Search This Blog

Friday, December 5, 2025

"মগের মুল্লুক"


মেঘনার মোহনা, ভুলুয়া (বর্তমান নোয়াখালী)।

​পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ।

অমাবস্যার রাত, কিন্তু কোনো ঘরে প্রদীপ জ্বলছে না। মায়েরা শিশুদের মুখে কাপড় গুঁজে ধরে আছে, যেন কান্নার আওয়াজ বের না হয়।

বাতাসের শব্দেও গ্রামের পুরুষেরা আঁতকে উঠছে। তাদের হাতে লাঠিসোঁটা, কিন্তু চোখেমুখে মৃত্যুর ভয়।

​কারণ তারা আসছে।

নদীর বুকে দ্রুতগামী ‘জেলবা’ নৌকাগুলোর ছপ ছপ শব্দ শোনা যাচ্ছে।

ওরা মগ। আরাকানের জলদস্যু। সাথে আছে তাদের দোসর, পর্তুগিজ হার্মাদরা।

​এরা লুঠ করতে আসে না। এরা আসে ‘শিকার’ করতে।

মানুষ শিকার।

​যাকে পাবে, তাকেই ধরে নিয়ে যাবে।

তারপর হাতের তালু ফুঁড়ে সরু বেতের রশি দিয়ে বেঁধে ফেলবে। জাহাজের অন্ধকার খোলে গাদাগাদি করে ফেলে রাখবে দিনের পর দিন। খাবার হিসেবে ছুড়ে দেবে মুঠোভরা কাঁচা চাল।

গন্তব্য, আরাকানের দাস বাজার। অথবা ওলন্দাজ বনিকদের জাহাজ, যারা এই বাঙালিদের পাঠিয়ে দেবে সুদূর ইন্দোনেশিয়ায়।

​বাংলার দক্ষিণ উপকূল তখন এক মৃত্যুপুরী।

যেখানে আইন নেই, বিচার নেই, শুধু আছে বাঁচার আর্তনাদ।

লোকেরা এই অরাজকতার নাম দিয়েছিল, "মগের মুল্লুক"।

​দিল্লির মসনদ তখন অনেক দূরে।

মোগল সুবাদাররা আসেন আর যান। ডাঙায় তাদের দাপট থাকলেও, জলের ওপর তারা অসহায়।

মোগলদের ভারী জাহাজগুলো মগদের ক্ষিপ্রগতির নৌকার সাথে পেরে ওঠে না।

​ঠিক এই চরম মুহূর্তে, ১৬৬৩ সালে বাংলার সুবাদার হয়ে এলেন এক বৃদ্ধ।

শায়েস্তা খান।

বয়স তেষট্টি। জীবনের শেষ সায়াহ্নে।

​সবাই ভেবেছিল, এই বয়োবৃদ্ধ শাসক আর কী করবেন? হয়তো কদিন পর তিনিও হাল ছেড়ে দেবেন।

কিন্তু শায়েস্তা খান জানতেন, শুধু তলোয়ার দিয়ে এই দস্যুদের দমানো যাবে না। এদের দমাতে হবে বুদ্ধি দিয়ে।

​তিনি এক অদ্ভুত ফরমান জারি করলেন।

"নৌকা বানাও।"

পুরো ঢাকা শহর এক বিশাল কারখানায় পরিণত হলো। কাঠমিস্ত্রি, কামার, কারিগর, দিনরাত এক করে কাজ করতে লাগল।

এক বছরের মধ্যে শূন্য থেকে গড়ে উঠল ৩০০ জাহাজের এক বিশাল নৌবহর।

​কিন্তু শায়েস্তা খান জানতেন, মগদের আসল শক্তি তাদের সাহস নয়, তাদের শক্তি হলো তাদের সাথে থাকা পর্তুগিজ ফিরিঙ্গিরা। এদের কাছে আছে উন্নত মানের কামানের জ্ঞান।

​শায়েস্তা খান এবার চাললেন এক মোক্ষম চাল।

তিনি সন্দ্বীপে থাকা পর্তুগিজ দলনেতাকে গোপনে প্রস্তাব পাঠালেন,

"আরাকানের রাজার গোলামি করে কী পাবে? আমার সাথে এসো। নিরাপত্তা, সম্পদ আর সম্মান, সব দেব।"

​লোভ আর ভয়, দুটোই কাজ করল। ফিরিঙ্গিরা মগদের পক্ষ ত্যাগ করে শায়েস্তা খানের দলে ভিড়ে গেল।

যুদ্ধের আগেই আরাকানের রাজার ডান হাত ভেঙে গেল।

​জানুয়ারি, ১৬৬৬ সাল।

কুয়াশাচ্ছন্ন কর্ণফুলী নদী।

​মগরা তাদের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি চট্টগ্রামে বসে আছে। তারা নিশ্চিন্ত। গত একশো বছরে কেউ তাদের এই জলসীমায় হারাতে পারেনি।

কিন্তু তারা জানত না, দিগন্তের ওপার থেকে ধেয়ে আসছে এক প্রলয়।

​সামনে ইবনে হোসেনের নেতৃত্বে মোগল নৌবহর ‘নওয়ারা’। আর জঙ্গল মাড়িয়ে ডাঙা পথে এগিয়ে আসছেন সুবাদারের পুত্র বুজুর্গ উমেদ খান।

​সাঙ্গু নদীর মোহনায় শুরু হলো সেই ঐতিহাসিক লড়াই।

মগরা তাদের ‘জেলবা’ আর ‘খালু’ নৌকা নিয়ে মরণকামড় দিতে চাইল।

কিন্তু এবার দৃশ্যপট ভিন্ন।

​মোগলদের নতুন নৌবহর আর ফিরিঙ্গিদের কামানের নিখুঁত নিশানায় মগদের জাহাজগুলো খড়কুটোর মতো উড়ে যেতে লাগল।

টানা ছত্রিশ ঘণ্টা চলল কামানের গর্জন। নদীর পানি রক্তে লাল হয়ে গেল।

​১৩৫টি মগ জাহাজ দখল করে নিল মোগলরা। বাকিগুলো আগুনে ভস্মীভূত হলো।

মগরা পালালো। তাদের অজেয় দুর্গ চুরমার হয়ে গেল।

​উদ্ধার হলো হাজার হাজার বাঙালি বন্দি। তাদের আনন্দাশ্রুতে ভিজে গেল চট্টগ্রামের মাটি।

দীর্ঘ দিন পর দক্ষিণ বাংলার মানুষ বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল।

​শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম জয় করে নাম রাখলেন, ‘ইসলামাবাদ’।

​শায়েস্তা খান যখন ঢাকা ছেড়ে যান, তখন তিনি এক নতুন ইতিহাস রচনা করে গেছেন।

আমরা তাঁকে মনে রেখেছি টাকায় আট মণ চালের জন্য।

কিন্তু তাঁর আসল অবদান সস্তা চাল নয়।

​তিনি যদি সেদিন ওই বয়সে আরাম আয়েশ ছেড়ে এই অসম্ভব লড়াইয়ে না নামতেন, তবে আজকের সুন্দরবন আর দক্ষিণ বাংলা হয়তো জনমানবহীন জঙ্গল হয়েই থাকত।

তিনি মগদের বিতাড়িত করে বাংলাকে বাসযোগ্য করেছিলেন।

তিনি ‘মগের মুল্লুক’ শব্দটিকে চিরতরে একটি প্রবাদ বাক্যে পরিণত করে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছিলেন।

​আজ যখন আমরা নির্ভয়ে কুয়াকাটা বা পতেঙ্গার সৈকতে দাঁড়াই, তখন হয়তো আমরা ভুলেই যাই,

এই বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় মিশে আছে আমাদের পূর্বপুরুষদের ২০০ বছরের দীর্ঘশ্বাস,

আর একজন তেষট্টি বছরের বৃদ্ধের অদম্য জেদ।

#Clarifying_Light_বাংলা_fc

No comments:

Post a Comment