Search This Blog

Friday, May 1, 2026

ফাতেহুল হিন্দ' খ্যাত বীর সুলতান আবুল কাসেম মাহমুদ আল-গজনবি রাহি.। তিনি ছিলেন গজনভি সাম্রাজ্যের সুলতান।



আজ ৩০ এপ্রিল ঠিক এই দিনে, ১০৩০ সালে ইন্তেকাল করেন মুসলিমদের ইতিহাসে 'ফাতেহুল হিন্দ' খ্যাত বীর সুলতান আবুল কাসেম মাহমুদ আল-গজনবি রাহি.। তিনি ছিলেন গজনভি সাম্রাজ্যের সুলতান। তার সাম্রাজ্য মূলত আধুনিক আফগানিস্তান, ইরান এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তার জীবদ্দশায় তিনি ১৭বার ভারতে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ঐতিহাসিক সূত্রে সুলতান মাহমুদকে ইসলামের একজন একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে দেখা যায়। আব্বাসীয় খলিফার আনুগত্য স্বীকার করে তিনি 'ইয়ামিন-উদ-দৌল্লা এবং আমিন-উল-মিল্লাত' উপাধি ধারণ করেছিলেন।

সুলতান মাহমুদ একজন অসাধারণ সামরিক কৌশলবিদ, ইনসাফপরায়ণ ও দক্ষ শাসক ছিলেন। তার সামরিক দক্ষতা এতটাই উন্নত ছিল যে তিনি তার ১৭টি ভারত অভিযানের একটিতেও পরাজিত হননি। তিনি একটি সুসংহত এবং শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে তুর্কি, আরব এবং ভারতীয় সৈন্যদের সমন্বয় ছিল। প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও তিনি যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি জ্ঞানী ও গুণীদের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এবং তার দরবারে বিখ্যাত পণ্ডিত ও কবি যেমন আল-বেরুনী এবং ফেরদৌসী সমাদৃত ছিলেন।

ভারতে প্রেরিত সুলতান মাহমুদ গজনবীর ১৭টি সফল অভিযানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা নিচে দেওয়া হলো:

১. ১০০০: খ্রিস্টাব্দ: এসময় সুলতান মাহমুদের প্রথম ভারত অভিযান পরিচালিত হয়। এই অভিযানে তিনি খাইবার গিরিপথে অবস্থিত ভারতের সীমান্ত দুর্গ ও কয়েকটি সীমান্ত নগরীর অধিকার করেন।

২. ১০০১ খ্রিষ্টাব্দ: এই অভিযানের লক্ষ্য ছিল পাঞ্জাবের হিন্দু শাহী শাসক জয়পাল। মাহমুদ পেশোয়ারের কাছে তাকে পরাজিত করেন এবং বিপুল ধনসম্পদ লাভ করেন। জয়পাল বন্দি হন, তবে পরে মুক্তি পান এবং অপমানে আত্মহত্যা করেন।

২. ১০০৪ খ্রিষ্টাব্দ: এই অভিযানে মাহমুদ মুলতান আক্রমণ করেন। সেখানকার শাসক দাউদ আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন এবং মাহমুদ প্রচুর কর আদায় করেন।

৩. ১০০৪ খ্রিষ্টাব্দ: মাহমুদ ভাতিন্ডার শাসক বিজয় রায়কে পরাজিত করেন। ভাটিণ্ডার রাজার সাথে মাহমুদের পিতার ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু মাহমুদের আমলে সেই সম্পর্ক ছিন্ন করে বিজয় রায়। ফলস্বরূপ পরাজিত হতে হয় তাকে এবং তিনিও আত্মহত্যা করেন।

৪. ১০০৫ খ্রিস্টাব্দ: তিনি মুলতানের শাসনকর্তা বিদ্রোহী ইসমাইলী শাসক আবুল ফতেহ দাউদকে দমন করেন এবং সাথে সাথে মুলতানও অধিকৃত করেন।

৫. ১০০৭ খ্রিস্টাব্দ: এ সময় সুলতান মাহমুদ সুখপালের বিরুদ্ধে তার পঞ্চম অভিযান পরিচালনা করেন।

৬. ১০০৮ খ্রিষ্টাব্দ: এই অভিযানটি ছিল রাজা আনন্দপালের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়। আনন্দপাল কনৌজের প্রতিহার শাসক এবং অন্যান্য ভারতীয় রাজাদের সাথে জোট গঠন করেও মাহমুদের কাছে পরাজিত হন।

৭. ১০০৯ খ্রিষ্টাব্দ: মাহমুদ  নগর কাটের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। তেমন কোন বাধা না পাওয়ায় খুব সহজেই এ শহর জয় করেন এবং বিপুল পরিমাণ গনিমত লাভ করেন।

৮. ১০১০ খ্রিষ্টাব্দ: এসময় সুলতান মাহমুদ মুলতানে আরো একটি অভিযান পরিচালনা করেন। সেখানকার বিদ্রোহী শিয়া মুসলিমদের বিতাড়িত করেন।

৯. ১০১৪ খ্রিষ্টাব্দ: এই অভিযানে মাহমুদ নন্দনা অধিকার করেন এবং ত্রিলোচন পালকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করেন।

১০. ১০১৪ খ্রিস্টাব্দ: মাহমুদ থানেশ্বর আক্রমণ করেন এবং সেখানকার হিন্দুরা তার বিরুদ্ধে তুমুল প্রতিরোধ গড়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত তারা পরাজিত হয়।

১১. ১০১৫-১০২১ খ্রিষ্টাব্দ: এই অভিযানে মাহমুদ দুবার কাশ্মীর আক্রমণ করেন, তবে দুর্গম ভূখণ্ড এবং প্রবল প্রতিরোধের কারণে তেমন সুবিধা করতে পারেননি।

১২. ১০১৮-১০১৯ খ্রিষ্টাব্দ: এটি ছিল মাহমুদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযান। তিনি কনৌজ আক্রমণ করেন এবং সেখানকার প্রতিহার শাসক রাজ্যপাল পালিয়ে গেলে কনৌজ সহজেই মাহমুদের হস্তগত হয়। 

১৩. ১০২০-১০২১ খ্রিষ্টাব্দ: এই অভিযানে মাহমুদ বুন্দেলখণ্ডের কালিঞ্জর দুর্গ অবরোধ করেন। চান্দেল্ল শাসক গণ্ড দেব প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুললেও শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের মুহূর্তে সে রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে যায়।

১৪. ১০২১-১০২২ খ্রিষ্টাব্দ: মাহমুদ গোয়ালিয়রের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন। এর ফলে গোয়ালিয়রের রাজা তার বশ্যতা স্বীকার করে।

১৫. ১০২৩ খ্রিস্টাব্দ: গোয়ালিয়রের রাজা সুলতান মাহমুদের বশ্যতা স্বীকার করার পর তিনি ১০২৩ খ্রিস্টাব্দে পুনরায় হিন্দু রাজা নন্দার বিরুদ্ধে সৈন্যসামন্ত নিয়ে কালিঞ্জর আক্রমণ করেন। এই অভিযানকালে তিনি গোন্ডার বিখ্যাত দুর্গ অবরাধে করেন। কালিঞ্জরের রাজা তখন বার্ষিক কর প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে আত্মরক্ষা করেন।

১৬. ১০২৬ খ্রিষ্টাব্দ: এটি ছিল মাহমুদের সবচেয়ে বিখ্যাত অভিযান। তিনি গুজরাটের সোমনাথ মন্দিরে অভিযান পরিচালনা করেন। হিন্দুরা এখানে তীর্থ করতে আসত। মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী ছিল অশ্লীল চিত্র দ্বারা শোভিত। সোমনাথ বিগ্রহের খ্যাতি ছিল সমগ্র ভারতবর্ষব্যাপী এবং কর্মরত ব্রাহ্মণগণ মনে করতেন যে, বিগ্রহসমূহের অলৌকিক ক্ষমতা মাহমুদের আক্রমণ প্রতিরোধে সক্ষম। হিন্দুদের বিশ্বাস যে ভ্রান্তিমূলক ছিল, তা প্রমাণ করার জন্যই সুলতান মাহমুদ সোমনাথ জয় করতে মনস্থ করেছিলেন। ইবনে খালদুন, ফিরিস্তা এবং ডব্লিউ হেগ প্রমুখ ঐতিহাসিকগণ এই মত সমর্থন করেন।

১৭. ১০২৭ খ্রিষ্টাব্দ: সোমনাথ অভিযানের পর ফেরার পথে মাহমুদ জাঠদের দ্বারা আক্রান্ত হন। এই অভিযানে তিনি জাঠদের পরাজিত করেন।

সুলতান মাহমুদ এর ভারত অভিযানের উদ্দেশ্য–
ধর্মীয় উদ্দেশ্য: পৌত্তলিকতার ধ্বংস সাধন করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সুলতান মাহমুদ ভারতে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। ইসলামের এই সুমহান দায়িত্ব পেয়ে মাহমুদ হিন্দুস্তানে ইসলামের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করতে ব্রত ছিলেন। ফলস্বরূপ এ সকল অভিযানে কয়েকজন রাজাসহ অসংখ্য হিন্দু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল। তবে তিনি উদার এবং ইনসাফরায়ন ব্যক্তিত্ব ছিলেন, কারও উপর ধর্ম চাপিয়ে দেননি কখনো। যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ ব্যতীত অবৈধ লুটতারাজ তার দ্বারা হয়নি।

রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: একথা সত্য যে সুলতান মাহমুদ গজনী সম্রাজ্যের বিস্তারে জোর দিয়েছিলেন। গজনিকেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তৃতে রাজ্য দখল তার জন্য অপরিহার্য ছিল। এছাড়াও উপমহাদেশের হিন্দু রাজন্যবর্গ কর্তৃক চুক্তিভঙ্গ, আনুগত্যহীনতা, শত্রুকে সাহায্য দান ও বিশ্বাসঘাতকতা সুলতান মাহমুদকে বারবার অভিযান পরিচালনা করতে বাধ্য করেছে। 

অর্থনৈতিক উদ্দেশ্য: প্রতিটি অভিযানেই সুলতান মাহমুদ বিপুল পরিমাণ গনিমত অর্জন করতেন। মধ্য এশিয়ার শত্রু দমন করা ও গজনীকে কেন্দ্র করে বিরাট সাম্রাজ্য গড়ে তোলার জন্য এর সম্পদের প্রয়োজন ছিল।

এত বড় মুসলিম বিজেতা হয়েও সুলতান মাহমুদ কখনো অহংবোধ করেননি। বরঞ্চ আল্লাহর সাথে তার গভীর সম্পর্ক ছিল। তিনি যুদ্ধের নিয়মের বাইরে কখনো শত্রুকে হত্যা করেননি। অসীম সাহসিকতার মাধ্যমে সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছেন। হিন্দুত্ববাদীরা সবসময় সুলতান মাহমুদকে হিংস্র, বর্বর ও ধ্বংসকারী হিসেবে আখ্যায়িত করলেও প্রকৃত ইতিহাসবিদদের কলমে সুলতান মাহমুদ একজন আল্লাহভীরু দ্বীনদার শাসক হিসেবেই অমর হয়ে আছেন, যিনি যুদ্ধের ময়দানেও নফল সালাত আদায় করেছেন এবং যার রাত্রি কেটেছে কুরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে।

#searchinghistory 
#muslimhistory 
#mahmudgaznavi

No comments:

Post a Comment