Search This Blog

Saturday, February 28, 2026

৫৭ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা


ভারতের স্বার্থে হাসিনার গ্রীন সিগনালে
৫৭ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা
সাহাদত হোসেন খান
(প্রথম অংশ)  
বিডিআর বিদ্রোহ বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কজনক অধ্যায়। ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় তৎকালীন সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) সদর দফতর পিলখানায় বিদ্রোহী জওয়ানদের হামলায় নিহত হন ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা। পিলখানায় বিডিআর বিদ্রোহে নিহত ৫৭ সেনা কর্মকর্তা: 
১. মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ
২.ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির হোসেন
৩. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আবদুল বারী
৪. কর্নেল মজিবুল হক
৫. কর্নেল আনিস—উজ—জামান
৬. কর্নেল মোহাম্মদ মসিউর রহমান
৭. কর্নেল কুদরত ইলাহী রহমান শফিক
৮. কর্নেল মোহাম্মদ আখতার হোসেন
৯. কর্নেল রেজাউল কবীর
১০. কর্নেল নাফিজউদ্দিন আহমেদ
১১. কর্নেল কাজী এমদাদুল হক
১২. কর্নেল বিএম জাহিদ হোসেন
১৩. কর্নেল সামসুল আরেফিন আহামেদ
১৪. কর্নেল নকিবুর রহমান
১৫. কর্নেল কাজী মোয়াজ্জেম হোসেন
১৬. কর্নেল গুলজারউদ্দিন আহমেদ
১৭. কর্নেল শওকত ইমাম
১৮. কর্নেল এমদাদুল ইসলাম
১৯. কর্নেল আফতাবুল ইসলাম
২০. লেফটেন্যান্ট কর্নেল এনশাদ ইবন আমিন
২১. লেফটেন্যান্ট কর্নেল শামসুল আজম
 ২২. লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী রবি রহমান, এনডিসি
 ২৩. লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম কিবরিয়া মোহাম্মদ
২৪. লেফটেন্যান্ট কর্নেল বদরুল হুদা
২৫. লেফটেন্যান্ট কর্নেল এলাহী মঞ্জুর চৌধুরী
২৬. লেফটেন্যান্ট কর্নেল এনায়েতুল হক, পিএসসি
২৭. লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবু মুছা আইউব
২৮. লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম
২৯. লেফটেন্যান্ট কর্নেল লুৎফর রহমান
৩০. লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ সাজ্জাদুর রহমান
 ৩১. লেফটেন্যান্ট কর্নেল লুৎফর রহমান খান
৩২. মেজর মকবুল হোসেন
৩৩. মেজর আবদুস সালাম খান
৩৪. মেজর হোসেন সোহেল শাহনেওয়াজ
৩৫. মেজর কাজী মোছাদ্দেক হোসেন
 ৩৬. মেজর আহমেদ আজিজুল হাকিম
৩৭. মেজর মোহাম্মদ সালেহ
৩৮. মেজর কাজী আশরাফ হোসেন
৩৯. মেজর মাহমুদ হাসান
৪০. মেজর মুস্তাক মাহমুদ
৪১. মেজর মাহমুদুল হাসান
৪২. মেজর হুমায়ুন হায়দার
৪৩. মেজর আজহারুল ইসলাম
৪৪. মেজর হুমায়ুন কবীর সরকার
৪৫. মেজর খালিদ হোসেন
৪৬. মেজর মাহবুবুর রহমান
৪৭. মেজর মিজানুর রহমান
৪৮. মেজর মোহাম্মদ মাকসুম—উল—হাকিম
৪৯. মেজর এসএম মামুনুর রহমান
৫০. মেজর রফিকুল ইসলাম
৫১. মেজর সৈয়দ ইদ্রিস ইকবাল
৫২. মেজর আবু সৈয়দ গাজ্জালী দস্তগীর
৫৩. মেজর মুহাম্মদ মোশারফ হোসেন
৫৪. মেজর মোহাম্মদ মমিনুল ইসলাম সরকার
৫৫. মেজর মোস্তফা আসাদুজ্জামান
 ৫৬. মেজর তানভীর হায়দার নূর
৫৭. ক্যাপ্টেন মাজহারুল হায়দার 
এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদসহ ৫৮ জনের বিরুদ্ধে ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে অভিযোগ করা হয়। বিডিআর বিদ্রোহের নামে ২০০৯ সালে ঢাকার পিলখানা সদর দফতরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের ১৬ বছর পর গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন ২০২৫ সালের ৩০ নভেম্বর অন্তর্বতীর্ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। পিলখানায় সংঘটিত বর্বর হত্যাকাণ্ড তদন্তের জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন প্রায় ১১ মাস তদন্ত শেষে ৩০ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন হস্তান্তর করে। এই কমিশনের প্রধান হলেন মেজর জেনারেল (অব.) আলম ফজলুর রহমান।  ২০০৯ সালের এ ঘটনায় ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জন নিহত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের দুই মাসের মধ্যে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। তদন্তে বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তি বিশেষ করে ভারতের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় কমিশনের প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) আলম ফজলুর রহমানসহ অন্য সদস্যরা প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টার হাতে তুলে দেন।
 কমিশন প্রধান ফজলুর রহমান জানান, ১৬ বছর আগের ঘটনার অনেক আলামত ধ্বংস হয়ে গেছে, অনেক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বিদেশে চলে গেছেন। তবুও প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর নিরূপণ করতে তদন্তে সাক্ষ্যগ্রহণ, উপকরণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে চেষ্টা করা হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত ছিল এবং তার প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস।  
৯২১ জন ভারতীয় নাগরিকের বাংলাদেশে প্রবেশ
তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, বিডিআর বিদ্রোহের সময় ৯২১ জন ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। তাদের মধ্যে অনেকের হিসাব মেলেনি। তাদের মধ্যে ৬৭ জনের অবস্থান অজানা। ভারতের উদ্দেশ্য ছিল সেনাবাহিনী ও বিডিআরকে দুর্বল করা এবং দেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক রচনায়, গোয়েন্দা তথ্য ও সাক্ষ্যে দেখা গেছে, বিদ্রোহের ফলাফলে সবচেয়ে বেশি সুবিধাভোগী দেশ ছিল ভারত। এজন্য সরকারকে ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা চাইতে সুপারিশও করেছে তদন্ত দল। ৩০ নভেম্বর সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা শেষে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয়। ‎সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল আলম ফজলুর রহমান বলেন, বিডিআর বিদ্রোহ পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফল।  দেশকে অস্থিতিশীল করা, শেখ হাসিনার ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা, সেনাবাহিনী ও বিডিআরকে দুর্বল করতে এই বিদ্রোহ ঘটানো হয়েছে। ‎আমাদের তদন্তে উঠে এসেছে বিদ্রোহের সঙ্গে কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি জড়িত ছিলেন। আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজনের নাম তদন্তে উঠে এসেছে। তারা হলেন: সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাহারা খাতুন, নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারেক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন ইউ আহমেদ, ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল আকবর।  ‎তিনি আরো বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের অনেকগুলো কারণ। ডাল—ভাত কর্মসূচি ও বিডিআর শপ তৈরি করা হয়েছিল। এতে ডিউটি অনেক বেড়ে গিয়েছিল। এছাড়া যেভাবে প্ররোচিত হয়ে থাকুক, তারা (বিডিআর সদস্য) সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের বাহিনীতে চাচ্ছিল না। বিডিআরের ভেতরে নানা ধরনের সংকট ছিল যা আমরা তদন্তে পেয়েছি। এছাড়াও, বিডিআর বিদ্রোহের পরবর্তী সময়ে পাঁচ সেনা কর্মকর্তাকে গুম করা হয়েছিল। এই বিষয়ে আমরা প্রমাণ পেয়েছি। বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে প্রতিবাদ করায় ছয় সেনা সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বিদ্রোহের সময় পিলখানার ৫ নম্বর গেটে র‌্যাবের সদস্যরা মোতায়েন ছিল। সেই সময় র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ছিলেন কর্নেল রেজা নূর। পিলখানায় হত্যাকাণ্ড চললেও তারা কোনো ভূমিকা রাখেনি। কারণ র‌্যাব সদস্যদের কর্নেল রেজা নূর নিষেধ করেছিল। যখন এই ধরনের বিদ্রোহ হয় তখন র‌্যাব অথবা পুলিশের কোনো আদেশের প্রয়োজন হয় না। এই বিষয়টা আমরা সুপারিশ করেছি। প্রতিবেশি দেশ হিসেবে বিডিআর বিদ্রোহ ঘটনার নেপথ্যে আমরা ভারতকে বুঝিয়েছি। যেখানে শেখ হাসিনা তার দলবল নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। বিদেশি সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং সেখানে স্পষ্টভাবে ভারতের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ‎তিনি আরো বলেন, অপারেশন ডাল ভাত নয়, বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করা ও বিডিআরকে দুর্বল করাই মূল উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু এটাকে আড়াল করে অপারেশন ডাল ভাত ও আর্মি অফিসারদের বিষয়ে ক্ষোভকে সামনে আনা হয়েছে। ‎এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সেনাবাহিনীতে একটা নিয়ম আছে, যে একজন অফিসার ৩ বার বোর্ডে সুপারসেডেট (অন্য কাউকে পদোন্নতি দেয়া) হলে তার আর পদোন্নতি হয় না। এই বিদ্রোহে যারা সরকারকে সহযোগিতা করেছে তাদের মধ্যে এই সুপারসেডেট কর্মকর্তাদের সংখ্যা বেশি। এমন কি সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ লেফটেন্যান্ট কর্নেল হিসেবে সুপারসেডেট ছিলেন। তার চাকরি থেকে চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিদ্রোহের পর তাকে পদোন্নতি দিয়ে বিজিবি প্রধান ও পরবর্তীতে সেনাপ্রধান করা হয়েছে। এভাবেই এসকল সেনা কর্মকর্তাকে পরবর্তীতে পদোন্নতি দিয়ে ভালো ভালো জায়গায় পদায়ন করা হয়েছে। দুর্বল জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করে সরকার নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে এটা করেছে। তদন্ত কমিশন দাবি করেন, বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত। বিদ্রোহ দমনে সেনা অভিযান হলে শহরের ৩ কিলোমিটার দূরে আর্মিকে সরিয়ে রাখা হতো না। ‎‎এছাড়াও, কমিটির তদন্তে উঠে এসেছে সেনা কর্মকর্তাদের ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র। ভুক্তভোগী সেনা কর্মকর্তাদের স্বজনসহ বিভিন্ন ব্যক্তির জবানবন্দিতে উঠে এসেছে, কারো চোখ তুলে ফেলা হয়, কারো পা ভেঙ্গে দেয়া হয়, শারীরিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। সেনা কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্যদের উপর হামলা ও বাসায় লুটপাট করা হয়। স্বাধীন তদন্ত কমিশন পিলখানায় বিডিআর সদর দফতরে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিভিন্ন স্তরের মোট ৪৯ জনকে দায়ী করেছে। এ তালিকায় রাজনীতিবিদ, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য, র‌্যাব ও বিডিআর কর্মকর্তা, সাবেক ও বর্তমান আইজিপি এবং তিনজন সংবাদমাধ্যমকর্মীর নাম রয়েছে। কমিশন বলেছে, তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রত্যক্ষ মদদে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার ২৪ জন কর্মকর্তা এ ঘটনায় সরাসরি ভূমিকা পালন করেন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে নতুন করে তদন্ত এবং আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে কমিশন। কমিশনের সূত্র বলেছে, এই ৪৯ ব্যক্তি বিভিন্নভাবে ঘটনা ঘটানো, সহায়তা, উসকানি বা দায়িত্বে অবহেলায় জড়িত ছিলেন। কমিশনের সূত্র বলেছে, অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঘটনার মাস কয়েক আগেই তৎকালীন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস বিডিআরের কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে পিলখানার কেন্দ্রীয় মসজিদে বৈঠক এবং সৈনিকদের অসন্তোষের তথ্য সংগ্রহ করতেন। পরে তাপসের বাসায় আওয়ামী লীগ নেতা শেখ ফজলুল করিম সেলিমের উপস্থিতিতে বিডিআর সদস্যদের আরেকটি বৈঠক হয়। বৈঠকে প্রথমে অফিসারদের জিম্মি করার পরিকল্পনা করা হয়। পরে সোহেল তাজ ও শেখ সেলিমের উপস্থিতিতে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার ২৪ জনের একটি দল বৈঠকে অংশ নেয়। সেখানে কর্মকর্তা হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং তাপসকে অভিযুক্তদের নিরাপদে পলায়নে সহায়তার দায়িত্ব দেয়া হয়। এসব বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, লেদার লিটন ও তোরাব আলী। এসব পরিকল্পনা সম্পর্কে ৪৪ রাইফেলস ব্যাটালিয়নের সিও কর্নেল শামস অবগত ছিলেন এবং তাপস তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে সিদ্ধান্তের অনুমোদন নিতেন। বিদ্রোহ ও হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্যে বিডিআর সদস্যদের মধ্যে বিপুল অর্থ বিতরণ করা হয়েছিল।
ভারতীয় গোয়েন্দাদের সংশ্লিষ্টতা
তদন্ত কমিশনের সূত্র বলেছে, পিলখানা হত্যাকাণ্ডে ভারতের সংশ্লিষ্টতার বিভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ভারতীয় পক্ষের সঙ্গে বৈঠকের পর পুরো পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয় এবং সমন্বয়ের জন্য শেখ ফজলে নূর তাপসের বাসায় বৈঠক হয়। তদন্তে উঠে আসে, সংসদ সদস্য গোলাম রেজা ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি সকালে পিলখানা এলাকায় আলাউদ্দিন নাসিম, সাবেক এমপি মোর্শেদ, শেখ সেলিম ও ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার কয়েকজন কর্মকর্তাকে দেখেছেন। প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে সূত্র বলেছে, বিদ্রোহ শুরুর পর ক্যাপ্টেন তানভীর হায়দার তার নূর স্ত্রীকে পিলখানায় ভারতীয় এনএসজি সদস্যদের উপস্থিতির কথা জানান। তার স্ত্রী তাসনুভা মাহা জানান, তিনি বিডিআরের পোশাক পরা তিনজনকে হিন্দিতে গালাগাল করতে শোনেন। সেদিন পিলখানায় হিন্দি, পশ্চিমবঙ্গীয় টানে বাংলা এবং অচেনা ভাষায় কথোপকথন শোনার কথা একাধিক সাক্ষী জানিয়েছেন।
৮২৭ জন ভারতীয় পাসপোর্টধারী নাগরিকের বাংলাদেশে প্রবেশ
কমিশনের এক সদস্য জানান, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের ২৪ থেকে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮২৭ জন ভারতীয় পাসপোর্টধারী এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিদেশি নাগরিক বাংলাদেশে প্রবেশ করেন।  তাদের মধ্যে ৬৫ জনের বহির্গমনের তথ্য পাওয়া যায়নি। একই সময়ে এক হাজার ২২১ জনের বহির্গমনের তথ্য থাকলেও ৫৭ জনের আগমনের কোনো রেকর্ড ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। বিষয়টি আরো তদন্তের প্রয়োজন রয়েছে বলে কমিশন প্রতিবেদনে সুপারিশ করেছে। বিদেশি ভাষা শোনা, বহিরাগতদের পলায়ন, কল তালিকায় বিদেশি নম্বর, ক্যাপ্টেন তানভীরের শেষ কথোপকথনসহ বিভিন্ন তথ্যকে কমিশন প্রতিবেদনে ভারতের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। 
প্রতিবেদনে ১৭ রাজনীতিকের নাম
তদন্ত কমিশন সংশ্লিষ্ট সূত্র বলেছে, পিলখানা হত্যাকাণ্ড ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের ফল, যার পেছনে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। মোট ১৭ জন রাজনৈতিক ব্যক্তির নাম এ ঘটনায় উঠে এসেছে। তারা হলেন শেখ হাসিনা, ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজম, কামরুল ইসলাম, সাহারা খাতুন, ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল, মাহবুব আরা গিনি, আসাদুজ্জামান নূর, তানজীম আহমদ সোহেল তাজ, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, শাহীন সিদ্দিক, কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, মেহের আফরোজ চুমকি, লেদার লিটন এবং মেজর (অব.) খন্দকার আবদুল হাফিজ।
 তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার ‘সবুজ সংকেত’ পাওয়ার পরই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয় এবং বিদ্রোহের শুরুতে তিনি ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। বিডিআরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাকিল আহমেদ সেনা পাঠিয়ে তাদের উদ্ধারের জন্য শেখ হাসিনার কাছে অনুরোধ করলেও তাৎক্ষণিকভাবে সেনা পাঠানো হয়নি এবং রাজনৈতিক সমাধানের নামে সময়ক্ষেপণ করা হয়। এতে হত্যাকারীরা পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিনি ঘটনার বিভিন্ন ধাপে উসকানি, তথ্য গোপন এবং অস্ত্র সমর্পণের নামে ‘প্রহসনমূলক’ উদ্যোগের নেতৃত্ব দেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে পিলখানার কোয়ার্টার গার্ডে গিয়ে তিনি উদ্ধারের কোনো উদ্যোগ নেননি। শেখ সেলিমকে হত্যার ‘সংকেতদাতা’ উল্লেখ করে কমিশন প্রতিবেদনে বলেছে, ঘটনার আগে তার বাসায় বিডিআর সদস্যদের সঙ্গে কয়েকটি বৈঠক হয়। জাহাঙ্গীর কবির নানক ও মির্জা আজমের ক্ষেত্রেও বিদ্রোহের আগে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সাক্ষাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনার দিন মির্জা আজম সাদা কাপড় দেখিয়ে পিলখানায় প্রবেশ করেন, যা হত্যাকারী বিদ্রোহীদের জন্য এক ধরনের সংকেত ছিল। তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজের বিষয়ে কমিশন দায়িত্বে অবহেলা ও সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উল্লেখ করেছে। 
সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ৩০ কর্মকর্তার নাম
কমিশন সূত্র বলেছে, তদন্তে সামরিক বাহিনী, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার ৩০ জনের বেশি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পর্যায়ের দায়িত্বহীনতা, অবহেলা ও সন্দেহজনক আচরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদ, নৌবাহিনীর প্রধান ভাইস এডমিরাল জহিরউদ্দিন আহমেদ, বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার মার্শাল এসএম জিয়াউর রহমানসহ ১২ জন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্য সাবেক সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) সিনা ইবনে জামালী, জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মইনুল ইসলাম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল হাকিম আজিজ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শামসুল আলম চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ইমামুল হুদা, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাহমুদ হোসেন ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মাহবুব সারোয়ার। কমিশনের তদন্ত সূত্র বলছে, তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল মইনের সিদ্ধান্ত এবং আচরণ হত্যাযজ্ঞের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ দেয়। বিডিআরের ডিজি শাকিল পিলখানার ভয়াবহ পরিস্থিতি জানানোর পরও তিনি সেনা পাঠানোর স্পষ্ট নির্দেশ দেননি এবং যুক্তি দেন, অভিযান চালালে ভারতীয় বাহিনী দেশে প্রবেশ করতে পারে। জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ সামরিক শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে ঘটনাস্থলে আওয়ামী লীগ নেতাদের নিয়ে যান। তার বাইরে ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোল্লা ফজলে আকবর, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মামুন খালেদ, মেজর জেনারেল (অব.) ইমরুল কায়েস ও মেজর জেনারেল (অব.) সুলতানুজ্জামান সালেহউদ্দিন; এনএসআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) শেখ মুনিরুল ইসলাম ও মেজর জেনারেল (অব.) টিএম জোবায়ের, র‌্যাবের চার কর্মকর্তা, বিডিআরের তিন কর্মকর্তা এবং পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে। র‌্যাবের সাবেক কর্মকর্তারা হলেন তৎকালীন ডিজি হাসান মাহমুদ খন্দকার, মেজর জেনারেল (অব.) রেজানুর রহমান খান, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আজিম আহমেদ (তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত ডাইরেক্টর ইন্টেলিজেন্স)। কমিশন বলেছে, ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকেও তারা র‌্যাবকে নিষ্ক্রিয় রেখেছেন। বিডিআরের অভিযুক্ত তিন কর্মকর্তা হলেন কর্নেল (অব.) সাইদুল কবির, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফোরকান আহমদ এবং মেজর (অব.) গোলাম মাহবুবুল আলম চৌধুরী। দায়িত্বে অবহেলা, সত্য গোপন করা এবং অপরাধীদের পালানোর সুযোগ দেয়ার অভিযোগ উঠা পুলিশের কর্মকর্তারা হলেন সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ, তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার নাঈম আহমেদ, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি (এসবি) বাহারুল আলম, সাবেক অতিরিক্ত আইজি মনিরুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল কাহার আকন্দ ও তার তদন্ত দল। তৎকালীন আইজিপি শুধু নিজের মেয়ে ও পরিবারের কয়েকজনের  নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন।
সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
পিলখানা হত্যাকাণ্ড চলাকালে ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে তদন্ত কমিশন। সূত্র বলেছে, কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় বেশ কিছু সংবাদমাধ্যম লাইভ অনুষ্ঠান, টক শোসহ বিভিন্ন প্রচারের মাধ্যমে সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উত্তেজনাকর এবং একতরফা খবর প্রচার করেছে, যা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে। কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে, বিদ্রোহীরা বিদ্রোহের সময় সাংবাদিকদের হাতে একাধিক চিরকুট দেয়, যেখানে সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও বিভ্রান্তিকর তথ্য লেখা ছিল। এই তথ্যগুলো যাচাই না করেই তাৎক্ষণিকভাবে প্রচার করে মিডিয়া ‘অবিবেচনাপ্রসূত আচরণ’ করে। কমিশনের মতে, এসব প্রচার জনমনে সেনাবাহিনীর প্রতি বিরূপ মনোভাব তৈরি করে এবং বিদ্রোহীদের পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখে। পিলখানা হত্যাকাণ্ডের পরও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সমাধানের উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে সম্পাদকীয় ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। কমিশন মনে করে, ২০০৯ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টার উপসম্পাদকীয়ও সেই সময়ের বিতর্কিত আলোচনার অংশ ছিল। 
 প্রতিবেদন অনুযায়ী, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘গ্রিন সিগন্যাল’ ছিল পুরো হত্যাযজ্ঞে। দায় নিরূপণে প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সেনাপ্রধান পর্যন্ত সকলকে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থার ব্যর্থতা এবং কিছু গণমাধ্যম ও সাংবাদিকের অপেশাদার ভূমিকাও উঠে এসেছে। কমিশন জানিয়েছে, পিলখানায় নিহত বা যেসব সদস্য রাষ্ট্রীয় বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন, তাদের নাম—পরিচয় ঠিকভাবে সংরক্ষিত হয়নি। তদন্তে দেখা গেছে, বিডিআর হত্যাকাণ্ডে বহিঃশক্তি বিশেষত ভারতের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।
   কমিশনের সদস্য মেজর জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর কবির তালুকদার বলেন, হত্যাকাণ্ডের বাহ্যিক ও প্রকৃত কারণ চিহ্নিত হয়েছে। রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সিভিলিয়ানদেরও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখযোগ্য নামের মধ্যে আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, শেখ সেলিম, মির্জা আজম, জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাহারা খাতুন, জেনারেল তারেক, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মইন, ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান জেনারেল আকবর। পটভূমি হিসেবে বলা যায়, ২০০৯ সালের ২৫—২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় ৫৮ সেনা সদস্যসহ ডিজির স্ত্রী নাজনীন হোসেন শাকিল ও আরো অনেকে হত্যা করা হয়। দুই বছর আগে থেকেই পরিকল্পনা চলছিল এবং ২০০৭ সালে বিপথগামী বিডিআর সদস্যরা ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছিলেন। তারপর বিভিন্ন বৈঠকের মাধ্যমে ২০০৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি হত্যার পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়। 
(লেখাটি আমার ‘ভারতে মুসলিম—বিরোধী রায়ট’ থেকে নেয়া।)

No comments:

Post a Comment