদ্দেশ্যে ছাত্র লীগের সশস্ত্র ক্যাডাররা ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরী ও পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট থেকে রাসায়নিক বিস্ফোরক লুট করে। 

১৬ থেকে ২৩ মার্চ জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের আড়ম্বরপূর্ণ শাসনতান্ত্রিক আলোচনার সময়ও আওয়ামী লীগ তাদের সমান্তরাল সরকারের কার্যক্রম অব্যাহত রাখে এবং ঢাকা ও তার আশপাশের কয়েকটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে দলীয় ক্যাডারদের প্রকাশ্যে প্রশিক্ষণ দেয়। অবাঙালিদের বাড়িঘরে হামলার ঘটনা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। একদল দাঙ্গাবাজ ক্যাডার ঢাকায় সেনাবাহিনীর একটি জীপে হামলা চালায় এবং জীপের আরোহী ৬ সৈন্যকে অপহরণ করে। শহরে পুলিশের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র লুট করা হয়। ঢাকা সেনানিবাসে পাকিস্তানি সৈন্যদের কাছে খাদ্য সরবরাহের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। 

২৩ মার্চ চীনা কন্স্যুলেটে লীগের বানানো নতুন পতাকা উত্তোলন করতে গেলে লীগের সঙ্গে তাদের বিরোধ বাধে। চীনারা তাদেরকে এ পতাকা উত্তোলনে বাধা দেয়। আওয়ামী লীগের বিক্ষোভকারীরা বহু স্থানে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা টুকরো টুকরো করে এবং পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি পায়ের নিচে পিষ্ট করে। ইপিআর ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা সপক্ষ ত্যাগ করায় আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের শক্তি বৃদ্ধি পায়।

পুরো প্রদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়৷ ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি ছিল আরো ভয়াবহ। সর্বত্র অবাঙালিদের উপর হত্যাযজ্ঞ চলে। কুষ্টিয়াতে আওয়ামী লীগের ক্যাডারেরা একজন লাহোরের অধিবাসী সরকারি কর্মকর্তা ওয়াকার নাসিম বাটের মাথা কেটে, কাটা মাথা নিয়ে আনন্দ মিছিল করে (ছবিতে)। 

খুলনা, চট্রগ্রাম, ময়মনসিংহসহ সারা দেশে বিহারিদের উপর হত্যাযজ্ঞ চলে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে এর ভয়াবহতা ছিল সবচেয়ে বেশি। পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, সৈয়দপুরে হাজার হাজার বিহারিকে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। 

বাঙালিদের প্রিয় সাংবাদিক এন্থনি মাসকোরেনহাস সানডে টাইমসের প্রতিবেদনে লিখেছিলেন,

❝ Thousands of families of unfortunate Muslims, many of them refugees from Bihar were mercilessly wiped out. Women were raped or had their breasts torn out... Children did not escape the horror: the lucky ones were killed with their parents.... The real toll have been as may high as 100,000. ❞ 

বাঙালি ইতিহাসবেত্তা প্রফেসর তাজ হাশমি তার ক্যারিশমা দেখিয়েছেন এক লাইনে ২৫ মার্চ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে অবাঙালিদের অবস্থা কেমন ছিল তা বিশ্লেষণ করে। তবে বাঙালি সেই লাইন নিতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। 

এ সময় আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকরা খোদ ঢাকার পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রায় ১৫ হাজার লোড করা রাইফেল লুট করে। গোটা ঢাকা শহর জুড়ে ব্যারিকেড ও সড়ক প্রতিবন্ধকতা দেখা যায়। বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল বোমা, ককটেল বিস্ফোরিত হয়।

সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা সংস্থা জানতে পারে আওয়ামী লীগ
 ২৬ মার্চ প্রত্যুষে গোটা পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের সহায়তায় একটি সশস্ত্র অভ্যুত্থান ঘটাতে যাচ্ছে। সশস্ত্র অভ্যুত্থান অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের নির্ধারিত সময়ের কয়েক ঘণ্টা আগে ২৫ মার্চ গভীর রাতে সেনাবাহিনীর ইউনিটগুলো ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়ে আসে এবং কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রাদেশিক রাজধানীতে আওয়ামী লীগের অভ্যুত্থান নস্যাতে বেশ কয়েকটি জায়গায় আগেভাগে আঘাত হানে। 

বিস্তারিত পড়াশোনা:

১। ব্লাড এন্ড টীয়ার্স, কুতুবউদ্দিন আজিজ 
২। ডেড রেকনিং, শর্মিলা বোস
৩। 50 years of Bangladesh, Prof. Taj Hashmi, (Chapter 7)
৪। আওয়ামী লীগ, উত্থান পর্ব, মহিউদ্দিন আহমেদ পৃ: ২০৯

©️ একজন দেশপ্রেমিক

Wednesday, September 16, 2026

জিন্নাহর রাজনীতিটা না বুঝলে আপনি আজকের বাংলাদেশের রাজনীতিটাই বুঝবেন না।


জিন্নাহর রাজনীতিটা না বুঝলে আপনি আজকের বাংলাদেশের রাজনীতিটাই বুঝবেন না। কে কার সাথে কী করতেসে, কেন করতেসে, কোন কথাটা কোন জায়গা থেকে আসতেসে, কিছুই ধরতে পারবেন না। আপনি ঘটনা ঘটতে দেখবেন আর হাঁ কইর‍্যা তাকাইয়া থাকবেন।

আজ বাংলাদেশের সামনে যেই চ্যালেঞ্জটা দাঁড়াইয়া আছে, ওইটার মোকাবেলা করতে হইলে আপনাকে জিন্নাহর রাজনীতিটাই করতে হবে। কোনো রাখঢাক ছাড়া। আনএপোলোজিটিক্যালি। কোন গ্লানি ছাড়া। কোন ব্যখ্যা দেয়া ছাড়াই।

জিয়াউর রহমান ঠিক ওইটাই করসেন। শুনতে খারাপ লাগবে। জিয়ার রাজনীতির এসেন্স যে জিন্নাহর পলিটিক্যাল মিশন এইটা প্রমাণ কইর‍্যা দেওয়া যাবে।
আর এইজন্যই ভারতমাতা জিন্নাহকে অপ্রাসঙ্গিক কইর‍্যা রাখতে চায়। লোকটা মইর‍্যা গেসে আটচল্লিশ সালে। আটাত্তর বছর হইয়া গেল। তবু ছবি টাঙাইলে ছিঁড়তে হয়। কেন?

কারণ প্রশ্নটা জিন্নাহর না। প্রশ্নটা হইলো একটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর আলাদা রাজনৈতিক অস্তিত্ব থাকতে পারে কিনা। জিন্নাহকে বৈধ মানলে ওই প্রশ্নের উত্তর হ্যাঁ। আর ওই উত্তরটা দিল্লির চলবে না।

জিন্নাহ ঘৃণা কোনো বাংলাদেশের নিজস্ব জিনিস না। ওইটা হিন্দুত্ববাদের রাজনীতি। আমদানি করা, প্যাকেট খুইল্যা আপনার হাতে ধরাইয়া দেওয়া, আর আপনি ওইটারে চেতনা বইল্যা বুকে জড়াইয়া ধরসেন। আপনাকে কী কী মনে রাখতে বলা হয়, আর কী কী ভুলতে বলা হয়। মনে রাখতে বলা হয় ক্ষতটা। ভুলতে বলা হয় ক্ষতটা কে তাজা রাইখ্যা লাভ করে। মনে রাখতে বলা হয় ভারতমাতার বন্ধুত্ব। ভুলতে বলা হয় সেই বন্ধু আপনাকে কী দিসে।

মনে রাখতে বলা হয় কৃতজ্ঞতা। ভুলতে বলা হয় কৃতজ্ঞতার মেয়াদ থাকে, নাগপাশের থাকে না।

মনে রাখতে বলা হয় আপনি বাঙালি। ভুলতে বলা হয় ওইপারের বাঙালি আপনাকে কোনোদিন নেয় নাই। আপনাকে বাঙ্গালি বলে স্বীকারই করে নাই। কারণ আপনি গরু খাওয়া মুসলমান।

ভারতমাতা এই মন্ত্রটা রোজ আপানার কানে পড়ে। ষোলো কোটি মানুষ ওই মন্ত্র শুনতে শুনতে বড় হইসে। শোনাটা এতো স্বাভাবিক হইয়া গেসে যে ওইটা যে একটা মন্ত্র, ওইটাও আর টের পাওয়া যায় না।

একবার ওই বয়ানের জোয়ালটা ঘাড় থেকে নামান। বুলন্দ আওয়াজে নামান, চুপচাপ না। নিজের সার্বভৌমত্বটা নিজেরা উদযাপন করেন, কারো অনুমতি না নিয়া।

তাইলে দেখবেন ওই প্রেতাত্মাটা আর নাই। ইন্ডিয়ার বয়ান, প্রগতিশীলতার বয়ান, জিন্নাহ ঘৃণা আর আওয়ামী লীগের বয়ান, দুইটা আসলে একটাই জিনিস, আর ওইটার খাদ্য একটাই। আপনার ইতিহাসের ভুল বোধ। খাওয়া বন্ধ করেন॥

Sunday, September 13, 2026

ইতিহাসের বই আমাদের শেখায়, ভারত ভাগ হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। কিন্তু এটি আংশিক সত্য কথা।


ইতিহাসের বই আমাদের শেখায়, ভারত ভাগ হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। কিন্তু এটি আংশিক সত্য কথা।

ভারত ভাগের আসল দলিল সই হয়েছিল তারও ২৭ বছর আগে, ১৯২০ সালের এক ধুলোমলিন বিকেলে।

নাগপুরের এক জনাকীর্ণ প্যান্ডেলে সেদিন প্রায় ৫ হাজার মানুষের সামনে একজন মানুষকে অপমান করে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

সেই মানুষটি কোনো পাল্টা চিৎকার করেননি। তিনি শুধু শান্ত পায়ে সভা ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন তিনি একা বের হননি, তার সঙ্গে বেরিয়ে গিয়েছিল ভারতের অখণ্ডতা।

কে ছিলেন সেই ব্যক্তি। আর কংগ্রেসের অন্দরমহলে ঠিক কী ঘটেছিল, যা একজন হিন্দু মুসলিম ঐক্যের দূতকে বানিয়ে দিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খলনায়ক।

১৯২০ সালের নাগপুর অধিবেশন-

সাল ১৯২০, ডিসেম্বর মাস। স্থান নাগপুর। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন চলছে। প্যান্ডেলের নিচে প্রায় ৫ হাজার মানুষ। বাতাসে ধুলো আর চরম উত্তেজনা।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ। পরনে লন্ডনের সেভিল রো থেকে বানানো দামি স্যুট, চোখে মুখে আভিজাত্যের ছাপ। তিনি কথা বলতে চাইলেন, কিন্তু ৫ হাজার মানুষের জনসমুদ্র তাকে থামিয়ে দিল।

চারপাশ থেকে ধেয়ে আসছে টিটকারি, চিৎকার এবং অপমান।

মঞ্চে দাঁড়ানো লোকটির অপরাধ, তিনি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে মহাত্মা ডাকতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন মিস্টার গান্ধী। অপমানে ও ক্ষোভে সেই ব্যক্তি মঞ্চ থেকে নেমে সোজা বেরিয়ে গেলেন অধিবেশন থেকে। আর কখনো তিনি কংগ্রেসে ফিরে আসেননি।

যিনি বেরিয়ে গেলেন, তিনি আর কেউ নন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

ঐতিহাসিকদের পর্যবেক্ষণ

অথচ মাত্র চার বছর আগেও এই কংগ্রেসেই তাকে ডাকা হতো হিন্দু মুসলিম ঐক্যের দূত বলে। ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনাটি কেবল একজন নেতার দলত্যাগ নয়। ঐতিহাসিকরা বলেন, ১৯২০ সালের সেই নাগপুর অধিবেশনই আসলে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের বীজ বুনে দিয়েছিল।

কিন্তু কেন কংগ্রেসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি নিজের ঘরেই এমন কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন।

জিন্নাহর প্রারম্ভিক রাজনীতি ও লখনৌ চুক্তি

গল্পের শুরুটা কিন্তু এমন ছিল না। ১৯১৫ সাল পর্যন্ত জিন্নাহ ছিলেন কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান নেতা। তিনি ছিলেন একজন পুরোদস্তুর সাংবিধানিক রাজনীতিবিদ। ধর্ম বা আবেগ নয়, তিনি বিশ্বাস করতেন যুক্তি আর তর্কে।

বিখ্যাত কবি ও রাজনীতিবিদ সরোজিনী নাইডু তখন জিন্নাহ সম্পর্কে বলেছিলেন, তিনি হিন্দু মুসলিম ঐক্যের প্রকৃত দূত, লম্বা, রাজকীয় এবং আমাদের ভবিষ্যতের আশা।

১৯১৬ সালে জিন্নাহর হাত ধরেই ঐতিহাসিক লখনৌ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ, দুই মেরুর দুই দলকে তিনি এক মঞ্চে নিয়ে এসেছিলেন। তখন জিন্নাহর পরিচয় কোনো মুসলিম নেতা হিসেবে ছিল না। তিনি ছিলেন একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী।

গান্ধীর উত্থান ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব

কিন্তু রাজনীতিতে খুব শীঘ্রই এমন এক ঝড় আসতে চলেছিল, যার জন্য জিন্নাহ নিজেও প্রস্তুত ছিলেন না। সেই ঝড়ের নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।

দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে গান্ধী ফিরলেন এক নতুন মন্ত্র নিয়ে। তার রাজনীতি ড্রয়িং রুমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি রাজনীতিকে নিয়ে গেলেন রাস্তায়, কৃষক আর শ্রমিকদের মাঝে।

জিন্নাহ ছিলেন যুক্তিবাদী ব্যারিস্টার, আর গান্ধী ছিলেন আধ্যাত্মিক পপুলিস্ট। জিন্নাহ কথা বলতেন ইংরেজিতে সংবিধান নিয়ে, আর গান্ধী কথা বলতেন অন্তরাত্মা ও ধর্ম নিয়ে।

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ স্ট্যানলি ওলপার্ট তার জিন্নাহ অব পাকিস্তান বইয়ে এই সময়টাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, জিন্নাহ গান্ধীর রাজনীতিকে মনে করতেন বিশৃঙ্খল।

চরকা কাটা কিংবা ভজন গাওয়া, এগুলো জিন্নাহর কাছে রাজনীতি ছিল না। জিন্নাহ বিশ্বাস করতেন, সাধারণ জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন না করে রাস্তায় নামালে তা কেবল অরাজকতাই ডেকে আনবে।

কংগ্রেসের সাধারণ কর্মীরা ধীরে ধীরে গান্ধীর জাদুতে মুগ্ধ হতে শুরু করল, আর যুক্তিবাদী জিন্নাহ ক্রমশ একা হয়ে পড়লেন।

খিলাফত আন্দোলন ও ধর্মের রাজনীতি

কিন্তু আসল ফাটলটা ধরল যখন রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে আনা হলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্কের খলিফাকে রক্ষার জন্য ভারতে শুরু হলো খিলাফত আন্দোলন।

গান্ধীজি দেখলেন, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে হলে মুসলিমদের সমর্থন দরকার। তাই তিনি হিন্দুদের নেতা হয়েও এই ইসলামী আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন দিলেন।

এখানেই জিন্নাহ থমকে গেলেন। তিনি ছিলেন একজন সেক্যুলার মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্মের সঙ্গে রাজনীতি মেশানো মানে বারুদের স্তূপে আগুন দেওয়া।

ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও লেখক জাসবন্ত সিং তার বইয়ে জিন্নাহর এই অসহায়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, জিন্নাহ গান্ধীকে সাবধান করে বলেছিলেন, আপনি আগুনের সঙ্গে খেলছেন। মোল্লাতন্ত্রকে রাজনীতিতে ডেকে এনে আপনি এমন এক শক্তিকে জাগিয়ে তুলছেন, যাকে পরে আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

কিন্তু গান্ধীজি সেই সতর্কবার্তা শোনেননি।

সংবিধানের জনক বি আর আম্বেদকরও পরবর্তীকালে জিন্নাহর এই অবস্থানের প্রশংসা করে লিখেছিলেন, মিস্টার জিন্নাহ ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি খিলাফতের বিরোধিতা করার সাহস দেখিয়েছিলেন।

কংগ্রেস যখন মুসলিমদের খুশি করতে ব্যস্ত, তখন জিন্নাহ একা দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ধর্মীয় উন্মাদনা দিয়ে দেশের মুক্তি আসতে পারে না। কিন্তু কংগ্রেস তখন সংখ্যার লোভে জিন্নাহর যুক্তি শুনল না। তিনি নিজ দলেই হয়ে পড়লেন বহিরাগত।

চূড়ান্ত অপমান ও বিদায়

অবশেষে এলো সেই দিন, ১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাস, নাগপুর অধিবেশন। গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব আনলেন। জিন্নাহ এর বিরোধিতা করতে মঞ্চে উঠলেন। তিনি চাইলেন আবেগের বদলে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে।

মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে জিন্নাহ বললেন, আমি মিস্টার গান্ধীর প্রস্তাবের বিরোধিতা করছি।

মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ চিৎকার করে উঠল, মিস্টার গান্ধী নয়, মহাত্মা বলো, মহাত্মা বলো।

জিন্নাহ থামলেন। কিন্তু তিনি ভিড়ের কাছে মাথা নোয়ানোর পাত্র নন। তিনি আবার বললেন, আমি মিস্টার গান্ধীর কথা বলছি।

এবার ভিড় আরও হিংস্র হয়ে উঠল। কেউ জুতো ছুড়ল, কেউ বা গালি দিল।

জিন্নাহর প্রথম জীবনীকার হেক্টর বলিথো এই দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক হার ছিল না। এটি ছিল জিন্নাহর জন্য চূড়ান্ত ব্যক্তিগত অপমান।

জিন্নাহ কোনো পাল্টা চিৎকার করলেন না। তিনি বক্তব্য শেষ করে মঞ্চ থেকে নেমে সোজা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করলেন।

বলা হয়, জিন্নাহর সঙ্গে সেদিন তার স্ত্রী রুট্টি জিন্নাহও ছিলেন। তারা দুজন যখন ধীর পায়ে সেই কোলাহলপূর্ণ প্যান্ডেল ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন কংগ্রেসের সঙ্গে জিন্নাহর সম্পর্ক চিরতরে শেষ হয়ে যাচ্ছিল।

স্বেচ্ছা নির্বাসন ও উপসংহার

সেদিন রাতেই জিন্নাহ নাগপুর থেকে বোম্বাইয়ের ট্রেন ধরেন। সাংবাদিকরা যখন তাকে প্রশ্ন করলেন, তিনি বিষণ্ণ মনে বলেছিলেন, আমি কংগ্রেস এবং গান্ধীর সঙ্গ ত্যাগ করলাম, কারণ আমি জনতার উন্মাদনা দিয়ে রাজনীতি করায় বিশ্বাসী নই।

এরপর জিন্নাহ প্রায় এক দশকের জন্য নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে লন্ডনে চলে গেলেন স্বেচ্ছা নির্বাসনে। কিন্তু সেই ১৯২০ সালের অপমান তিনি কোনোদিনও ভুলতে পারেননি।

ঐতিহাসিক আয়েশা জালাল তার বিশ্লেষণে বলেন, জিন্নাহর কংগ্রেস ত্যাগ ছিল যুক্তিবাদী রাজনীতির বিদায়। জিন্নাহ সাম্প্রদায়িক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন অতিরিক্ত মাত্রায় সেক্যুলার, যিনি গান্ধীর ধর্মীয় পপুলিজমের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেননি।

ট্র্যাজেডি হলো, যে মানুষটি ধর্মকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন, সেই মানুষটিকেই ইতিহাসের ফেরে পড়ে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ করতে হলো।

নাগপুরের সেই মঞ্চে যদি জিন্নাহকে কথা বলতে দেওয়া হতো, তাকে অপমান না করা হতো, তবে হয়তো ভারতের ইতিহাস অন্যরকম হতো।

১৯২০ সালে কংগ্রেস জিন্নাহকে কোণঠাসা করেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই কোণঠাসা বাঘটিই ফিরে এসে ১৯৪৭ সালে মানচিত্র ছিঁড়ে তার জবাব দিয়েছিলো।

-সাদিক রহমান।

#fyp #viral #trending #reach #foryou #followers #following #everyone #highlights #writer #writing