Search This Blog

Thursday, April 14, 2022

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বমুখীতা

নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বমুখীতার প্রতিবাদে আজকের হরতাল কর্মসূচি নিয়ে মন্ত্রীরা একদিকে যেমন হাসিঠাট্টা করছে। অন্যদিকে তাঁরাই আবার পুলিশ দিয়ে জলকামান ও নির্বিচারে লাঠিপেটা করেছে। সরকারী দলও বিভিন্ন পয়েন্টে দাঁড়িয়ে হরতাল প্রতিহতের চেষ্টা চালিয়েছে।

একদিকে দ্রব্যমূল্যের আঘাতে জর্জরিত দেশের মানুষগুলো পঙ্গপালের মত টিসিবির গাড়ির পেছনে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুঁটছে। অন্যদিকে উন্নয়নের মহাসড়কের দাবীদার সরকার আগামীকাল জনগণকে জমকালো এক কনসার্ট উপহার দিচ্ছে। উৎসব আয়োজনের এই মাহেন্দ্রক্ষণে সরকার নিশ্চয়ই বামদের হরতালেও নিজের গদি হারানোর ভয়ে ভীত। নতুবা রাজপথে প্রতিবাদী এই নিরস্ত্র মানুষগুলোকে এভাবে পেটানো হলো কেন? 

যে দেশের সরকার তার জনগণের একটি গ্রহণযোগ্য প্রতিবাদকে পর্যন্ত মানতে না পেরে পুলিশ দিয়ে নির্বিচারে পেটায়। অভূক্ত জনগণের প্রতিবাদ কর্মসূচি নিয়ে হাসিঠাট্টা ও রংতামাশা করে। তারা দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্বকারী সরকার হিসাবে কতটুকু বিশ্বাসযোগ্য?

*সূরা ফাতিহা*



সাত আয়াতের সূরা ফাতিহা’র মধ্যে কি রয়েছে? এর মর্ম ও অর্থ আমরা সবাই হয়ত বুঝিনা। আল্লাহর কাছে আমরা কি চাচ্ছি। আল্লাহর কাছে কি বলছি। সেগুলো মুখস্ত বলছি ঠিকই। কিন্তু তার মানে হয়ত কিছুই জানি না। আসুন, জেনে নেই। 

ٱلْحَمْدُ لِلَّٰهِ رَبِّ ٱلْعَالَمِينَ ۝‎
আলহামদুলিল্লা-হি রাব্বিল আ-লামীন।

সূরা ফাতিহার শুরুতে ‘আলহামদুলিল্লাহ’। অর্থাৎ ‘সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর’ বললেও আসলেই কি আমাদের সমস্ত কিছুর জন্য আল্লাহকে প্রশংসার সবটুকু দিচ্ছি। নাকি জাগতিক তোষামোদি ও চাটুকারিতায় মানুষকেও এই প্রশংসায় শরীক করছি!

‘রাব্বিল আ’লামীন’ অর্থাৎ ‘সমস্ত সৃষ্টি জগত সমূহের প্রভূ’।  ‘রব’ শব্দটি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো বেলায় প্রযোজ্য হতে পারে না। আর বিশ্ব জগত সমূহের উন্মেষ, স্থিতি ও স্থায়িত্ব শুধুমাত্র একক রবের মূখাপেক্ষী। 

ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ ۝‎
আর রাহমা-নির রাহীম।
অর্থাৎ ‘পরম দাতা ও দয়ালু’। 

۝‎ مَالِكِ يَوْمِ ٱلدِّينِ
মা-লিকি ইয়াওমিদ্দীন।
অর্থাৎ ‘বিচার দিবসের মালিক’। ঐ দিবসকে প্রতিফল দিবস বলে। যে দিবসে পুরুস্কার ও তিরস্কার কার্যকর হবে। 

إِيَّاكَ نَعْبُدُ وَإِيَّاكَ نَسْتَعِينُ ۝‎
ইয়্যা-কা না’বুদু ওয়া ইয়্যা-কানাসতা’ঈন।

‘ইয়্যাকা না’বুদু’ অর্থাৎ ‘আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি’। ‘ওয়া ইয়্যা-কানাসতা’ঈন’ অর্থাৎ  ‘আমরা শুধুমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি’।আমরা প্রতি নামাজে একথা ঠিকই বলছি। কিন্তু নিজেকে একটু পরখ করি তো। আমরা কি সত্যিই আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে কোন সাহায্য চাই না। জেনে না জেনে, ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক করছি কিনা।

ٱهْدِنَا ٱلصِّرَاطَ ٱلْمُسْتَقِيمَ ۝‎
ইহদিনাসসিরা-তাল মুছতাকীম।
অর্থাৎ ‘আমাদেরকে সরল পথ দেখাও’। সরল পথ মানে সোজা রাস্তা, যাতে কোন আঁকা-বাকা নেই। যার প্রকৃত অর্থ হচ্ছে ‘ইসলাম’। 

صِرَاطَ ٱلَّذِينَ أَنْعَمْتَ عَلَيْهِمْ ۝‎
সিরা-তাল্লাযীনা আন’আম তা’আলাইহিম।
অর্থাৎ ‘তাঁদের পথে যারা আপনার নে’আমত বা অনুগ্রহ লাভ করেছে’। আল্লাহর করুণা সিক্ত বা অনুগ্রহ প্রাপ্ত প্রিয় ভাজন কারা আল্লাহ পাক নিজেই সূরা নিসা’র ৬৯নং আয়াতে জানিয়ে দিয়েছেন- “নে’আমত প্রাপ্তরা হলেন নবীগণ, সিদ্দীকগণ, শহীদগণ ও সালেহীনগণ।” 

غَيۡرِ ٱلْمَغْضُوبِ عَلَيۡهِمۡ وَلَا اَ۬لضَّآلِّينَ ص۝‎
গাইরিল মাগদূ বি’আলাইহীম ওয়ালাদ দ্বাল্লিন।
অর্থাৎ ‘যারা আপনার অভিসম্পাত গ্রস্ত বা গজব গ্রস্ত তাঁদের পথে নয়, তাদের পথেও নয় যারা পথভ্রষ্ঠ হয়েছে’। রাসূল (সাঃ) বলেন, যাদের প্রতি গজব অবতীর্ণ হয়েছে তারা ‘ইহুদী’, আর যারা পথভ্রষ্ঠ তারা ‘খৃষ্টান’। 
 
আসুন এবার আমরা নিজেকে প্রশ্ন করি। আমরা কি সত্যিই কোনভাবেই ইহুদী খৃষ্টানের মত চলতে চাই না। আমরা কি সত্যিই মনেপ্রানে চাই- নবীদের মত, আল্লাহর বিশ্বাসী বান্দাদের মত, কিংবা শহীদদের মত করে চলতে।

[] সূরা ইখলাস []



মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে আল্লাহ্ তা'আলার বংশপরিচয় জিজ্ঞেস করেছিল। যার জওয়াবে সূরা ইখলাস নাযিল হয়। কোন কোন বর্ণনায় এসেছে, মুশরিকরা আরও প্রশ্ন করেছিল। আল্লাহ তা'আলা কিসের তৈরী? স্বর্ণরৌপ্য অথবা অন্য কিছুর? এর জওয়াবে সূরাটি অবতীর্ণ হয়েছে।

তবে এ বিষয়ে "তাফসির ইবনে কাসীর" এ বলা হয়েছে, যখন ইহুদিরা বলে, ‘আমরা আল্লাহর পুত্র উযায়েরকে উপাসনা করি’। এবং খ্রিস্টানরা বলে, ‘আমরা আল্লাহর পুত্র মাসীহ (ঈসা) এর উপাসনা করি’। এবং জুরোস্ত্রীরা বলে, ‘আমরা সূর্য ও চাঁদের উপাসনা করি’। এবং মুশরিকরা বলে ‘আমরা মূর্তিপূজা করি,'। তখন আল্লাহ তার রাসূলের প্রতি এই সূরাটি অবতীর্ণ করে বলছেন, "বলুনঃ তিনিই আল্লাহ এক। তিনিই এক, একক। তার কোন সমকক্ষ নেই, কোন সহকারী নেই, প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, বরং সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি। এবং তার কোন তুলনাও নেই।"

রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই সূরা ইখলাস এক-তৃতীয়াংশ কুরআনের সমান’। ‘নিশ্চয় সূরা ইখলাসের ভালোবাসা তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে’।

আসুন, জেনে নেই মাত্র চার আয়াতের এই প্রিয় সূরাটির মর্মাথ:-

قُلۡ هُوَ اللّٰهُ اَحَدٌ 
‘ক্বুল্ হু ওয়াল্লাহু আহাদ্’ 
(বলুন, তিনিই আল্লাহ্‌, এক-অদ্বিতীয়)। 

‘আহাদ’- (আল্লাহ এক)। ইসলাম ব্যতীত অন্য সবগুলো ধর্মের লোকেরা আল্লাহর শরীক বা অংশীদার সাব্যস্ত করেছে। যেমন ইহুদীগণ ওযায়েরকে এবং খৃষ্টানগণ ঈসাকে ‘আল্লাহর পুত্র’ বলেছে (সূরা তওবা ৯/৩০)। ত্রিত্ববাদে বিশ্বাসী খৃষ্টানগণ আল্লাহকে ‘তিন উপাস্যের একজন’ বলেছে (সূরা মায়েদাহ ৫/৭৩)। অন্যদিকে ভারতীয় বহু ঈশ্বরবাদীদের তো ভগবানের কোন সংখ্যাসীমাই নেই। এইসব বে-দলীল ও কাল্পনিক কথার জবাব অত্র আয়াতে আল্লাহ ছোট্ট একটি শব্দ দিয়েছেন- ‘আহাদ’ অর্থাৎ আল্লাহ ‘এক’। ‘ওয়াহেদ’ ও ‘আহাদ’ দু’টি শব্দেরই অর্থ ‘এক’। তবে পার্থক্য এই যে, ওয়াহেদ-এর  দ্বিতীয় অর্থ রয়েছে। কিন্তু আহাদ-এর কোন দ্বিতীয় অর্থ নেই। আল্লাহ লা-শারীক। এতে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহর একক হুকুমেই সৃষ্টিজগত পরিচালিত হয়। এতে অন্যের কোন অংশীদারিত্ব নেই। তিনি এক ও অদ্বিতীয়।

اَللّٰهُ الصَّمَدُ
‘আল্লহুস্‌ স্বমাদ’ 
(আল্লাহ্‌ কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী)। 

‘স্বমাদ’- আল্লাহ মুখাপেক্ষীহীন। যিনি সকলের থেকে মুখাপেক্ষীহীন। অথচ সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী। 

لَمۡ یَلِدۡ ۬ۙ وَ لَمۡ یُوۡلَدۡ
‘লাম ইয়ালিদ ওয়া লাম ইউলাদ’ 
(তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি)। 

তাঁর কোন সন্তান নেই বা পিতা নেই বা কোন স্ত্রী নেই (ইবনে কাসীর)। তিনি কারো উত্তরাধিকারী নন এবং কেউ তাঁর উত্তরাধিকারী নয়। স্বয়ং আল্লাহ নিজেই তাঁর পরিচয় দিয়ে বলেন, “তিনিই আসমান ও যমীনের প্রথম সৃষ্টিকর্তা। কিভাবে তাঁর পুত্র সন্তান হবে? অথচ তাঁর কোন স্ত্রী নেই। আর তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই সকল বিষয়ে অবহিত” (সূরা আন‘আম ৬/১০১)। ‘এবং তিনি কারো জন্মিত নন’ বলার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তিনিই আদি সৃষ্টিকর্তা। তাঁর পূর্বে কোন কিছুর অস্তিত্ব ছিল না। 

وَ لَمۡ یَکُنۡ لَّهٗ کُفُوًا اَحَدٌ 
‘ওয়া লাম ইয়া কুল্‌ লাহু কুফুওয়ান আহাদ’ 
(এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই)। 

অর্থাৎ সত্তা ও গুণাবলীতে আল্লাহর সাথে তুলনীয় কিছুই নেই। আল্লাহ নিজেই বলেন, “তাঁর মত কোন কিছুই নেই।’’ (সূরা শুরা/১১)

স্বীয় সত্তা ও গুণাবলীতে আল্লাহ একক ও তুলনাহীন। এই নির্ভেজাল তাওহীদ বিশ্বাসকে যাবতীয় শিরকের কালিমা হ’তে মুক্ত রাখার আহবানই হ’ল সূরা ইখলাসের সারকথা।

[] সূরা আসর []



মাত্র তিন আয়াতের ছোট্ট এই সুরা। এতে আল্লাহ আমাদের সফলতার ফর্মূলা দিয়েছেন। মাত্র চারটি সহজ গুণের এই ফর্মূলা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শপথ করে বলছেন, এই চারটি গুণবিশিষ্ট মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতের সকল ক্ষতি থেকে মুক্ত। এই চারটি হলো, ঈমান, আমল, দাওয়াত ও সবর।
আসুন জেনে নেই সুরা আসরের সেই ফর্মূলাটি:-

১) وَالْعَصْرِ অল্ ‘আছ্রি 
 অর্থ্যাৎ ‘কালের শপথ’।

পবিত্র কুরআনে ৪০টি বিষয়ের শপথ করা হয়েছে। তন্মধ্যে ২০টি ভূমন্ডলীয় ও ২০টি নভোমন্ডলীয়। এই চল্লিশটি সৃষ্ট বস্ত্তর শপথের মধ্যে ‘আসর’ অর্থাৎ কালের শপথ হ’ল কুরআনের তারতীব অনুযায়ী সর্বশেষ শপথ।

২) إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِيْ خُسْرٍ ইন্নাল্ ইন্সা-না লাফী খুস্রিন্
 অর্থ্যাৎ ‘নিশ্চয়ই সকল মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে’।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, ‘হে লোকসকল! জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর জন্য আমি তোমাদের কোমর ধরে আকর্ষণকারী। তোমরা জাহান্নাম থেকে আমার দিকে ফিরে এসো! তোমরা জাহান্নাম থেকে আমার দিকে ফিরে এসো! কিন্তু তোমরা আমাকে পরাস্ত করে জাহান্নামে ঢুকে পড়ছ’।[বুখারী হা/৬৪৮৩, মুসলিম হা/২২৮৪] 
অন্য বর্ণনায় এসেছে, ‘আমি তোমাদেরকে শত্রুবাহিনী থেকে ভয় প্রদর্শনকারী সতর্ককারীর ন্যায়। অতএব তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচো! তোমরা জাহান্নাম থেকে বাঁচো’! [বুখারী হা/৬৪৮২, মুসলিম হা/২২৮৩] 
কিন্তু এটাই বাস্তব সত্য যে, মানুষ জেনে-বুঝে নিজের ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়। এজন্যই আলোচ্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় সকল মানুষ অবশ্যই ক্ষতির মধ্যে রয়েছে’।

৩) إِلاَّ الَّذِيْنَ آمَنُوْا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ ইল্লাল্লাযীনা আ-মানূ ওয়া ‘আমিলুছ্ ছোয়া -লিহা-তি অতাওয়া- ছোয়াও বিল্ হাককি অ তাওয়া-ছোয়াওবিছ্ ছোয়াব্র্

অর্থ্যাৎ ‘তারা ব্যতীত, যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম সম্পাদন করেছে এবং পরস্পরকে ‘হক’-এর উপদেশ দিয়েছে ও পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে’।

অর্থাৎ ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচতে পারে কেবল চারটি গুণবিশিষ্ট মানুষ। যার মধ্যে প্রথম দু’টি হ’ল ব্যক্তিগত ও পরের দু’টি হ’ল সমাজগত। 

প্রথম দু’টির প্রথমটি হ’ল ‘ঈমান’ এবং দ্বিতীয়টি হ’ল ‘আমল’। হৃদয়ে বিশ্বাস, মুখে স্বীকৃতি ও কর্মে বাস্তবায়নের নাম হ’ল ঈমান। আর শরী‘আত অনুমোদিত নেক আমলকেই ‘সৎকর্ম’ বলা হয়। আল্লাহ বলেন,  ‘আর যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের কৃতকর্মের পুরস্কার স্বরূপ তাদের আপ্যায়নের জন্য জান্নাত হবে তাদের বাসস্থান’ (সূরা সাজদাহ, ১৯)। ‘যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারাই হ’ল সৃষ্টির সেরা’। (সূরা বাইয়েনাহ, ৭)।

অন্যদিকে এই আয়াতে বর্ণিত দু’টি সমাজগত গুণের প্রথমটি হ’ল ‘পরস্পরকে হক-এর উপদেশ দেওয়া’। আল্লাহ বলেন,  ‘ঐ ব্যক্তির চাইতে উত্তম কথা কার আছে, যে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহবান করে এবং সৎকর্ম সম্পাদন করে…’ (সূরা হা-মীম সাজদাহ, ৩৩)। 

সমাজগত গুণের দ্বিতীয়টি হ’ল, ‘পরস্পরকে সবরের উপদেশ দেওয়া’। আল্লাহ বলেন,  ‘ধৈর্য্যশীল বান্দাদের বেহিসাব পুরস্কার দান করা হবে’ (সূরা যুমার, ১০)।
সবর তিন প্রকার : (ক) বিপদে সবর করা (খ) পাপ থেকে সবর করা অর্থাৎ বিরত থাকা (গ) আল্লাহর আনুগত্যে সবর করা অর্থাৎ দৃঢ় থাকা।

এই সূরায় বর্ণিত চারটি গুণের মধ্যে শেষোক্ত দু’টি গুণ হ’ল মুসলমানের প্রধান বৈশিষ্ট্য। যেটি আল্লাহ অন্যত্র ‘আমর বিল মা‘রূফ ও নাহি আনিল মুনকার’ বলে অভিহিত করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, ‘তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি। যাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে এ জন্যে যে, তোমরা মানুষকে ন্যায়ের আদেশ দিবে ও অন্যায়ের নিষেধ করবে এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস রাখবে’ (সূরা আল ইমরান, ১১০)।

[] সূরা ফীল []



ছোটবেলা থেকেই পড়ে আসছি সূরা ফীলের ঘটনা। হাতিবাহিনী নিয়ে কা‘বাগৃহ ধ্বংস করার জন্য আবরাহার অভিযানের ঘটনা। ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট ছোট পাখি দিয়ে (যদিও আমরা এই পাখিকে ভুল করে আবাবীল বলে থাকি) কংকর নিক্ষেপ করে হাতিবাহিনীকে নাস্তানাবুদ করার ঘটনা। 

কিন্তু পুরো ঘটনাটি জানলে। সত্যিই আশ্চর্যান্বিত হয়ে যাবেন। ঘটনাটি শুনুন:-

রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর জন্মের ৫০ বা ৫৫ দিন পূর্বে। ইয়ামেনের খ্রিষ্টান গভর্ণর আবরাহা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হস্তীবাহিনীসহ বিশাল সৈন্যদল নিয়ে কা‘বাগৃহ ধ্বংস করার জন্য এসেছিলো। আবরাহা ছিল বেঁটে ও দুর্বল। ফলে ইতিপূর্বে এক লড়াইয়ের সময়। আবরাহার প্রতিপক্ষ আরিয়াত্বের তরবারির আঘাতে তার নাক-মুখ কেটে রক্তাক্ত হয়ে যায়। এ অবস্থায় আবরাহার গোলাম আতাওদাহ হামলা চালিয়ে আরিয়াত্বকে হত্যা করে। আবরাহা আহত অবস্থায় ফিরে আসেন। পরে সুস্থ হয়ে ইয়ামেনের একচ্ছত্র শাসক হন। যুদ্ধে নাক-মুখ কাটা হওয়ার কারণেই তাকে ‘আশরাম’ বলা হতে থাকে। তখন থেকে ‘নাককাটা আবরাহা’ নামে তিনি পরিচিত হন। আবরাহার পুরো নাম ছিল আবরাহা ইবনুছ ছাববাহ।

আবরাহা চিন্তা করলেন যে। আরবদেরকে মক্কায় হজ্জ বাদ দিয়ে ইয়েমেনের গীর্জায় হজ্জ করাতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে সর্বত্র ঘোষণা জারি করলেন যে, এবছর থেকে হজ্জ কা‘বাগৃহের বদলে ইয়েমেনের গীর্জায় হবে। তার এই ঘোষণা সর্বত্র দারুণ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করল। কুরায়েশরা রাগে ফেটে পড়ল। কথিত আছে যে, তাঁদের কেউ একজন এসে ঐ জাঁকজমকপূর্ণ ‘কুল্লাইস’ গীর্জায় গোপনে ঢুকে পায়খানা করে যায়। অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, কুরায়েশদের একদল যুবক ঐ গীর্জায় ঢুকে আগুন ধরিয়ে দেয়। যাতে গীর্জা পুড়ে ধূলিসাৎ হয়ে যায় (ইবনে কাসীর)।

এর প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আবরাহা বিশাল বাহিনী প্রস্তুত করেন। কোন বর্ণনায় ২০ হাজার। কোন বর্ণনায় ৬০ হাজার সৈন্যের কথা এসেছে। তাদের পরিকল্পনা ছিল। লোহার শিকলের এক প্রান্ত কা‘বার দেওয়ালে বেঁধে অন্য প্রান্ত হাতির ঘাড়ে বাঁধা হবে। অতঃপর হাতিকে হাঁকিয়ে দেয়া হবে। যাতে পুরা কা‘বাগৃহ এক সাথে উপড়ে ভেঙ্গে পড়ে (ইবনে কাসীর)।

আবরাহার কা‘বা অভিযানের খবর শুনে সর্বত্র আতংক ছড়িয়ে পড়ল। কিছু সাহসী মানুষ তাকে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুতি নিল। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন ইয়ামেনের সাবেক শাসক বংশের সর্বজনশ্রদ্ধেয় নেতা “যূ-নফর”। তিনি তার নিজ সম্প্রদায় এবং সমস্ত আরব জনগণকে বায়তুল্লাহ রক্ষার পবিত্র জিহাদে তার সাথে শরীক হওয়ার আহবান জানান। ফলে বহু লোক তার পতাকাতলে সমবেত হয়। এবং আবরাহার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কিন্তু অবশেষে তারা পরাজিত হয়। “যূ-নফর” বন্দী হলেন। কিন্তু আবরাহা তাকে হত্যা না করে সঙ্গে নিলেন। কিছু দূর যাওয়ার পর খাশ‘আম এলাকা অতিক্রমের সময় ‘নুফায়েল বিন হাবীব আল-খাশ‘আমী’ তার সম্প্রদায়ের লোকদের নিয়ে বাঁধা দিলেন। কিন্তু তুমুল যুদ্ধের পর তারাও পরাজিত হল। নুফায়েলকে হত্যা না করে আবরাহা তাকেও সাথে নিলেন পথপ্রদর্শক হিসাবে। 

অতঃপর ত্বায়েফ অতিক্রম করার সময় সেখানকার প্রসিদ্ধ ছাক্বীফ গোত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলল। কিন্তু সেটা বায়তুল্লাহর স্বার্থে ছিল না। বরং তাদের ‘লাত’ প্রতিমা রক্ষার স্বার্থে ছিল। কারণ তারা ভেবেছিল যে। আবরাহা তাদের মূর্তি ধ্বংস করার জন্য আসছেন। পরে তারা তাদের ভুল বুঝতে পারল। আবরাহার সম্মানার্থে একজন দক্ষ পথপ্রদর্শক হিসাবে ‘আবু রিগাল’ নামক জনৈক ব্যক্তিকে আবরাহার সাথে পাঠালো। তার নির্দেশনা অনুযায়ী আবরাহা মক্কার অদূরবর্তী ‘মুগাম্মিস’ নামক স্থানে অবতরণ করলেন। অতঃপর তার বাহিনী মক্কার উট-দুম্বা ইত্যাদি গবাদিপশু লুট করা শুরু করল। যার মধ্যে মক্কার নেতা আব্দুল মুত্ত্বালিবের দুশো উট ছিল।

আল্লাহর ইচ্ছায় আবরাহার পথপ্রদর্শক আবু রিগাল মুগাম্মিসে অবতরণ করেই মৃত্যুবরণ করল। সেই থেকে আরবরা তার কবরে পাথর ছুঁড়ে মারে। 

অতঃপর আবরাহা ‘হুনাত্বাহ আল-হিমইয়ারী’ নামক এক ব্যক্তিকে তার প্রতিনিধি হিসাবে মক্কায় পাঠান। এই কথা বলে যে, তিনি যেন মক্কার নেতাকে গিয়ে বলেন যে। আমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে আসিনি। আমরা এসেছি কা‘বাগৃহ ধ্বংস করতে। যদি তারা বাঁধা না দেন। তাহলে তাদের নেতা যেন তার সাথে সাক্ষাৎ করেন। হুনাত্বাহ গিয়ে মক্কার নেতা আব্দুল মুত্ত্বালিবকে সব কথা খুলে বললেন। জওয়াবে আব্দুল মুত্ত্বালিব বললেন, আবরাহার বিশাল বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করার ক্ষমতা আমাদের নেই। এটি আল্লাহর ঘর ও তার বন্ধু ইবরাহীমের ঘর। আল্লাহ তার গৃহের হেফাযত করবেন। 

অতঃপর তিনি তার কয়েকজন পুত্রসহ আবরাহার কাছে গেলেন। আব্দুল মুত্ত্বালিবের সুশ্রী, সুঠাম, সৌম্যকান্তি দেখে আবরাহা শ্রদ্ধায় বিগলিত হয়ে। তার আসন থেকে নেমে এসে তার পাশে বিছানায় বসেন। পূর্ণ সম্মান ও মর্যাদা বজায় রেখে দোভাষীর মাধ্যমে কথা বলেন। আব্দুল মুত্ত্বালিব তাঁর লুট করা দুশো উট ফেরত চাইলেন। কিন্তু কা‘বাগৃহ সম্পর্কে কিছু বললেন না। এতে বিস্মিত হয়ে আবরাহা বললেন, ‘আপনাকে দেখে আমি শ্রদ্ধায় অবনত হয়েছিলাম। কিন্তু এখন আমি বিস্মিত হচ্ছি এজন্য যে, আপনি কেবল আপনার স্বার্থের কথা বললেন। অথচ যে কা‘বাগৃহ আমরা ধ্বংস করতে এসেছি। যা আপনার ও আপনার পিতৃপুরুষের ইবাদতগৃহ। তার সম্পর্কে আপনি কিছুই বললেন না’। 

তখন জবাবে আব্দুল মুত্ত্বালিব বললেন, ‘আমি মালিক উটের। আর ঐ গৃহের একজন মালিক আছেন। যিনি তাকে রক্ষা করবেন’ (তানতাভী)। আবরাহা বললেন, ‘আজ আমার হাত থেকে কাবাকে রক্ষা করার কেউ নেই’। আবদুল মুত্ত্বালিব বললেন, ‘এটা আপনার ও তাঁর (অর্থাৎ আল্লাহর) ব্যাপার’।

আবদুল মুত্ত্বালিব তাঁর দুশো উট নিয়ে ফিরে এলেন। অতঃপর সবাইকে মক্কা থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় নিতে বললেন। তারপর তিনি নিজে ও একদল সাথীসহ গিয়ে কা‘বাগৃহের দরজার চৌকাঠ ধরে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে থাকলেন। কাঁদতে থাকলেন।

অতঃপর আবরাহা যখন মক্কা অভিমুখে রওয়ানা হওয়ার উদ্যোগ নেন। হাতিকে মক্কার দিকে হাঁকাতে চেষ্টা করেন, তখন হাতি বসে পড়ে। অতঃপর শত চেষ্টা করেও হাতিকে মক্কা মুখী করা যায়নি। অথচ ইয়ামেন মুখী করা হলেই কেবল হাতি দৌড় দেয়। মক্কা মুখী করলেই সে বসে পড়ে।

ইতিমধ্যে সাগরের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে অচেনা পাখি আসতে শুরু করে। যাদের প্রত্যেকের মুখে একটি ও দু’পায়ে দু’টি করে কংকর ছিল। যা ডাল ও গমের মত সাইজের। এই কংকর যার মাথায় পড়েছে। সে ধ্বংস হয়েছে। সবাইকে লাগেনি। কিছু আঘাতপ্রাপ্তদের মরতে দেখে বাকী সবাই দিগ্বিদিক ছুটে পালাতে শুরু করে।

আবরাহা বাহিনী মক্কা থেকে পালিয়ে ইয়ামেন পর্যন্ত পথে পথে মরতে মরতে যায়। আবরাহা তার প্রিয় রাজধানী ছান‘আ শহরে পৌঁছে লোকদের কাছে আল্লাহর গযবের ঘটনা বলার পর মৃত্যুবরণ করে। এ সময় তার বুক ফেটে কলিজা বেরিয়ে যায়। ইবনু ইসহাক বলেন, এর পরপরই আল্লাহ তাঁর বিশেষ রহমত স্বরূপ কুরায়েশদের গৃহে তাঁর প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামকে প্রেরণ করেন। এই ঘটনার পর দশ বছর মক্কার লোকেরা মূর্তিপূজা থেকে বিরত থাকে।

এবার সূরাটি পড়ে নেই:-

أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِأَصْحَابِ الْفِيلِ
(১) আলাম তারা কাইফা ফা'আলা রাব্বুকা বিআছহ্বা-বিল ফীল ।      
তুমি কি দেখো নি, তোমার প্রভু হস্তীওয়ালাদের সাথে কিরূপ আচরণ করেছিলেন? 

أَلَمْ يَجْعَلْ كَيْدَهُمْ فِي تَضْلِيلٍ
(২) আলাম ইয়া জ্বআ'ল কাইদা হুম ফী তাদ্বলীলিওঁ।
 তিনি কি তাদের চক্রান্ত নস্যাৎ করে দেননি? 

وَأَرْسَلَ عَلَيْهِمْ طَيْرًا أَبَابِيلَ
(৩) ওয়া আরসালা আ'লাইহিম ত্বইরান আবা-বীল ।       
তিনি তাদের উপরে প্রেরণ করেছিলেন ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি। 

تَرْمِيهِمْ بِحِجَارَةٍ مِنْ سِجِّيلٍ
(৪)  তারমীহিম বিহ্বিজ্বা-রাতিম মিন সিজ্বজ্বীলিন।
 যারা তাদের উপরে নিক্ষেপ করেছিল মেটেল পাথরের কংকর।

فَجَعَلَهُمْ كَعَصْفٍ مَأْكُولٍ
(৫) ফাজ্বা'আলাহুম কা'আছফিম মা'কূল । 
অতঃপর তিনি তাদের করে দেন ভক্ষিত তৃণসদৃশ।

সারকথা :‌
বায়তুল্লাহর হেফাযত ও নিরাপত্তার দায়িত্ব আল্লাহর। আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত পৃথিবীর কোন শক্তি একে ধ্বংস করতে পারবে না।

[] সূরা তাকাসুর []



তাকাসুর শব্দের অর্থ হলো, অধিক কামনা করা বা প্রাচুর্য নিয়ে পরস্পর প্রতিযোগিতা করা। ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, প্রভাব প্রতিপত্তি এসবের অধিক কামনা এবং প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা আমাদের ভালো মন্দ ও ন্যায় অন্যায়ের মাঝে পার্থক্যের ক্ষমতাকে বিনষ্ট করে দেয়। তখনই নেমে আসে বিপর্যয়। বৈধ পন্থা ব্যতীত অবৈধ পন্থায় সম্পদ সংগ্রহ করা, অবৈধ ক্ষমতা, ধন-সম্পদ, প্রভাব প্রতিপত্তির পেছনে এই যে আমাদের সার্বক্ষণিক পাগলের মত ছুঁটে চলা। কিংবা বৈধ সম্পদও আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টির জন্য ব্যয় না করা। আমাদের অসীম এই চাহিদা ও পরিতৃপ্তির যেন কোন শেষ নেই! আর এই ক্রমবর্ধমান প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা একসময় আমাদেরকে আল্লাহর হুকুম এবং আখেরাত হতে উদাসীন করে দিয়ে সোজা কবর পর্যন্ত পৌঁছে দিচ্ছে।

এ সম্পর্কে সূরা তাকাসুরে আল্লাহ বলছেন-

১: أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ “আল হাকুমুত তাকাসুর” 
অর্থ: “প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে।” 

তাকাসুর কথাটির অর্থ ব্যাপক। যা টাকা পয়সা, ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি, সহযোগী-পৃষ্ঠপোষক, বংশ-গোত্র, ক্ষমতা, প্রভাব প্রতিপত্তি প্রভৃতি শামিল। প্রত্যেক ঐ বস্তু যার প্রাচুর্য ও আধিক্য মানুষের প্রিয়। যা অধিকভাবে পাবার প্রচেষ্টা ও কামনা মানুষকে আল্লাহর আহকাম এবং আখেরাত হতে উদাসীন করে দেয়। সেটাই এ আয়াতের উদ্দেশ্য। এখানে আল্লাহ তাআলা মানুষের সেই দুর্বলতাকে ব্যক্ত করেছেন, যার শিকার সর্বযুগে অধিকাংশ মানুষকে হতে হয়েছে।
আল্লাহ বলেন, “আর জেনে রাখ, তোমাদের সম্পদ এবং সন্তান–সন্ততি তোমাদের জন্য পরীক্ষা ছাড়া কিছু নয়, আর নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট রয়েছে মহা পুরস্কার (যারা এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবে তাদের জন্য)।” (সূরা আনফাল: ২৮)

২: حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ “হাত্তা যুরতুমুল মাকাবির” 
অর্থ: “যতক্ষণ না তোমরা কবরে পৌঁছে যাও।” 

এর অর্থ হল, অত্যাধিক্য ধনসম্পদ উপার্জন করার উদ্দেশ্যে পরিশ্রম করতে করতে মৃত্যু তোমাদেরকে গ্রাস করে ফেলল এবং শেষ পর্যন্ত তোমরা কবরে গিয়ে পৌঁছলে!

৩: كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ “কাল লা, সাওফা তা’লামুন” 
অর্থ: “কিন্তু শীঘ্রই তোমরা জানতে পারবে।”

অর্থাৎ সত্য হচ্ছে এই যে মৃত্যু অতি নিকটে। এই পার্থিব জীবনের বাস্তবতা তোমাদের কাছে শীঘ্রই প্রকাশিত হয়ে পড়বে।

৪: ثُمَّ کَلَّا سَوۡفَ تَعۡلَمُوۡنَ  “সুম্মা কাল লা সাওফা তা’লামুন”  অর্থ: “এবং অতঃপর তোমরা শীঘ্রই জানতে পারবে।”

এখানে আল্লাহ একই কথা পুনরাবৃত্তি করার মাধ্যমে এ ব্যাপারটিকে জোড় দিচ্ছেন যে জীবনের বাস্তবতা বুঝতে পারার এই মুহূর্তটি অতি অতি নিকটে! 

৫: كَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْيَقِينِ “কাল লা লাও তা’লামুনা ইলমাল ইয়াকিন।” 
অর্থ: “যদি তোমরা নিশ্চিতভাবে জানতে!”

আমাদের যদি এই নিশ্চিত জ্ঞান থাকত, তাহলে এই জীবন পরীক্ষার বিষয় হত না। যদি মুমিনদেরকে নিশ্চিত জ্ঞান দেয়া হত, তবে তারা কখনও পথভ্রষ্ট হত না। তারা ফেরেশতায় পরিণত হত। কিন্তু আল্লাহ আমাদের পরীক্ষা করতে চান। বুখারী শরীফের হাদীসে আছে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন: “আমি যা জানি, তা যদি তোমরা জানতে, তবে তোমরা অল্পই হাসতে এবং অধিক ক্রন্দন করতে।” 

৬:  لَتَرَوُنَّ الْجَحِيمَ “লা তারাউন্নাল জাহিম।” 
অর্থ: “তোমরা অবশ্যই জাহান্নাম দেখতে পাবে।” 

আমরা প্রত্যেকেই জাহান্নামের আগুন প্রত্যক্ষ করব। তবে এই জীবনে নয়, মৃত্যুর পরের জীবনে। আল্লাহ সূরা মারইয়ামে উল্লেখ করছেন:
“তোমাদের মাঝে এমন কেউ নেই, যাকে এর (জাহান্নামের আগুনের) নিকটে আনা হবে না…” (সূরা মারইয়াম : ৭১)

৭: ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيْنَ الْيَقِينِ “সুম্মা লাতারাউন্নাহা আইনাল ইয়াকীন।” 
অর্থ: “অতঃপর নিশ্চয়ই তোমরা একে (জাহান্নাম) স্বচক্ষে দেখবে।” 

মৃত্যুর পরবর্তী জীবনে আমরা জাহান্নাম স্বচক্ষে দেখতে পারব। আমরা একে নিশ্চিতভাবে দেখব: “আইনুল ইয়াকীন”। রাসূলুল্লাহ (সা) ব্যাখ্যা করেছেন, মুমিনগণ যখন জাহান্নামের আগুন দেখবে, তারা তা দেখে উৎফুল্ল হবে, কেননা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাদেরকে এ থেকে বাঁচিয়েছেন। তারা আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়বে। কিন্তু অবিশ্বাসীদের এ দৃশ্য দেখানোর উদ্দেশ্য হচ্ছে তাদের কষ্ট বৃদ্ধি করা। এ দৃশ্য দেখে তারা চরম দুঃখ, ক্ষোভ (নিজেদের মূর্খতার কারণে), হতাশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়বে, একথা উপলব্ধি করে যে তাদেরকে এখানে থাকতে হবে চিরকাল!

 ৮: ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ عَنِ النَّعِيمِ “সুম্মা লাতুসআলুন্না ইয়াওমাইযিন আনইন্নাইম।” অর্থ: “অতঃপর সেদিন তোমরা অবশ্যই (পার্থিব) আনন্দ–উপভোগ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” 

কিয়ামতে এই জিজ্ঞাসা ঐ সকল নিয়ামত (সুখ-সম্পদ) সম্পর্কে হবে, যা দুনিয়াতে আল্লাহ তাআলা মানুষকে দান করে থাকেন। যেমন, চোখ, কান, হৃদয়, মস্তিষ্ক, শান্তি, সুস্থতা, মাল-ধন ও সন্তান-সন্ততি ইত্যাদি। কোন কোন উলামাগণ বলেন, এই জিজ্ঞাসা কেবলমাত্র কাফেরদেরকেই করা হবে। আবার কেউ কেউ বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তিকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হবে। কেননা, শুধুমাত্র জিজ্ঞাসা করা আযাবের জন্য জরুরী নয়। বরং যারা এ সব নিয়ামতকে আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী ব্যবহার করবে, তাকে প্রশ্ন করা সত্ত্বেও আযাব থেকে নিরাপদে রাখা হবে। আর যারা আল্লাহর নিয়ামতকে অস্বীকার করবে, তারা আযাবে পতিত হবে।

[] সুরা হুমাযাহ []



নামাজের মধ্যে সুরা হুমাযাহ পড়ি। অথচ নামাজ শেষ করেই আবারো শুরু করে দেই ‘হুমাযাহ’ চর্চা। অর্থ না জানার কারনে বুঝতেই পারি না যে, ‘হুমাযাহ’ মানেটা কি। 

‘হুমাযাহ’ হলো, যে মানুষকে মুখের উপরে নিন্দা ও অপদস্থ করে। আর ‘লুমাযাহ’ হলো, যে পিছনে গীবত করে। মহান আল্লাহ এই সূরায় এই  হুমাযাহ ও লুমাযাহকারীকে ধ্বংসের হুশিয়ারী দিয়েছেন। সেই সাথে যে ব্যাক্তি আল্লাহর রাস্তায় খরচ না করে অর্থ সম্পদ জমায় ও তা গণনা করে রাখে, তারও ধ্বংসের কথা বলা হয়েছে। এদের সকলকে ‘হুত্বামাহ’ নামক জাহান্নামে নিক্ষেপ করার কথা বলা হয়েছে। আসুন,  ‘হুত্বামাহ’ জাহান্নামের আগুনের ভয়াবহতা ও এই সূরার অর্থ জেনে নেই:-

وَيْلٌ لِّكُلِّ هُمَزَةٍ لُّمَزَةٍ
অইলুল্লি কুল্লি হুমাযা-তি ল্লুমাযা। 
১) ধ্বংস এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে (সামনা সামনি) লোকদের ধিক্কার দেয় এবং (পেছনে ) নিন্দা করতে অভ্যস্ত৷ 

আরবী هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ  (হুমাযাহ লুমাযাহ) শব্দ দুটি অর্থের দিক দিয়ে কখনো সমার্থক হিসেবে ব্যবহৃত হয়৷ আবার কখনো দু ‘য়ের পার্থক্য হয়৷  
আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাগণ, বেশী ধারণা ও অনুমান করা থেকে বিরত থাকো কারণ কোন কোন ধারণা ও অনুমান গোনাহ ৷ দোষ অন্বেষন করো না ৷ আর তোমাদের কেউ যেন কারো গীবত না করে ৷ এমন কেউ কি তোমাদের মধ্যে আছে, যে তার নিজের মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়া পছন্দ করবে ? দেখো, তা খেতে তোমাদের ঘৃণা হয় ৷ আল্লাহকে ভয় করো ৷ আল্লাহ অধিক পরিমাণে তাওবা কবুলকারী এবং দয়ালু ৷’  (সূরা হুজুরাত, ১২)

﴿الَّذِي جَمَعَ مَالًا وَعَدَّدَهُ﴾
আল্লাযী জ্বামা‘আ মা-লাওঁ অ‘আদ্দাদাহ। 
২) যে অর্থ জমায় এবং তা গুণে গুণে রাখে৷

আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা স্বর্ণ-রৌপ্য জমা করে, অথচ তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদেরকে কঠিন আযাবের সুসংবাদ দাও’। ‘সেদিন জাহান্নামের আগুনে মালগুলি উত্তপ্ত করা হবে। অতঃপর তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্বদেশ ও পৃষ্ঠদেশ দগ্ধ করা হবে (এবং বলা হবে,) এগুলো সেই মাল, যা তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করেছিলে। অতএব এখন তোমাদের সঞ্চয়ের স্বাদ গ্রহণ করো’ (সূরা তওবা, ৩৪-৩৫)।

﴿يَحْسَبُ أَنَّ مَالَهُ أَخْلَدَهُ﴾
ইয়াহ্সাবু আন্না মা- লাহূ য় আখ্লাদাহ্।
৩) সে মনে করে তার অর্থ -সম্পদ চিরকাল থাকবে ৷

অর্থ জমা করার এবং তা গুণে রেখে দেবার কাজে সে এত বেশী মশগুল যে নিজের মৃত্যুর কথা তার মনে নেই ৷ 
মহান আল্লাহতা’আলা বলেছেন-
‘এ ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দুনিয়ার জীবনের একটি সাময়িক সৌন্দর্য-শোভা মাত্র ৷ আসলে তো স্থায়িত্ব লাভকারী সৎকাজগুলোই তোমার রবের কাছে ফলাফলের দিক দিয়ে উত্তম এবং এগুলোই উত্তম আশা-আকাঙ্ক্ষা সফল হবার মাধ্যম ৷’  (সূরা কাহফ, ৪৬)

﴿كَلَّا ۖ لَيُنبَذَنَّ فِي الْحُطَمَةِ﴾
কাল্লা-লাইয়ুম্বাযান্না ফিল্ হুত্বোয়ামাহ্। 
৪) কখনো নয়, তাকে তো  ‘হুত্বামাহ’ বা চূর্ণ - বিচূর্ণকারী জায়গায় ফেলে দেয়া হবে৷

এমন বখীল ব্যক্তিকে ‘হুত্বামাহ’ জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। ‘হুত্বামাহ’ অর্থঃ ভেঙ্গে-চুরে ধ্বংস করা।

﴿وَمَا أَدْرَاكَ مَا الْحُطَمَةُ﴾
অমা-আদ্রা-কা মাল্ হুত্বোয়ামাহ্।
৫) আর তুমি কি জানো সেই  ‘হুত্বামাহ’ বা চূর্ণ - বিচূর্ণকারী জায়গাটি কি ? 

হুত্বামাহ কি? এই প্রশ্নসূচক বাক্য ‘হুত্বামাহ’ জাহান্নামের ভয়াবহতাকে ব্যক্ত করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে। অর্থাৎ, সেটা এমন ভয়ংকর আগুন হবে, যার প্রকৃতত্বে আমাদের জ্ঞান-বুদ্ধি পৌঁছতে পারে না এবং আমরা তা কোনভাবেই বুঝতে বা অনুভব করতে পারবো না।

﴿نَارُ اللَّهِ الْمُوقَدَةُ﴾
না-রুল্লা-হিল্ মূক্বদাহ।
৬) আল্লাহর আগুন ,প্রচণ্ডভাবে উৎক্ষিপ্ত , 

কুরআন মজীদের একমাত্র এখানে ছাড়া আর কোথাও জাহান্নামের আগুনকে আল্লাহর আগুন বলা হয়নি ৷ এখানে এই আগুনকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত করার মাধ্যমে কেবলমাত্র এর প্রচণ্ডতা ও ভয়াবহতারই প্রকাশ হচ্ছে না ৷ বরং এই সংগে এও জানা যাচ্ছে যে , দুনিয়ার ধন – সম্পদ লাভ করে যারা অহংকার ও আত্মম্ভরিতায় মেতে ওঠে তাদেরকে আল্লাহ কেমন প্রচণ্ড ঘৃণা ও ক্রোধের দৃষ্টিতে দেখে থাকেন ৷ এ কারণেই তিনি জাহান্নামের এই আগুনকে নিজের বিশেষ আগুন বলেছেন এবং এই আগুনেই তাকে নিক্ষেপ করা হবে৷

﴿الَّتِي تَطَّلِعُ عَلَى الْأَفْئِدَةِ﴾
আল্লাতী তাত্ত্বোয়ালিউ’‘আলাল্ আফ্য়িদাহ্।
৭) যা হৃদয় অভ্যন্তরে পৌঁছে যাবে ৷

অর্থাৎ, তার উষ্ণতা হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। এমনিতেই পৃথিবীর সাধারণ আগুনের গুণ হল সমস্ত বস্তুকে জ্বালিয়ে ফেলা। কিন্তু পৃথিবীতে এই আগুন হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছনোর পূর্বেই মানুষের মৃত্যু ঘটে যায়। জাহান্নামে তা হবে না; বরং সেই আগুন হৃদয় পর্যন্ত পৌঁছে যাবে। আর মৃত্যুকে আহবান করা সত্ত্বেও মৃত্যু আসবে না।

﴿إِنَّهَا عَلَيْهِم مُّؤْصَدَةٌ﴾
ইন্নাহা- ‘আলাইহিম্ মু’ছোয়াদাতাহ।
৮) তা তাদের ওপর ঢেকে দিয়ে বন্ধ করা হবে

﴿فِي عَمَدٍ مُّمَدَّدَةٍ﴾
ফী ‘আমাদিম্ মুমাদ্দাদাহ্।
৯) (এমন অবস্থায় যে তা ) উঁচু উঁচু থামে (ঘেরাও হয়ে থাকবো )৷
 
‘মুমাদ্দাদাহ’ অর্থ হল বন্ধ বা পরিবেষ্টিত। অর্থাৎ, জাহান্নামের সকল দরজা ও পথ বন্ধ করে দেওয়া হবে; যাতে সেখান হতে কেউ বের হতে না পারে। তাদেরকে লোহার পেরেকের সাথে বেঁধে দেওয়া হবে; যা লম্বা লম্বা স্তম্ভের মত হবে। কোন কোন উলামার মতে, ‘আমাদিম’ অর্থ হলঃ বেড়ি বা লৌহবেষ্টনী এবং কারো মতে এর অর্থ হল স্তম্ভ বা থাম। যাতে বেঁধে জাহান্নামীদেরকে শাস্তি দেওয়া হবে।