Search This Blog

Sunday, January 25, 2026

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী — মেজর এম এ জলিল


স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী — মেজর এম এ জলিল

মেজর এম এ জলিল—একটি নাম, যা স্বাধীনতার পরেও বন্দিত্বের প্রতীক। একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি বিজয়ের পতাকা দেখেছেন, কিন্তু স্বাধীনতার স্বাদ পাননি।

🇧🇩 স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১—বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু সেই স্বাধীনতার আলো মেজর এম এ জলিলের জীবনে পৌঁছাতে পারেনি। কারণ, তিনি অপরাধ করেছিলেন একটিই— জাতির সম্পদ রক্ষার অপরাধ।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণের সময় রেখে যাওয়া অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম ভারতীয় সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বাধা দিয়েছিলেন। খুলনা সীমান্ত দিয়ে দেশের সম্পদ পাচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন।

এই “অপরাধের” জন্যই ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭১— মেজর এম এ জলিলকে গ্রেফতার করা হয়।

তাঁকে প্রথমে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে অবস্থিত সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে কার্যত তাঁকে নজরবন্দী করে রাখা হয়।

একজন মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার— স্বাধীন দেশে পরিণত হলেন প্রথম রাজবন্দীতে।

🔥 যে প্রতিবাদ তাঁকে ইতিহাসে অমর করেছে

ভারতীয় সেনাবাহিনীর দ্বারা অস্ত্র, গোলাবারুদ লুটপাট ও সীমান্ত দিয়ে দেশের সম্পদ পাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানই তাঁকে করে তুলেছিল অনন্য।

মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন ৯ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার। সাহস, দৃঢ়তা আর নৈতিকতার কারণে তিনি শুধু একজন সামরিক কর্মকর্তা নন—তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রতিরোধের প্রতীক।

🌱 জন্ম ও শৈশব

১৯৪২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি—বরিশাল জেলার উজিরপুরে, নানার বাড়িতে জন্ম নেন মেজর এম এ জলিল।

পিতা: জোনাব আলী চৌধুরী মাতা: রাবেয়া খাতুন

তাঁর জন্মের মাত্র তিন মাস আগেই পিতৃহারা হন তিনি। উজিরপুরেই কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোর।

১৯৫৯ সালে উজিরপুর ডব্লিউ বি ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক পাশ করেন।

🐟 চাকরি থেকে সামরিক জীবনের পথে

শুরুতে ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টে চাকরি করলেও পড়াশোনার টানে চাকরি ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে যান।

১৯৬১ সালে মারি ইয়ং ক্যাডেট ইনস্টিটিউশন থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন এবং একই সঙ্গে গ্রহণ করেন সামরিক শিক্ষা।

১৯৬২ সালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে ট্রেনিং অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। চাকুরিরত অবস্থায় বি.এ পাস করেন।

⚔️ একজন দক্ষ সেনা কর্মকর্তা

১৯৬৫ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে ১২ নম্বর ট্যাঙ্ক ক্যাভালরি রেজিমেন্টের অফিসার হিসেবে পাক-ভারত যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

১৯৬৬ সালে যুদ্ধবিরতির পর পাকিস্তান একাডেমি থেকে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। পরে মুলতানে কর্মরত অবস্থায় ইতিহাসে এম.এ পাশ করেন।

১৯৭০ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন।

🔥 মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যাবর্তন

১৯৭১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মায়ের অসুস্থতার কারণে এক মাসের ছুটি নিয়ে বরিশালে আসেন। মার্চেই যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।

তিনি নিযুক্ত হন ৯ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে। তাঁর নেতৃত্ব, কৌশল ও দেশপ্রেম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।

🏅 অবহেলিত বীর

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য—মেজর এম এ জলিলসহ কয়েকজন সেক্টর কমান্ডারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের কোনো খেতাব দেওয়া হয়নি।

কিন্তু ইতিহাস জানে— খেতাব না পেলেও তাঁর অবদান মুছে যায় না।

🕊️ ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এক বীর

মেজর এম এ জলিল প্রমাণ করেছিলেন— স্বাধীনতা শুধু শত্রু পরাজিত করার নাম নয়, স্বাধীনতা মানে নিজের দেশের সম্পদ, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষা করা।

তিনি ছিলেন সেই বিরল মুক্তিযোদ্ধা, যিনি বিজয়ের পরও মাথা নত করেননি।

📌 মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

🇧🇩 শ্রদ্ধা ও সালাম—স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী মেজর এম এ জলিলকে।

এই লেখা যদি আপনাকে ভাবায়, স্পর্শ করে—শেয়ার করুন। নতুন প্রজন্ম জানুক, ইতিহাসের আড়ালে থাকা এই সাহসী অধ্যায়ের কথা।

✍️ Shariful Islam Razu

No comments:

Post a Comment