মসনদে তখন ‘মহামতি’ আকবর। যার হুংকারে কাবুল থেকে কান্দাহার, কাশ্মীর থেকে দাক্ষিণাত্য। পুরো হিন্দুস্তান তটস্থ। রাজপুতরা পর্যন্ত মাথা নত করে আত্মীয়তা পাতিয়েছে। কিন্তু বাদশাহর ঘুমে শান্তি নেই। মানচিত্রের পূর্ব কোণের একটি নদীমাতৃক জনপদ তাঁর গলার কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে। নাম তার বাংলা। বলা ভালো ‘ভাটি বাংলা’।
সেখানে মোগলদের বিশ্বজয়ী অশ্বারোহী বাহিনী অচল, বারুদভর্তি কামান অকেজো। মোগল সেনাপতিরা সেখানে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেন। কারণ তাঁরা জানতেন না, এই মাটির বীরদের ধমনীতে রক্তের সাথে স্রোতও বয়। ইতিহাসের পাতায় এই অধ্যায় কেবল সাহসের নয়, বরং এক বিস্ময়কর সামরিক প্রকৌশল ও রণকৌশলের বিজয়গাঁথা। তথাকথিত ‘বিশাল মোগল বাহিনী’র বিরুদ্ধে ঈসা খাঁ ও বারো ভুঁইয়াদের সেই লড়াইয়ের গভীরে যাওয়া যাক।
সম্রাট আকবর বুঝতে পারেননি, বাংলা কোনো পাঞ্জাব বা হরিয়ানার সমতল ভূমি নয়। ঈসা খাঁ, কেদার রায়, চাঁদ রায়রা জানতেন, মোগলদের প্রধান শক্তি তাদের ভারী অশ্বারোহী বাহিনী (Cavalry) এবং বিশাল সব হাতি। তাই তাঁরা যুদ্ধের জন্য বেছে নিলেন বর্ষাকাল এবং ‘ভাটি’ অঞ্চল (বর্তমান কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা ও কুমিল্লা)। বর্ষায় যখন পথঘাট ডুবে যেত, তখন মোগলদের আরবি ঘোড়া আর ভারী কামানের চাকা কাদায় দেবে যেত। মোগলদের শক্তিই হয়ে দাঁড়াত তাদের বোঝা। একে বলা হতো ‘মাটির ফাঁদ’। এ ছিল প্রযুক্তির এক অসম লড়াই, যেখানে বুদ্ধির জোরে জিতেছিল বাংলা।
মোগল নৌবহর বা ‘নওয়ারা’ সাজানো ছিল বিশাল আকৃতির ভারী যুদ্ধজাহাজ দিয়ে, যার নাম ছিল ‘গুরব’ বা ‘বজরা’। এগুলো গভীর পানি ছাড়া চলতে পারত না, ঘোরাতে সময় লাগত প্রচুর। এদিকে বারো ভুঁইয়ারা তৈরি করলেন এক বিশেষ ধরণের রণতরী ‘কোষা’। শাল ও সেগুন কাঠে তৈরি এই নৌকাগুলো ছিল দীর্ঘ, সরু এবং অত্যন্ত দ্রুতগামী। যা অগভীর জলেও তীরের বেগে ছুটত।
মোগলদের ভারী জাহাজগুলো যখন চরায় আটকে যেত, চারপাশ থেকে ঝপ করে ঘিরে ফেলত বাংলার ছোট ছোট ‘ঝালুয়া’ আর ‘কোষা’ নৌকা। শ্রীপুরের জমিদার কেদার রায় ছিলেন নৌযুদ্ধের জাদুকর। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু সাহস দিয়ে হবে না, দরকার উন্নত আগ্নেয়াস্ত্র। তিনি তাঁর বাহিনীতে যুক্ত করলেন পর্তুগিজ নৌ-সেনাপতি ডমিনিক ডি কার্ভালোকে।
কার্ভালোর কাছে ছিল ইউরোপীয় উন্নত কামানের প্রযুক্তি। ১৫৮৮ থেকে ১৬০৩ সময়টায় মেঘনা আর পদ্মায় কেদার রায় মোগলদের রক্তে জল লাল করে দিয়েছিলেন। মানসিংহের মতো সেনাপতিও কেদার রায়ের নৌশক্তির কাছে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন।
সাল ১৫৯৭। বিক্রমপুর থেকে ১২ মাইল দূরে, বর্তমান কাঠরাবো এলাকা। মোগল সেনাপতি মানসিংহ তাঁর ছেলে দুর্জন সিংহকে পাঠালেন ঈসা খাঁকে চূড়ান্তভাবে দমন করতে। মোগলদের সাথে ছিল ভারী কামান। কিন্তু ঈসা খাঁ সম্মুখযুদ্ধে না গিয়ে ‘গেরিলা’ কায়দায় মোগল বাহিনীকে ঘিরে ফেললেন। মোগলদের কামানের পাল্লা যেখানে শেষ, ঠিক সেখান থেকে বারো ভুঁইয়ারা আক্রমণ শুরু করলেন।
ফলাফল? মোগল নৌবহর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেল। মানসিংহের নিজের ছেলে দুর্জন সিংহ এই যুদ্ধে নিহত হলেন। ছেলের মৃত্যু সংবাদ আর পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে মানসিংহকে শূন্য হাতে আগ্রায় ফিরতে হয়েছিল। ইতিহাসবিদ আবুল ফজল ‘আকবরনামা’য় এই পরাজয়ের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। মোগলরা হাতির পিঠে বড় কামান (গজনাল) বহন করত যা লক্ষ্যভেদে ছিল ধীর। বিপরীতে বারো ভুঁইয়ারা নৌকায় ব্যবহার করতেন ছোট ও হালকা কামান (হাতনাল) এবং তোপ। যা দ্রুত লোড করা যেত এবং নিমিষেই দিক পরিবর্তন করে শত্রুকে ঘায়েল করা যেত। ঈসা খাঁ কেবল যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন তুখোড় রাজনীতিবিদ।
তিনি জানতেন মোগল সাম্রাজ্যের বিশাল সম্পদের সাথে অনন্তকাল যুদ্ধ চালানো কঠিন। তাই তিনি যুদ্ধজয়ের পর অনেক সময় মৌখিক বশ্যতা স্বীকার করতেন বা উপহার পাঠাতেন, কিন্তু কখনোই নিজের ভূখণ্ডের খাজনা বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ দিল্লির হাতে তুলে দেননি। একেই বলে ‘কৌশলগত বিজয়’।
সারকথা, আকবর তাঁর জীবদ্দশায় কখনোই ভাটি বাংলাকে পুরোপুরি বশ করতে পারেননি। জাহাঙ্গীরের আমল (১৬১০) পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল এই জনপদকে পদানত করতে, এবং সেটাও হয়েছিল নিজেদের মধ্যে বিভেদ তৈরির মাধ্যমে। বারো ভুঁইয়ারা প্রমাণ করেছিলেন, কেবল সৈন্যসংখ্যা দিয়ে যুদ্ধ জয় করা যায় না। মাটির বৈশিষ্ট্য চেনা, আবহাওয়াকে কাজে লাগানো এবং সঠিক রণকৌশলই পারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যকেও হাঁটু গেড়ে বসাতে।
তাঁরা আমাদের শিখিয়ে গেছেন, অস্ত্রের চেয়ে মেরুদণ্ড অনেক বেশি শক্তিশালী।
#Clarifying_Light_বাংলা_fc


