তেলের দাম কেন বেড়েছে? আমার ফেসবুকের পোস্টের নিচে এই মন্তব্য থাকে যে আমরা সারাক্ষণ তেল দিই, তাই তেলের দাম বাড়ে! এ ব্যাপারে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ লেখাটা ১৪ দিন আগের লেখায় খানিকটা উদ্ধৃত করেছিলাম।
এবার আমরা একটা সরল অঙ্ক কষব। ৬৫ টাকার ডিজেলের দাম হয়েছে ৮০ টাকা। ৬৫ টাকায় বেড়েছে ১৫ টাকা। শতকরা বাড়ল কত? (১৫/৬৫) x ১০০ = ২৩.০৭। অর্থাৎ দেশে ডিজেলের দাম বেড়েছে ২৩ ভাগ। কিন্তু এর ফলে একটা বাসের টিকিটের দাম কী করে ২৭ ভাগ কিংবা ৩০ ভাগ বাড়বে!
ধরা যাক, একটা বাসের ক্রয়মূল্য ৬০ লাখ টাকা। পাঁচ বছর এই বাসটা চলবে। তাহলে প্রতি মাসে বাসের ক্রয়মূল্য এক লাখ টাকা। ধরা যাক, বাসটায় কর্মচারী আছেন পাঁচজন। তাঁদের মাসিক বেতন এক লাখ টাকা। রুট পারমিট, মেরামতি খরচ, গ্যারেজ খরচ, সার্ভিস চার্জ, লাইসেন্স নবায়ন খরচ মাসে আরও ২০ হাজার টাকা। এর রোজ তেল লাগে তিন হাজার টাকা। তাহলে মাসে তেলের খরচ ৯০ হাজার টাকা। মাসে মোট খরচ আগে ছিল ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মাসে এখন তেলের খরচ বেশি লাগে ৯০ x .২৩ = ২০.৭ হাজার টাকা। তাহলে এখন মাসিক খরচ দাঁড়াচ্ছে ৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা। মাসিক খরচ ৩ লাখ ১০ হাজার টাকার চেয়ে এখন ২১ হাজার টাকা বেড়ে গেছে। শতকরা হারে বেড়েছে (২১/৩১০) x ১০০ = ৬.৭৭। অর্থাৎ বাসভাড়া বাড়তে পারে ৬.৭৭ ভাগ।
অনেকগুলো উপাদানের মধ্যে মাত্র একটি উপাদানের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেটির শতকরা বৃদ্ধির সমান খরচ বা তারও বেশি খরচ পুরো জিনিসটার বাড়ে না। একটা উদাহরণ দিই। ধরুন, একজন একটা ডিম ভাজা বিক্রি করেন ২০ টাকায়। ডিমের দাম ১০ টাকা। পেঁয়াজ, মরিচ, নুনের দাম দুই টাকা। তেলের দাম এক টাকা। এখন এই তেলের দাম হয়েছে ১ টাকা ২৩ পয়সা। তাতে তিনি ডিম ভাজার দাম ২০ টাকা ২৩ পয়সা রাখতে পারেন। কিন্তু পুরো ডিম ভাজার দাম ২০ x .২৩ = ৪.৬০ টাকা বাড়াতে পারেন না। এখন তিনি ডিম ভাজার দাম ২৪ টাকা ৬০ পয়সা রাখতে পারেন না। কারণ, তাঁর খরচ আসলে বেড়েছে শুধু ২৩ পয়সা। তঁাকে ডিমের দাম রাখতে হবে ২০ টাকা ২৩ পয়সা।
এখন আসছে দ্বিতীয় প্রশ্ন। যাঁরা তেলের দাম বাড়ান, তাঁদের একটা অকাট্য যুক্তি আছে। আর তা হলো, যদি বাংলাদেশে তেলের দাম প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বেশি হয়, তাহলে আমাদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা তেল প্রতিবেশী দেশে পাচার হয়ে যায়, যা আমাদের জন্য সমূহ ক্ষতি আর বেদনার কারণ। আমরা এই বেদনা বুঝি। আমরা ফরেন কারেন্সি দিয়ে বিদেশ থেকে তেল এনে ভর্তুকি দিয়ে কৃষককে কিংবা পরিবহন খাতকে দেব বলে দাম কমিয়ে রাখছি, সেই কষ্টার্জিত তেল চলে যাবে প্রতিবেশী দেশে, ভর্তুকির গুড় পিঁপড়ায় খাবে, তা হতে দেওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে কি আমরা একটা কথা বলতে পারি! আমাদের সীমান্তগুলোকে নিশ্ছিদ্র করুন। আমরা তেলের বদলে গরু চাই না। আমাদের চাষিরা এরই মধ্যে দেশেই গরু-ছাগল উৎপাদন করে দেশকে লাইভস্টকের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে ফেলেছেন। আর যা যা আমাদের প্রতিবেশী দেশ থেকে বা দূরদেশ থেকে আমদানি করতে হবে, তা আমরা নিয়মকানুন মেনে কর-শুল্ক দিয়ে আনব। তাতে আমাদের অর্থনীতি পুষ্ট হবে।


No comments:
Post a Comment