Search This Blog

Thursday, April 14, 2022

[] সূরা মাঊন []



আমরা তো দীর্ঘদিন ধরেই সূরা মাঊন পড়ছি। কিন্তু ‘মাঊন’ কাকে বলে, তা কি জানি? যেমন ধরুন, আপনার প্রতিবেশী আপনার কাছে গৃহস্থলির ব্যবহার্য ছোটখাটো সামান্য কিছু জিনিস চাইলেন। অথচ আপনি তাকে নানান টালবাহানা দেখিয়ে বিদায় করে দিলেন। এই ধরনের সামান্য দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসকেই ‘মাঊন’ বলা হয়েছে। যারা এই ছোট-খাট নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী অন্যকে দিতে বিরত থাকে, যারা এতিমের হক মেরে খায় এবং তাদেরকে সম্পত্তি থেকে বেদখল করে, যারা মিসকীনকে খাদ্যদানে উদ্বুদ্ধ করে না, যারা নিজেদের নামাজ সম্পর্কে বেখবর এবং লোক দেখানোর জন্য নামাজ পড়ে — আসুন এদের সম্পর্কে এ সূরায় আল্লাহ কি বলেছেন তা জেনে নেই:-

أَرَءَيْتَ ٱلَّذِى يُكَذِّبُ بِٱلدِّينِ
‘আরয়াইতাল্লাযী- ইয়ুকায্যিবু বিদ্দীন্।’ (আপনি কি তাকে দেখেছেন, যে কর্মফলকে মিথ্যা বলছে)? 
‘আপনি কি তাকে দেখেছেন’ বাক্যে এখানে বাহ্যত সম্বোধন করা হয়েছে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)কে। আর “আদ্ দ্বীন” শব্দটি থেকে আখেরাতের কর্মফল বা শাস্তি ও পুরস্কারকে বুঝানো হয়েছে। 

 فَذَٰلِكَ ٱلَّذِى يَدُعُّ ٱلْيَتِيمَ
‘ফাযা-লিকাল্লাযী ইয়াদু’উ’ল্ ইয়াতীমা’ (সে-ইতো সেই ব্যক্তি যে ইয়াতীমকে রূঢ়ভাবে তাড়িয়ে দেয়)। 
এর কয়েকটি অর্থ হয়। এক, সে এতিমের হক মেরে খায় এবং তার বাপের পরিত্যক্ত সম্পত্তি থেকে বেদখল করে তাকে সেখান থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। দুই, এতিম যদি তার কাছে সাহায্য চাইতে আসে তাহলে দয়া করার পরিবর্তে সে তাকে ধিক্কার দেয়। তিন, সে এতিমের ওপর জুলুম করে। 

وَلَا يَحُضُّ عَلَىٰ طَعَامِ ٱلْمِسْكِينِ
‘অলা-ইয়াহুদ্ব্দু ‘আলা-তোয়া‘আ- মিল্ মিসকীন্।’ (আর মিসকীনকে খাদ্যদানে উদ্বুদ্ধ করে না)। 
সে মিসকিনকে খাবার দিতে নিজেকে উদ্বুদ্ধ করে না। নিজের পরিবারের লোকদেরকেও উদ্বুদ্ধ করে না। এবং অন্যদেরকেও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করে না যে, সমাজে যেসব গরীব ও অভাবী লোক অনাহারে মারা যাচ্ছে তাদের হক আদায় করা এবং তাদের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য কিছু করো।

فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ
‘ফাওয়াইলুল্লিল্ মুছোয়াল্লীনা’। (অতএব সেই সালাত আদায়কারীদের জন্য দুভোর্গ)।

ٱلَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ
‘আল্লাযীনাহুম্ ‘আন্ ছলা-তিহিম্ সা-হূন্।’ (যারা নিজেদের নামাজ সম্পর্কে বেখবর)।  
নামায পড়া ও না পড়া উভয়টিরই তাদের দৃষ্টিতে কোন গুরুত্ব নেই। কখনো তারা নামায পড়ে আবার কখনো পড়ে না। যখন পড়ে, যেন কোন আপদ তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এটাই আখেরাতের প্রতি ঈমান না রাখার আলামত।

ٱلَّذِينَ هُمْ يُرَآءُونَ
‘আল্লাযীনা হুম্ ইয়ুরা-য়ূনা’ (যারা তা লোক দেখানোর জন্য করে)। 
সৎকাজও তারা আন্তরিক সংকল্প সহকারে আল্লাহর জন্য করে না। বরং যা কিছু করে অন্যদের দেখাবার জন্য করে। আল্লাহ বলেন, “আর যখন তারা নামাযের জন্য ওঠে অবসাদগ্রস্তের ন্যায় ওঠে। লোকদের দেখায় এবং আল্লাহকে স্মরণ করে খুব কমই।” (সূরা নিসা ১৪২)

وَيَمْنَعُونَ الْمَاعُونَ
‘অইয়াম্ না‘ঊনাল্ মা-‘ঊন্।’ (এবং ছোট-খাট নিত্য ব্যবহার্য সামগ্রী অন্যকে দিতে বিরত থাকে)।
অধিকাংশ তাফসীরকারের মতে, সাধারণত প্রতিবেশীরা একজন আর একজনের কাছ থেকে গৃহস্থালীর দৈনন্দিন যেসব জিনিস চেয়ে নিয়ে থাকে সেগুলোই মাঊনের অন্তর্ভুক্ত। এ জিনিসগুলো অন্যের কাছ থেকে চেয়ে নেয়া কোন অপমানজনক বিষয় নয়। কারণ ধনী-গরীব সবার এ জিনিসগুলো কোন না কোন সময় দরকার হয়। অবশ্য এ ধরনের জিনিস অন্যকে দেবার ব্যাপারে কার্পণ্য করা হীন মনোবৃত্তির পরিচায়ক। এই আয়াতের মূল বক্তব্য হচ্ছে, আখেরাত অস্বীকৃতি মানুষকে এতবেশী সংকীর্ণমনা করে দেয় যে, সে অন্যের জন্য সামান্যতম ত্যাগ স্বীকার করতেও রাজি হয় না।

[] সূরা ফালাক্ব []



সূরা ফালাক্ব। অন্ধকার (মিথ্যা, অন্যায়) ভেদ করে আলো (সত্য) প্রকাশের সূরা। এই সূরায় রাতের অন্ধকারের কথা এসেছে, যা সাধারনভাবে শয়তান বা খারাপ কিছুর পরিচায়ক। এরপর যাদুর কথা এসেছে, যা একটি কালো বস্তু (সম্পূর্ন হারাম কাজ)। শিরক একটি অন্ধকার পর্যায়। হিংসা; চরিত্রের একটি অন্ধকার দিক। সুতরাং এইসব অন্ধকারকে ভেদ করে আলোর প্রকাশকারী আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হয়েছে এই সূরায়। 

মুশরিকরা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সত্তা যেমন জিন, দেবী ও দেবতাদের কাছে এ ধরনের আশ্রয় চাইতো এবং আজো চায়৷ বস্তুবাদীরা এ জন্য বস্তুগত উপায় ও উপকরণের দিকে মূখ ফিরায়৷ কারণ, তারা কোন অতি প্রাকৃতিক শক্তিতে বিশ্বাসী নয় ৷ কিন্তু মু'মিনরা যেসব আপদ বিপদ ও বালা মুসিবতের মোকাবেলা করার ব্যাপারে নিজেকে অক্ষম মনে করে, সেগুলোর ব্যাপারে তারা একমাত্র মহান আল্লাহর দিকেই মুখ ফিরায়। এবং একমাত্র আল্লাহর কাছেই আশ্রয় প্রার্থনা করে৷ 

আসুন সূরাটি অর্থ সহ পড়ে নেই-

১) قُلْ أَعُوذُ بِرَ‌بِّ الْفَلَقِ
“কুল্ আ‘ঊযু বিরব্বিল্ ফালাক্বি”
‘বলুন, আশ্রয় চাচ্ছি আমি প্রভাতের রবের।’   

১ম শব্দ ‘ক্বুল’ এর তাৎপর্য অনেক। আল্লাহ এখানে ‘ক্বুল’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন কারন আল্লাহ চান মানুষ তাঁর দূর্বলতাকে মুখে প্রকাশ করুক। মুখে প্রকাশ করা বা বলার মাধ্যমে অহংকার দূর হয়। আমার কোন সাহায্য, আশ্রয়ের দরকার নাই এমন চিন্তা দূরীভুত হয়। মুখে বলে আশ্রয় চাওয়ার কারনে রবকে মান্য করার বিষয়টি চলে আসে। 

‘ফালাক’ শব্দটি কোন কিছু ভেদ করে নতুন কিছুর আত্মপ্রকাশ বুঝায়। যেকোন সৃষ্টির জন্যই এটি সত্য। বীজ মাটি ভেদ করে গাছ হিসাবে বের হয়। ঝরনা পাহাড় ভেদ করে। বৃষ্টি মেঘ ভেদ করে। মানুষসহ বিভিন্ন প্রানী গর্ভ ভেদ করে আবির্ভুত হয়। অস্তিত্ব জগতের প্রতিটি জিনিস কোন না কোনভাবে আবরণ ভেদ করার ফলে অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্ব লাভ করে৷ এমনকি পৃথিবী ও সমগ্র আকাশ মণ্ডলও প্রথমে একটি স্তূপ ছিল৷ তারপর তাকে বিদীর্ণ করে পৃথক পৃথক অস্তিত্ব দান করা হয়েছে৷ যেমন, “এ আকাশ ও পৃথিবী সবকিছুই স্তূপীকৃত ছিল, পরে আমি এদেরকে আলাদা আলাদা করে দিয়েছি৷” ( আল আম্বিয়া ,৩০) 

" রাব্বুল ফালাক " এর অর্থ যদি প্রভাতের রব ধরা হয়, তাহলে তাঁর আশ্রয় চাওয়ার মানে হবে, যে রব অন্ধকারের আরবণ ভেদ করে প্রভাতের আলো বের করে আনেন আমি তাঁর আশ্রয় নিচ্ছি৷ আর যদি এর অর্থ সৃষ্টিজগতের রব ধরা হয়, তাহলে এর মানে হবে, আমি সমগ্র সৃষ্টির মালিকের আশ্রয় নিচ্ছি৷ তিনি নিজের সৃষ্টির অনিষ্টকারিতা থেকে আমাকে বাঁচাবেন৷

২) مِن شَرِّ‌ مَا خَلَقَ
“মিন্ শার রি মা-খলাক্ব”
‘তিনি যা সৃষ্টি করেছেন, তার অনিষ্ট থেকে।’

অন্য কথায়, সমগ্র সৃষ্টির অনিষ্টকারিতা থেকে আমি তাঁর আশ্রয় চাচ্ছি৷ এ বাক্যে অনিষ্টকারিতা সৃষ্টির ব্যাপারটিকে আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত করা হয়নি৷ বরং বলা হয়েছে, আল্লাহ যেসব জিনিস সৃষ্টি করেছেন, তাদের অনিষ্টকারিতা থেকে আশ্রয় চাচ্ছি৷ এ থেকে জানা যায়, মহান আল্লাহ কোন সৃষ্টিকে অনিষ্টকারিতার জন্য সৃষ্টি করেননি৷ বরং তাঁর প্রত্যেকটি কাজ কল্যাণকর এবং কোন না কোন কল্যাণমূলক প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্যই হয়ে থাকে৷ তবে সৃষ্টির মধ্যে তিনি যেসব গুণ সমাহিত করে রেখেছেন। যেগুলো তাদের সৃস্টির উদ্দেশ্য পূর্ণ করার জন্য প্রয়োজন।সেগুলো থেকে অনেক সময় এবং অনেক ধরনের সৃষ্টি প্রায়ই অনিষ্টকারিতার প্রকাশ ঘটে৷

৩) وَمِن شَرِّ‌ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ
“অমিন্ শাররি গ-সিক্বিন্ ইযা-অক্বাব্”
‘অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে, যখন তা সমাগত হয়।’

রাতের অন্ধকারের অনিষ্টকারতা থেকে বিশেষ করে পানাহ চাওয়ার নির্দেশ দেবার কারণ হচ্ছে এই যে, অধিকাংশ অপরাধ ও জুলুম রাতের অন্ধকারেই সংঘটিত হয়৷  আর এ আয়াতগুলো নাযিল হবার সময় আরবে রাজনৈতিক অরাজকতা যে অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল তাতে রাতের চিত্র তো ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ৷ রাতের অন্ধকারে চাঁদর মুড়ি দিয়ে লুটেরা ও আক্রমণকারীরা বের হতো ৷ তারা জনবসতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তো, লুটতরাজ ও খুনাখুনি করার জন্য। যারা রসূলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রাণ নাশের চেষ্টা করছিল, তারাও রাতের আঁধারেই উনাকে হত্যা করার পরিকল্পনা তৈরি করেছিল৷ তাই রাতের বেলা যেসব অনিষ্টকারিতা ও বিপদ আপদ নাযিল হয় সেগুলো থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়ার হুকুম দেয়া হয়েছে৷ 

৪) وَمِن شَرِّ‌ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ
“অমিন্ শাররি ন্নাফ্ফা-ছা-তি ফিল্ ‘উক্বদ্”
 ‘গিরায় ফুঁৎকারদানকারীদের (বা কারিনীদের) অনিষ্টকারিতা থেকে৷’

মুফাসসিরের মতে, গিরায় ফুঁক দেয়া শব্দটি যাদুর জন্য রূপক অর্থে ব্যবহার করা হয়৷ কারণ যাদুকর সাধারণত কোন সূতায় বা ডোরে গিরা দিতে এবং তাতে ফুঁক দিতে থাকে৷ কাজেই আয়াতের অর্থ হচ্ছে, আমি পুরুষ যাদুকর বা মহিলা যাদুকরদের অনিষ্ট থেকে বাঁচার জন্য প্রভাতের রবের আশ্রয় চাচ্ছি৷ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ওপর যখন যাদু করা হয়েছিল, তখন জিব্রীল (আঃ) এসে উনাকে সূরা আল ফালাক ও আন নাস পড়তে বলেছিলেন৷ 

যাদুর ব্যাপারে অবশ্যই একথা জেনে রাখতে হবে যে, যাদুর মধ্যে অন্য লোকের ওপর খারাপ প্রভাব ফেলার জন্য শয়তানের সাহায্য চাওয়া হয়৷ এ জন্য কুরআনে একে কুফরী বলা হয়েছে৷ যেমন, "সুলাইমান কুফরী করেনি৷ বরং শয়তানরা কুফরী করেছিল৷ তারা লোকদেরকে যাদু শেখাতো৷" ( আল বাকারা , ১০২ ) 

সাবধান!! যেকোন যাদুটোনা হারাম। এমনকি এগুলোর মধ্যে কোন কুফরী কালাম বা শিরকী কাজ না থাকলেও হারাম। তা সর্বাবস্থায় ও সর্বসম্মতিক্রমে সম্পুর্ন হারাম৷ রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যাদুটোনাকে এমন সাতটি কবীরা গোনাহের অন্তরভুক্ত করেছেন, যা মানুষের আখেরাত সম্পূর্ন বরবাদ করে দেয়৷  আল্লাহ আমাদেরকে হেফাজত করুন।

৫) وَمِن شَرِّ‌ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ
“অমিন্ শাররি হা-সিদিন্ ইযা-হাসাদ্”
‘এবং হিংসুকের অনিষ্টকারিতা থেকে, যখন সে হিংসা করে৷’

হিংসার মানে হচেছ-— কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ যে অনুগ্রহ, শ্রেষ্ঠত্ব বা গুণাবলী দান করেছে তা দেখে অপর ব্যক্তি নিজের মধ্যে জ্বালা অনুভব করে। এবং তার থেকে ওগুলো ছিনিয়ে নিয়ে সেগুলো তাকে দেয়া হোক। অথবা কমপক্ষে তার থেকে সেগুলো অবশ্যই ছিনিয়ে নেয়া হোক।এইসব আশা করতে থাকে৷ 

তবে কোন ব্যক্তি যদি আশা করে, অন্যের প্রতি যে অনুগ্রহ করা হয়েছে তার প্রতিও তাই করা হোক, তাহলে এটাকে হিংসার সংজ্ঞায় ফেলা যায় না৷ 

এখানে হিংসুক যখন হিংসা করে অর্থাৎ তার মনের আগুন নিভানোর জন্য নিজের কথা ও কাজের মাধ্যমে কোন পদক্ষেপ নেয়, সেই অবস্থায় তার অনিষ্টকারিতা থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আশ্রয় চাওয়া হয়েছে৷ 

হযরত আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) কোন রোগে আক্রান্ত হলে সূরা ফালাক ও সূরা নাস পাঠ করে হাতে ফুঁক দিয়ে সর্বাঙ্গে বুলিয়ে দিতেন। ইন্তেকালের পূর্বে যখন উনার রোগযন্ত্রণা বৃদ্ধি পায়, তখন আমি এই সূরাদ্বয় পাঠ করে উনার হাতে ফুঁক দিতাম। অতঃপর তিনি নিজে তা সর্বাঙ্গে বুলিয়ে নিতেন। আমার হাত উনার পবিত্ৰ হাতের বিকল্প হতে পারতনা। তাই আমি এরূপ করতাম।’ [বুখারী: ৫০১৬, মুসলিম: ২১৯২] 

সারকথা এই যে, যাবতীয় বিপদাপদ থেকে নিরাপদ থাকার জন্যে রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরাম সূরা ফালাক্ব ও সূরা নাস এই সূরাদ্বয়ের আমল করতেন।

[] সূরা কাফিরুন []



মিলেমিশে একে অন্যের ধর্ম পালনের পদ্ধতি। কিংবা মিলেমিশে একে অন্যের ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান উদযাপনের পদ্ধতি। এগুলো নতুন কোন কৌশল নয়। রাসূল (সাঃ) মক্কায় তাওহীদের দাওয়াত দেয়া মাত্রই মক্কার কুরাইশগণ উনার উপর অমানষিক নির্যাতন শুরু করে। জুলুম নির্যাতন করেও যখন ইসলামের অগ্রযাত্রা রুখতে ব্যর্থ হয়। তখন তারা এক নতুন কৌশল আবিস্কার করে। আর সেটা হলো মিলেমিশে একে অন্যের ধর্ম পালন করার কৌশল। এটা ছিল অনেকটা বর্তমান সময়ের অনুরুপ তাওহীদ (আল্লাহর একত্ববাদ) ও কুফরীর মধ্যে একটা গোজামিলের ধর্মীয় আপোষ ও মীমাংসার প্রস্তাব। 

কুরাইশদের কাফের সম্প্রদায় তখন রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)কে আহবান করেঃ তিনি এক বছর তাদের মূর্তির পূজা করবেন। আর তারাও এক বছর আল্লাহর ইবাদত করবে (নাউজুবিল্লাহ)। 

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ণনা করেছেন, কুরাইশদের কাফের সম্প্রদায় রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে বললো : আমরা আপনাকে এত বেশী পরিমাণ ধন- সম্পদ দেবো যার ফলে আপনি মক্কার সবচেয়ে ধনাঢ্য ব্যক্তি হয়ে যাবেন। যে মেয়েটিকে আপনে পছন্দ করবেন তার সাথে আপনার বিয়ে দিয়ে দেবো। আমরা আপনার পিছনে চলতে প্রস্তুত । আপনি শুধু আমাদের একটি কথা মেনে নেবেন — আমাদের উপাস্যদের বিরোধিতা করা থেকে বিরত থাকবেন। এ প্রস্তাবটি আপনার পছন্দ না হলে আমরা আরও একটি প্রস্তাব পেশ করছি। এ প্রস্তাবে আপনার লাভ এবং আমাদেরও লাভ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জিজ্ঞেস করেন, সেটি কি? এক বছর আপনি আমাদের উপাস্যদের ইবাদাত করবেন এবং আমরাও এক বছর আপনার উপাস্যকে ইবাদাত করবো। এর জবাবে মহান আল্লাহ সুরা কাফিরুন নাজিল করেন। 

ইবনে আব্বাস (রাঃ)এর অন্য একটি রেওয়ায়াতে বলা হয়েছে, কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে বললো : “যদি আপনি আমাদের উপাস্য মুর্তিগুলোকে চুম্বন করেন তাহলে আমরা আপনার মাবুদের ইবাদাত করবো।” একথায় এই সূরাটি নাজিল হয়। (আবদ ইবনে হুমাইদ)

ওহাব ইবনে মুনাব্বাহ রেওয়ায়াত করেন, কুরাইশদের কাফের সম্প্রদায় রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে বলে, যদি আপনি পছন্দ করেন তাহলে এই বছর আমরা আপনার দ্বীনে প্রবেশ করবো এবং এক বছর আপনি আমাদের ধর্ম পালন করবেন। (আবদ ইবনে হুমাইদ ও ইবনে আবী হাতেম)

এই অনৈতিক ও হাস্যকর প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ তায়ালা রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)এর উপর পবিত্র এই সূরাটি নাজিল করেন। এবং আল্লাহ তায়ালা নির্দেশ দেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ) যেন তাদের প্রস্তাব, তাদের আকিদা ও তাদের ধর্ম থেকে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করেন।

আল্লাহ্ তা’আলা নির্দেশ দিচ্ছেন তাঁর নবী (সাঃ)কে। তিনি যেন সুষ্পষ্ট ও প্রকাশ্য ভাবে কাফেরদের সামনে ঘোষণা করে দেন যে- আল্লাহকে বাদ দিয়ে প্রকাশ্যে বা গোপনে তারা যাদের ইবাদত করে থাকে তা থেকে তিনি সম্পূর্ণ মুক্ত ও পবিত্র। শির্কের সাথে মিশ্রিত ইবাদত আল্লাহর কাছে কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ কারণে আল্লাহ্ তা’আলা দু’দলের মধ্যে এভাবে পার্থক্য করে দিয়েছেনঃ (لكم دينكم ولي دين) “তোমাদের দ্বীন তোমাদের জন্য, আমার দ্বীন আমার জন্য।”

এই সূরায় যারা বিভিন্ন ধর্মের মাঝে দূরুত্ব কমিয়ে পরষ্পরের নিকটবর্তী হওয়ার কথা বলে। তাদেরকে সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে যে, ইসলামই একমাত্র হক ধর্ম। তা ছাড়া অন্যান্য সকল ধর্ম বাতিল।  ইমাম শাফেয়ী (রঃ) (لكم دينكم ولي دين) “তোমাদের দ্বীন তোমাদের জন্য, আমার দ্বীন আমার জন্য” - এ আয়াতটি থেকে এ দলিল নিয়েছেন যে, সকল কাফেরের ধর্ম একই। আসুন, এবার পুরো সূরাটি দেখে নেই:-

১। 
قُلْ يَا أَيُّهَا الْكَافِرُونَ
‘ক্কুল ইয়া- আইয়্যূহাল কা-ফিরূন।’
বলুন, হে কাফের দল! 

২। 
لَا أَعْبُدُ مَا تَعْبُدُونَ
‘লা- ‘আবুদু মা- ‘তাবুদূন।’
আমি তার ইবাদত করি না, যার ইবাদত তোমরা কর।

৩। 
وَلَا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ
‘ওয়ালা- আন্তুম ‘আ-বিদূনা মা- ‘আবুদ।’
এবং তোমরাও তাঁর ইবাদতকারী নও, যাঁর ইবাদত আমি করি।

৪। 
وَلَا أَنَا عَابِدٌ مَا عَبَدْتُمْ
‘ওয়ালা- আনা ‘আবিদূম্ মা- ‘আবাত্তুম।’
এবং আমি ইবাদতকারী নই তার, যার ইবাদত তোমরা করে থাক।

৫। 
وَلَا أَنْتُمْ عَابِدُونَ مَا أَعْبُدُ
‘ওয়ালা- আন্তুম ‘আ-বিদূনা মা- ‘আবুদ।’
এবং তোমরা তাঁর ইবাদতকারী নও, যাঁর ইবাদত আমি করি। 

৬। 
لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ
‘লাকুম দ্বীনুকুম ওয়া লিয়া দ্বীন।’
তোমাদের দ্বীন (শিরক) তোমাদের জন্য এবং আমার দ্বীন (ইসলাম) আমার জন্য।

এ সূরায় শিক্ষনীয়:-
১) এককভাবে একমাত্র আল্লাহর জন্য সমস্ত ইবাদতকে খালেছ বা একনিষ্ঠ করাকে বাধ্যতামূলক বলা হয়েছে। 
২) সব ধরনের শির্ক এবং শির্কের অনুসারীদের থেকে সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ করাকে অতি অত্যাবশ্যক বলা হয়েছে। 
৩) যারা বিভিন্ন ধর্মের মাঝে দূরুত্ব কমিয়ে, পরষ্পরের ধর্মীয় উৎসব ও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানকে সার্বজনীন দাবী করে। একে অন্যের ধর্মের নিকটবর্তী হওয়ার দাওয়াত দেয় তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কেননা আল্লাহ্ তা’আলা হক ও বাতিলের মাঝে সুষ্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং ইসলামই একমাত্র হক ধর্ম। তা ছাড়া অন্যান্য সকল ধর্ম বাতিল। হকের সাথে বাতিলের সামান্য মিশ্রণও যদি হয়, সেটা শির্ক। আর আল্লাহ সকল গুনাহ মাফ করে দিবেন, শির্কের গুনাহ ছাড়া।

Sunday, April 10, 2022

আমাদের অনুকরন এমনই হওয়া উচিৎ


মুসলিম জাহানের খলিফা হযরত উমর (রাঃ) এর ঈদ শপিং!
ঈদের আগের দিন খলিফা উমরের (রা) স্ত্রী নিজ স্বামীকে বললেন, ‘আমাদের জন্য ঈদের নতুন কাপড় না হলেও চলবে, কিন্তু ছোট বাচ্চাটি ঈদের নতুন কাপড়ের জন্য কাঁদছে’।
আরব জাহানের শাসক খলিফা উমর (রা) বললেন, ‘আমার তো নতুন কাপড় কেনার সামর্থ্য নেই’।
পরে খলিফা উমর (রা) তার অর্থমন্ত্রী আবু উবাইদা (রা) কে এক মাসের অগ্রিম বেতন দেয়ার জন্য চিঠি পাঠালেন।
সমগ্র মুসলিম জাহানের খলিফা যিনি, যিনি সেই সময় প্রায় অর্ধেক পৃথিবী শাসন করছেন, তাঁর এ ধরণের চিঠি পেয়ে আবু উবাইদার (রা) চোখে পানি এসে গেল। উম্মতে আমীন আবু উবাইদা (রা) বাহককে টাকা না দিয়ে চিঠির উত্তরে লিখলেন, ‘আমীরুল মুমিনীন! অগ্রিম বেতন বরাদ্দের জন্য দুটি বিষয়ে আপনাকে ফয়সালা দিতে হবে।
প্রথমত, আগামী মাস পর্যন্ত আপনি বেঁচে থাকবেন কি না?
দ্বিতীয়ত, বেঁচে থাকলেও দেশের জনসাধারণ আপনাকে সেই মেয়াদ পর্যন্ত খিলাফতের দায়িত্বে বহাল রাখবে কিনা?’
চিঠি পাঠ করে খলিফা উমর (রা) কোন প্রতি উত্তর তো করলেনই না, বরং এত কেঁদেছেন যে তাঁর চোখের পানিতে দাঁড়ি ভিজে গেলো। আর হাত তুলে আবু উবাইদার (রা) জন্য দোয়া করলেন- একজন যোগ্য অর্থমন্ত্রী নির্বাচিত করতে পেরেছেন ভেবে।

Friday, February 25, 2022

কিছুটা শিক্ষা কি আমরা নিতে পারিনা!!!!!

#খলিফা ওমর ইবনে খাত্তাব রাঃ যখন অর্ধ পৃথিবীর বাদশাহ্ তখন একদিন মাথায় করে মাটির পাত্রে পানি নিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ পথের মধ্যে একজন ওনাকে ডাক দেয়। ওমর তখন দাড়িয়ে ওনার সাথে কথা বলতে লাগে ঐ সময় লোকটি বলে ওমর তোমার সাথে কথা আছে তুমি মাথার পাত্র টি মাটিতে রেখে কথা বলো...
উমর (রাঃ) পাত্র টি মাথা থেকে উরুতে রেখে কথা বলতে শুরু করলেন ঐ সময় লোকটি বললেন ওমর তোমার কষ্ট হচ্ছে তুমি পাত্র টি মাটিতে রাখো উত্তরে ওমর বললেন আমার মাটি পাত্র টি ভেজা, ওটা মাটিতে রাখলে ঐ পাত্রের গায়ে অনেক মাটি লেগে যাবে এবং আমার পাত্রের সাথে চলে যাবে কিন্তু এই জমিনের মাটির মালিক তো আমি না!!

আর আমাদের যারা ক্ষমতাতে ওঠেন তারা কি আদোও মুসলিম??
আদোও কি তাদের কোনো ঈমান আছে?

Wednesday, November 17, 2021

মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী.....


মজলুম জননেতা মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৪৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ...

আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ৪৫ তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৭৬ সালের এই দিনে ঢাকার পিজি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে মওলানা ভাসানীর জন্ম। সিরাজগঞ্জে জন্ম হলেও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তার জীবনের সিংহভাগই কাটিয়েছেন টাঙ্গাইলের সন্তোষে। সন্তোষের মাটিতেই তিনি চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন।

মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী তার কৈশোর-যৌবন থেকেই রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। দীর্ঘদিন তিনি তৎকালীন বাংলা-আসাম প্রদেশ মুসলিম লীগের সভাপতি ছিলেন। লাইন-প্রথা উচ্ছেদ, জমিদারদের নির্যাতন বিরোধী আন্দোলন সারাজীবনই তিনি সাধারণ মানুষের কল্যাণে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। তার উদ্যোগে ১৯৫৭ সালে কাগমারীতে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলন বাংলাদেশের রাজনীতিতে মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তিনি সর্বদলীয় ওয়ার কাউন্সিলের উপদেষ্টা ছিলেন। স্বাধীনতার পর তার সর্বশেষ কীর্তি ছিল ফারাক্কা লং মার্চ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯১১ সালে মওলানা মোহাম্মদ আলীর সান্নিধ্যে এসে রাজনীতিতে নামেন। ১৯১৭-১৮ সালে তিনি প্রবাসী সরকারের নেতৃত্বে তুরস্কের সাহায্যে ভারতবর্ষ স্বাধীন করার পরিকল্পনা রেশমী রুমাল আন্দোলন করেন এবং ’১৯ সালে কারাবরণ করেন। দেশবন্দু চিত্তরঞ্জন দাসের সাহচর্য লাভ করেন, দেশবন্ধুর স্বরাজ আন্দেলনে অংশ নেন। খিলাফত আন্দোলন ও অসহযোগ আন্দোলনে যোগদান করেন। তিনি ১৯২৫ হতে ১৯২৭ আসামে ও পূর্ব বাংলায় কৃষক-মজুরদের স্বার্থে সংগঠন গড়ে জমিদার ও সুদখোর মহাজনবিরোধী আন্দোলন করেন। ১৯২৮ সালে কলকাতায় খিলাফত সম্মেলন ও ১৯২৯ সালে আসামের ভাসান চরে দ্বিতীয় বারের কৃষক- প্রজা সম্মেলনে যোগদেন।

বনাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের অধিকারী ভাসানী ১৯৩৬ সালে কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লীগে যোগ দেন। আসামের প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি হন। ১৯৩৭ সালে আসামে কুখ্যাত লাইন প্রথাবিরোধী আন্দোলন করেন এবং আসাম প্রাদেশিক পরিষদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আন্দোলন করেন। ১৯৪৭ সালের ৫ মার্চ আসামে আন্দোলনের ডাক দেন অতপর বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ১৯৪৮ সালের ১৭ মার্চ পূর্ব বাংলার ব্যবস্থাপক সভায় বাংলা ভাষার পক্ষ সমর্থনে পাকিস্তানে সাপ্তাহিক ইত্তেফাক প্রকাশ করেন।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠা করে সভাপতি হন। ১৯৫৫ সালের ১৫ জুন পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসনের দাবিতে ঐতিহাসিক পল্টন ময়দানে জনসভা করেন। ১৯৫৭ সালের ৬ থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক কাগমারী সম্মেলনে পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্দেশে বিখ্যাত “আসসালামু আলাইকুম” ঘোষণা করেন। ওই বছরের মার্চ মাসে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধে আওয়ামী লীগ ত্যাগ এবং ২৬ জুলাই ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৬৫ সালে আইয়ুববিরোধী নির্বাচনে মিস ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে অংশগ্রহণ করেন। পাক-ভারত যুদ্ধে দেশপ্রেমিকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ১৯৬৬ সালে ন্যাপের পক্ষ থেকে ১৪ দফা দাবি উত্থাপন করেন, ১৯৬৮ সালে আইয়ূবের পতনের লক্ষে ১০ দফা “দাবি সপ্তাহ” পালন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব আহূত গোলটেবিল বৈঠক বর্জন। ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে সন্তোষে ঐতিহাসিক কৃষক সম্মেলন, পাকিস্তানের টোবাটেক সিং-এ মার্চে কৃষক সম্মেলন, পাঁচবিবির মহিপুরে এপ্রিলে কৃষক সম্মেলন করেন। ৪ ডিসেম্বর পল্টনের জনসভায় স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান ঘোষণা দিয়ে বলেন, “লাকুম দ্বীনুকুম ওয়ালইয়া দ্বীন”।

স্বাধীনতার পর তিনি দীর্ঘদিন গৃহবন্দি ছিলেন। কিন্তু গণমানুষের বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করেছেন। ১৯৭২ সালে আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাপ্তাহিক হক- কথা প্রকাশ করেন। ৯ এপ্রিল ঢাকার পল্টন ময়দানে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জনসভায় ভারতীয় পণ্য বর্জনের ডাক দেন। তিনি আওয়ামী লীগের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দেন। দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে ১৯৭৪ ভাসানীর দেশব্যাপী ভুখা মিছিল আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নাড়া দেয়। ১৯৭৬ সালে ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ফারাক্কা মিছিলের ডাক। ১৬ ও ১৭ মে রাজশাহী হতে কানসাট পর্যন্ত ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চের নেতৃত্ব দেন। ১৭ নভেম্বর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যান।

(সংগৃহীত)

Saturday, November 13, 2021

তেলের দাম ও ভাড়া বৃদ্ধির অনুপাতের অঙ্ক কেউ করল না কেন?

তেলের দাম কেন বেড়েছে? আমার ফেসবুকের পোস্টের নিচে এই মন্তব্য থাকে যে আমরা সারাক্ষণ তেল দিই, তাই তেলের দাম বাড়ে! এ ব্যাপারে হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ‘তৈল’ লেখাটা ১৪ দিন আগের লেখায় খানিকটা উদ্ধৃত করেছিলাম।

এবার আমরা একটা সরল অঙ্ক কষব। ৬৫ টাকার ডিজেলের দাম হয়েছে ৮০ টাকা। ৬৫ টাকায় বেড়েছে ১৫ টাকা। শতকরা বাড়ল কত? (১৫/৬৫) x ১০০ = ২৩.০৭। অর্থাৎ দেশে ডিজেলের দাম বেড়েছে ২৩ ভাগ। কিন্তু এর ফলে একটা বাসের টিকিটের দাম কী করে ২৭ ভাগ কিংবা ৩০ ভাগ বাড়বে!

ধরা যাক, একটা বাসের ক্রয়মূল্য ৬০ লাখ টাকা। পাঁচ বছর এই বাসটা চলবে। তাহলে প্রতি মাসে বাসের ক্রয়মূল্য এক লাখ টাকা। ধরা যাক, বাসটায় কর্মচারী আছেন পাঁচজন। তাঁদের মাসিক বেতন এক লাখ টাকা। রুট পারমিট, মেরামতি খরচ, গ্যারেজ খরচ, সার্ভিস চার্জ, লাইসেন্স নবায়ন খরচ মাসে আরও ২০ হাজার টাকা। এর রোজ তেল লাগে তিন হাজার টাকা। তাহলে মাসে তেলের খরচ ৯০ হাজার টাকা। মাসে মোট খরচ আগে ছিল ৩ লাখ ১০ হাজার টাকা। তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় মাসে এখন তেলের খরচ বেশি লাগে ৯০ x .২৩ = ২০.৭ হাজার টাকা। তাহলে এখন মাসিক খরচ দাঁড়াচ্ছে ৩ লাখ ৩১ হাজার টাকা। মাসিক খরচ ৩ লাখ ১০ হাজার টাকার চেয়ে এখন ২১ হাজার টাকা বেড়ে গেছে। শতকরা হারে বেড়েছে (২১/৩১০) x ১০০ = ৬.৭৭। অর্থাৎ বাসভাড়া বাড়তে পারে ৬.৭৭ ভাগ।

অনেকগুলো উপাদানের মধ্যে মাত্র একটি উপাদানের খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেটির শতকরা বৃদ্ধির সমান খরচ বা তারও বেশি খরচ পুরো জিনিসটার বাড়ে না। একটা উদাহরণ দিই। ধরুন, একজন একটা ডিম ভাজা বিক্রি করেন ২০ টাকায়। ডিমের দাম ১০ টাকা। পেঁয়াজ, মরিচ, নুনের দাম দুই টাকা। তেলের দাম এক টাকা। এখন এই তেলের দাম হয়েছে ১ টাকা ২৩ পয়সা। তাতে তিনি ডিম ভাজার দাম ২০ টাকা ২৩ পয়সা রাখতে পারেন। কিন্তু পুরো ডিম ভাজার দাম ২০ x .২৩ = ৪.৬০ টাকা বাড়াতে পারেন না। এখন তিনি ডিম ভাজার দাম ২৪ টাকা ৬০ পয়সা রাখতে পারেন না। কারণ, তাঁর খরচ আসলে বেড়েছে শুধু ২৩ পয়সা। তঁাকে ডিমের দাম রাখতে হবে ২০ টাকা ২৩ পয়সা।

এখন আসছে দ্বিতীয় প্রশ্ন। যাঁরা তেলের দাম বাড়ান, তাঁদের একটা অকাট্য যুক্তি আছে। আর তা হলো, যদি বাংলাদেশে তেলের দাম প্রতিবেশী দেশের তুলনায় বেশি হয়, তাহলে আমাদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায় কেনা তেল প্রতিবেশী দেশে পাচার হয়ে যায়, যা আমাদের জন্য সমূহ ক্ষতি আর বেদনার কারণ। আমরা এই বেদনা বুঝি। আমরা ফরেন কারেন্সি দিয়ে বিদেশ থেকে তেল এনে ভর্তুকি দিয়ে কৃষককে কিংবা পরিবহন খাতকে দেব বলে দাম কমিয়ে রাখছি, সেই কষ্টার্জিত তেল চলে যাবে প্রতিবেশী দেশে, ভর্তুকির গুড় পিঁপড়ায় খাবে, তা হতে দেওয়া যায় না। সে ক্ষেত্রে কি আমরা একটা কথা বলতে পারি! আমাদের সীমান্তগুলোকে নিশ্ছিদ্র করুন। আমরা তেলের বদলে গরু চাই না। আমাদের চাষিরা এরই মধ্যে দেশেই গরু-ছাগল উৎপাদন করে দেশকে লাইভস্টকের ক্ষেত্রে স্বয়ংসম্পূর্ণ করে ফেলেছেন। আর যা যা আমাদের প্রতিবেশী দেশ থেকে বা দূরদেশ থেকে আমদানি করতে হবে, তা আমরা নিয়মকানুন মেনে কর-শুল্ক দিয়ে আনব। তাতে আমাদের অর্থনীতি পুষ্ট হবে।

By using this site, you agree to our Privacy Policy.