ব্রিটিশ শাসিত ভারত। সিরাজগঞ্জ শহরের উপকন্ঠে ইছামতি নদীর তীর ঘেষে প্রায় সব ধরণের গাছগাছালি, ঘন বনজঙ্গল ঘেরা এক অপূর্ব সুন্দর বিরাট সবুজ গ্রাম ছিল দিয়াড় পাঁচিল। দইভাঙা খাল হয়ে স্রোতস্বিনী যমুনার একটি উপশাখা ব'য়ে গেছে গ্রামটির সামনে দিয়ে। যমুনার এ শাখাকে গ্রামের লোকজন খাল বলেই ডাকে। খালের পাড়েই গ্রামের মসজিদ আর মসজিদের পাশেই নৌকা বাঁধার ঘাট। সেখানে বাঁধা আছে জমিদারের কাচারির বিরাট ছইওয়ালা নৌকা। জমিদারের নায়েব পাইক পেয়াদা নিয়ে খাজনা আদায়ে এসেছে। অনাদায়ী খাজনা না দিতে পারায় গ্রামের রইসউদ্দিনকে বেঁধে নৌকায় তোলা হয়েছে। গ্রামের বহু মানুষ জড়ো হয়ে করজোড়ে নায়েব সাহেবকে কাকুতি মিনতি করছে রইস উদ্দিনকে না নিয়ে যেতে কিন্তু পাথরের মূর্তির মতন অনড় নায়েব সাহেব রইসউদ্দিনকে ছাড়বেন না। আরও কয়েকবার তাকে সময় দেয়া হয়েছে কিন্তু সে খাজনা পরিশোধ করেনি। তার আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে গেল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না।
নৌকার পাশেই কয়েকটি নয় দশ বছরের বালক পানিতে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে গোসল করছিল। ওই কান্নার রোল শুনে তাদের ভেতর থেকে একটি স্বাস্থ্যবান বালক হঠাৎ ভেঁজা শরীরে নৌকায় ওঠে এসে বলল, না, কিছুতেই ওনারে নিয়া যাইবার দিমু না। ওনারে ছাইড়া দ্যান।" গর্জে উঠল নায়েব, ধর্ হারামজাদারে।' তেড়ে এলো এক পেয়াদা। সঙ্গে সঙ্গে বালক ছুটে গিয়ে নায়েবকে এক ধাক্কায় পানিতে ফেলে দিল আর নৌকার বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে পেয়াদাকেও নৌকা থেকে পানিতে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করল। মুক্ত করে নিয়ে এলো রইসউদ্দিনকে। সারা এলাকায় বিদ্যুৎতের মতন ছড়িয়ে গেল এই খবর। ধন্যধন্য পড়ে গেল রফাত সরকারের নাতির সাহসের। কিন্তু প্রমাদ গুণল পরিবারের লোকেরা, না জানি কী ফরমান জারি হয় জমিদার বাহাদুরের। সরকার কতৃক 'সরকার' উপাধি পাওয়া রফাত সরকারের ঠিকই ডাক পড়ল পরদিন জমিদারের কাচারিতে। সারা গ্রামের মানুষের চোখে মুখে আতংকের কালো ছায়া নেমে এলো। দুরন্ত নাতির জন্য কী বেইজ্জতি যে হন, দশ গ্রামের মানি লোকটা! কিন্তু না, হাসি মুখে ফিরে এলেন তিনি। শাস্তি বা জরিমানা দূরে থাক উল্টো এমন দুর্দান্ত সাহসী নাতির প্রশংসায় পঞ্চমুখ জমিদার বাহাদুর। আর খাজনা মওকুফ করে দিলেন রইসউদ্দিনের। রাতরাতি যেন হিরো হয়ে গেল রফাত সরকারের ডানপিটে নাতি!
সেই বালক একটু বড় হয়ে বাড়ি পালিয়ে যোগ দিলেন দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে। সেখান থেকে যোগ দিলেন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে। নাম লেখালেন নেতাজী সুবাস বোসের 'আজাদ হিন্দ ফৌজে'। নেতাজীর সাক্ষাৎ শিষ্য হয়ে রুখে দাঁড়ালেন কোলকাতার হিন্দু মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে। শিয়ালদহ 'সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধ কমিটি'র সাধারণ সম্পাদক হিসেবে 'যুব বিগ্রেড' গড়ে তুলে দাঙ্গা প্রতিরোধে রাতদিন নিরলস পরিশ্রম করেন। প্রতিষ্ঠা করেন 'শিয়ালদহ বাস্তহারা সমিতি মার্কেট'। '৪৭-এর দেশ বিভাগের পর তৎকালিন পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এসে নানা সমাজকল্যাণমূলক কাজে এলাকার যুব সমাজকে উদ্বুদ্ধ করে তোলেন। তাঁর কর্মমুগ্ধ জনগণ নিজেদের অর্থায়নে তাঁকে দাঁড় করিয়ে দেন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে। প্রথমে সদস্য পরে সদস্যদের ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান ১৯৬২-তে ইশ্বরদিতে উত্তরবঙ্গের জনপ্রতিনিধিদের সম্মেলন আহব্বান করলে তিনি সিরাজগঞ্জে একটি হাসপাতাল এবং জুট মিলস্ স্থাপনের দাবি তোলেন। আইয়ুব খান সে দাবি মেনে নেন। প্রতিষ্ঠিত হয় সিরাজগঞ্জ কওমী জুট মিলস্ এবং খোকশাবাড়ি হাসপাতাল। পরবর্তিতে দীর্ঘকাল চেয়ারম্যান থাকাকালে এলাকার রাস্তাঘাট, বাজার-হাট, স্কুল, মক্তব, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির, খেলার মাঠ, ফুটবল টিম প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন উন্নয়ন ও সমাজসেবা কাজে আজীবন সম্পৃক্ত রাখেন নিজেকে। খরস্রোতা যমুনার সর্বনাশা ভাঙন থেকে সিরাজগঞ্জকে রক্ষার জন্য তিনিই প্রথম শৈলাবাড়ি গ্রোইন বাঁধ নির্মাণ করেন। তাঁরই ব্রেইন চাইল্ড এই বাঁধের অনুসরণেই পরবর্তীকালে সিরাজগঞ্জ শহর প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মিত হয়।
বালক বয়সে জমিদারের খাজনা আদায়ের অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সিরাজগঞ্জের একটি গ্রাম থেকে উঠে আসা সাধারণ মানুষের অসাধারণ এই নেতা আর কেউ নন সিরাজগন্জ খোকশাবাড়ি ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মানব দরদী মরহুম ফরহাদ হোসেন। তাঁর জীবনেে নানা ঘটনা, গণমানুষের জন্য নিবেদিত কর্মকাণ্ডের অসংখ্য কাহিনী আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে। উদ্বেলিত করে নতুন প্রজন্মকে।
আজ তার ৩১তম মৃত্যু বার্ষিকী। সকাল ৮টায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত খোকশাবাড়ি হাসপাতালের সবুজ আঙিনায় চির নিদ্রায় শায়িত তাঁর কবর জিয়ারতের মাধ্যমে শুরু হয় দিনটির কর্মসূচি। করোনার কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিতাকারে বিকাল ৫টায় খলিসাকুড়াতে আলোচনা ও দোয়ার অনুষ্ঠান।
১০.০৯.২০২১

No comments:
Post a Comment