কিছুই নাই!
মজমপুর বাসস্টান্ড থেকে উঠবেন আটোতে, দশ মিনিট পড়ে ৫ টাকা দিয়ে বড়বাজার রেলগেটে নামবেন। কুষ্টিয়া শহর ঘুরে দেখা শেষ।
তারমাঝে রথখোলার মন্দির পাড় হওয়ার সাথে সাথে পুরাতন কলকাতার আবহাওয়া পাবেন হালকা। যারা পুরাতন কলকাতাতে ঘুরেছেনে তারা বুঝবেন। আশে পাশের বিল্ডিং গুলা, দোকানের প্যাটার্নের, রাস্তার পানিপুরি ফুচকার মাঝে এ আমেজটা আছে।
বড় বাজার রেলগেটে নেমেই দেখবেন হাতের ডানে গান্ধী হোটেল। হাতে অফুরন্ত সময় থাকলে ধাম করে ডাবল ডিমের একটা মোগলাই এখানে খাওয়া যেতেই পারে। গান্ধী হোটেলর অপরদিকে কচুরী পাবেন খেতে৷
বড় বাজার থেকে ইচ্ছা হলে দুই মিনিট হেটে গড়াই নদীর তীরে যেতে পারেন, আবার আরেকটা অটো নিয়ে লালন শাহ এর মাজার ঘুরে দেখতে পারেন। মাঝ রাস্তাতে পড়বে টেগর লজ! রবী ঠাকুরের বাড়িতে উকি দিতেই পারেন। আর পুরা এই এলাকার মাঝে আছে, এক সময়কার এশিয়ার সব থেকে বড় বস্ত্রকল 'মোহিনী মিল'।
মোহিনী মিলের গেটের পাশেই কিন্তু পাবেন বিখ্যাত তিলের খাজার কারখানা। সাহস নিয়ে ঢুকে পড়বেন। ধীম ধাম গরম তিলের খাজা চালান করবেন পেটে। কুমিল্লার রসমালাই অনেক বিখ্যাত! খুব টেস্ট, বিশ্বাস করেন কুষ্টিয়া রসমালাই বিশেষ করে অশোকের রসমালাই খাওয়ার পড়ে, আপনাকে দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে হবে৷ কুমারখালীর দই খাওয়ার পড়েও আপনাকে বগুড়ার দই-এর টেস্টের সাথে একটা পরীক্ষা করা লাগতেই পারে।
যেখানে শাহের বারাম খানা!! সেখানে গিয়ে গান শুনবেন। খানেক জিড়াবেন। একটা কুলফি খাবেন৷ অতঃপর রানীর ঘাটে বসে কালী নদীর শান্ত পানির দোলনের সাথে হাওয়া দেখবেন বাতাস খাবেন।
কুষ্টিয়াতে কিন্তু আবার গরুর দুধের চা বেশী চলে। আমরা মাঝে মাঝেই চা খেতে চলে যাই মোল্লা তেঘরিয়ার মোরে,কখনো রাহিনীতে আবার কখনো কাটাইখানা মোড়ে।ইচ্ছে হলে চা এর সাথে টা হিসেবে আপনি পোড়া রুটিও খেতে পারেন।আহা কি স্বাদ!অমৃতের মতো৷ গরম গরম পেটিস খেতে হলে হরিবাসোর মোরে মন্দিরের পাশে! বিকালে আড্ডাবাজির জন্য সরকারি কলেজের পুকুর হচ্ছে বেস্ট।সেখানকার ঝালমুড়ি খেয়ে দেখতে পারেন।মন্দ নয়!
বিকালে আগে ঘোরার জায়গা ছিলো রেইনউইক বাধ! এখন সেটা হরিপুর শেখ রাসেল ব্রীজ। ব্রীজে এপার ওপার দুইপারে জনসমুদ্র! এই জনসমুদ্র ভালো না লাগলে হুট করে চলে যাবেন মোহনায়! পদ্মার পেট ফুড়ে গড়াই এখানেই জন্মেছে! আহা কি তার রুপ! মনে হয় সাগর। শহরের দিকে গড়াই শুকনা।এটা কিন্ত কুষ্টিয়ার মিনি কক্সবাজার।
কুষ্টিয়া গিয়ে খুব টাইম ট্রাভেল এ ভ্রমণ করতে মন চাইলে হুট করে চলে যাবেন কুমারখালী!! এই শহরের আনাচে কানাচে এমন ভাবে অতীতকে আকড়ে ধরে আছে, আপনি না চাইলেও চলে যাবেন ব্রিটিশ আমলে। কুমারখালী গেলে রমেশের সন্দেশ কিন্তু মাস্ট। আর হ্যা, কুমারখালীর মটকা সাথে মটকা চা। এইটা কিন্তু এন্ডেমিক জিনিস ভাইয়া। লুংগি গামছা আর বেডশীট নিতে ভুলেন না কুমারখালী আসলে।একটু মশল্লা গুড় চেখে দেইখেন এখানকার।
হুম, জগতি! জগতিতেও যাবেন কিন্তু! দেশের সব থেকে প্রাচীন দুইটা রেল স্টেশনের একটা সে৷ আর দেখবেন চিনিকল। শহরের মাঝে দাঁড়িয়ে গ্রামে দেখার সৌভাগ্য জগতিতে গেলেই হবে। আর গড়াই রেলব্রীজ? বাংলাদেশের সব থেকে পুরাতন!! ১২০ হবে তার বয়স জলদিই।
দেশের অন্যতম বৃহত্তর চালের আরত খাজা নগর, আর অন্যতম প্রাচীন পোড়াদহ জংশন দেখতে যাওয়ার পথে চোখে পড়বে, বাংলাদেশের জায়েন্ট বিআরবি কেবলস এর সবগুলা ইন্ড্রাস্ট্রিই। পোড়াদহের রসগোল্লাটাও একটু খেয়ে নিয়েন বিরতিতে।
কুষ্টিয়া মানুষগুলা খুব রাফ! তবে এদের স্বভাব মুখে মধু অন্তরে বিষ টাইপের না। আমাদের কাছে মধু মানে মধুই, আর বিষ মানে বিষই। মাঝামাঝি পন্থা কুষ্টিয়ানদের মাঝে নেই। যেটা পিছে বলি সেটা সামনে বলতেও দ্বীধা নেই আমাদের।
কুষ্টিয়ার আসল মজা কিন্তু গড়াইয়ের তীরে না, রেনউইক বাধেও না। কুমারখালিতেও না। সেই মজা নেই সাইজির আখড়া বাড়িতেও। সেই মজা পাবেন না কুঠি বাড়ি, টেগর লজ কিংবা মীর মশাররফ হোসেন কাঙাল হরিনাথের বাড়িতেও।
কুষ্টিয়ার আসল মজা হচ্ছে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সড়ক। আমি না চোখ বুঝে, একটা জীবন এই তিন কিলো মিটার দীর্ঘ সড়কে কাটিয়ে দিতে পারি। কুষ্টিয়ার যে কাউকে জিজ্ঞাসা করেন। সবার আগে এন এস রোডের কথাই বলবে। একরাস্তার উপরের একটা শহর।
কুলফি হাতে এনএস রোডে ঘুরাঘুরি, রথখোলার পানিপুরি, এখন আবার মোটামুটিভাবে সব হোটেলেই পাবেন লুচি সবজি।আধুনিক ছোয়া লাগলেও কুষ্টিয়া আজো বড্ড পুরাতন!! তাই মায়া কুষ্টিয়াতে ঢুকলে লাগবেই। একটা জেলা শহর, একটা প্রাচীন শহর! এত নিস্তব্ধ! অথচ চারিদিকে কত প্রাণ!! এইটাই বুঝি এই শহরের সব থেকে বড় বৈশিষ্ট!!
এন এস রোডের সূচনা হচ্ছে পৌরসভার গেট থেকে!! প্রায় দেড়শ বছরের পুরাতন এই ভবনকে দেখে রাজপ্রাসাদ বলে ভ্রম হতেই পারে। শহরের প্রায় অর্ধেক থেকে এই ভবন আর এই গেট দেখা যায়। এক অনিন্দ্য মনরম এই ভবন। আহা!! অতীত আর বর্তমানের মেল বন্ধন।ভালো কথা,কুষ্টিয়ার বিখ্যাত লাল রঙা দেওয়াল কিন্ত পৌরসভাতেই বেশী পাবেন।
সাথে শাহী মসজিদ,মডেল মসজিদ,ছোট খাটো ইকো-শিশুপার্কগুলিও ঘুরে এসেন।ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় আর ইসলামিয়া কলেজ সাথে সরকারি কলেজে একটু পদাপর্ণ কইরেন।কিছু তো ফিল হবেইইই।
অনেক কিছুই বললাম। বাদ গেলো অনেক কিছুই।কুষ্টিয়া আসলেই একটা মায়ার শহর! যারা কুষ্টিয়ার লোক না, কিন্তু কুষ্টিয়া একবার হলেও বেড়াতে গেছে, তারাও এই মায়াটা অনুভব করে। আহা! কুষ্টিয়া!
কুষ্টিয়ার তুলনা কুষ্টিয়া নিজেই!!
তারপরেও কুষ্টিয়া শহরে কি আছে?
কিছুই নেই!
না ভুল, কুষ্টিয়া শহরে মায়া আছে! কুষ্টিয়া মায়া নগর। কুষ্টিয়া আরশীনগর।"
ভালোলাগা আর ভালোবাসা নিয়ে ফিরবেন। দাওয়াত রইল আমার শহরে..


No comments:
Post a Comment