Search This Blog

Tuesday, October 5, 2021

না-বলা কথা ও তাজউদ্দীন সাহেব


তাজউদ্দীন কি ভারতের দালাল?
.
কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতা তাঁর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ক্রমাগত গােপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন এবং বিদেশী শক্তির সঙ্গে সহযােগিতা করতে থাকেন। তাজউদ্দীন সাহেব তার সহজ ও সরল যুক্তির জোরে তাদের ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণে রাখেন। কয়েকজন যুবনেতা বিক্ষুব্ধ হয়ে মুক্তিবাহিনীর বিকল্প হিসেবে মুজিব বাহিনী গঠন করেন এবং কিছু দিশেহারা ভারতীয় আমলার সাহায্যে অধিকতর অর্থ ও অস্ত্রশস্ত্র তারা যােগাড়ে সমর্থ হন। তাদের একজন তাজউদ্দীন সাহেবের প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে পিস্তল হাতে অতর্কিতে তার ঘরে ঢােকেন, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়েন। তাজউদ্দীন সাহেব তাকে ক্ষমা করে নিজের বিশ্বস্ত অনুগামী করে তুলতে সমর্থ হন। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে তাজউদ্দীন সাহেব ছিলেন নিঃসঙ্গ সেনানায়ক। সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং কর্নেল ওসমানী সাধারণত তাঁকে সমর্থন করেছেন, তবে কেউই তাঁর মত নিবেদিতপ্রাণ ছিলেন বলে মনে হয়নি। ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতি সকলেরই প্রখর দৃষ্টি ছিল, শুধুমাত্র তাজউদ্দীনআহমদ ছিলেন এর ব্যতিক্রম। স্বাতন্ত্র এবং নীতিবােধ তাঁকে অনন্য মহিমায় প্রতিষ্ঠিত করেছিল। এমনকি মওলানা ভাসানী পর্যন্ত একদিন বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগের মধ্যে মানুষের মত মানুষ ওই তাজউদ্দীন।' এদিকে আওয়ামী লীগের ভেতরের এক অংশ এবং বাইরের শক্তির সহযােগিতায় প্রবল চেষ্টা চলছিল আওয়ামী লীগের প্রতিপত্তি খর্ব করে সর্বদলীয় মন্ত্রিসভা গঠনের। তাজউদ্দীন সাহেব এই অপচেষ্টার তীব্র বিরােধিতা করেন। ভাসানী সাহেব তাঁকে সমর্থন জানান এই বলে যে, বাংলাদেশের জনগণ যাদের একজনকেও নির্বাচিত করেনি, তারা কোন্ দাবিতে মন্ত্রীর পদ অধিকার করবে ? শেষ পর্যন্ত ইন্দিরা গান্ধীর ইঙ্গিতে এই অভিসন্ধির শেষ হয়, তিনি তাজউদ্দীন সাহেবের যুক্তিতে সায় দেন। শুভ বুদ্ধির জয় হয়। বাংলাদেশে পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর যে দিন মন্ত্রীরা ঢাকায় ফিরে যান সে দিন রুস্তামজী সাহেবের সঙ্গে দমদম বিমানবন্দরে আমিও যাই তাঁদের বিদায় জানাতে। নানা কথার পর রুস্তামজী সাহেব বলেন, “আমরা আশা করব ভারত-বাংলাদেশের মৈত্রীর বন্ধন চিরদিন অটুট থাকবে।' সঙ্গে সঙ্গে তাজউদ্দিন সাহেব জবাব দেন, হঁা, স্বাধীন বাংলাদেশের উপর যদি চাপ সৃষ্টি না করা হয়, বাংলাদেশের কাজকর্মে যদি কোনও প্রভাব বিস্তার না করা হয় তাহলে স্বাধীন বাংলাদেশ ও স্বাধীন ভারতের মৈত্রী চিরকাল অক্ষুন্ন থাকবে।' যে রুস্তামজীর চেষ্টায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ এবং যার সঙ্গে তাঁর এত মধুর সম্পর্ক, স্বদেশের স্বার্থে তাকেও স্পষ্ট ভাষায় ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা সম্পর্কে দৃঢ় মনােভাব জানাতে তাজউদ্দীন সাহেব মুহূর্তমাত্র দ্বিধা করলেন না। অথচ বাংলাদেশে প্রচার করা হল তিনি ভারতের দালাল। মিথ্যা কি চিরদিন সত্যের কণ্ঠরােধ করে রাখবে ? যখন স্বাধীনতা সংগ্রামের শেষ কোথায় অনুমান করা যাচ্ছে না সেই সময় একদিন কথাপ্রসঙ্গে তাকে বলেছিলাম, নববর্ষ ঢাকাতে উদযাপন করব। স্বাধীনতার পর নববর্ষের দিন ঢাকা সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর ঘরে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি কেক, মিষ্টি, চা প্রভৃতি খাইয়ে আমাকে এবং আমার কন্যা জয়ন্তীকে আপ্যায়ন করেন। আমাকে আমার সেই আগের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। তাঁর কোমল স্নেহার্দ্র ব্যবহার আমাকে মুগ্ধ করে। আমার দুই কন্যার বিবাহে তাঁর পরিবারের সাহচর্য লাভ করি। জীবনে যখন চরম আঘাত আসে, ঈশ্বর আমার পত্নীকে তাঁর চরণে স্থান দেন, তখনও তাজউদ্দীন সাহেব ছুটে এসে সমবেদনা জানিয়ে যান। এ তাঁর মহত্ত্বেরই পরিচয়।তাজউদ্দীন সাহেব মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় নিয়েছেন। প্রধান প্রধান শক্তিদ্বয় তাঁকে নানা প্রলােভন দেখিয়েছে। সামরিক বাহিনীও তাঁর ইঙ্গিতের প্রতীক্ষা করতে থাকে। কিন্তু তার সুস্পষ্ট উত্তর ছিল, শেখ সাহেবের নেতৃত্বে যে কোন পরিবর্তনের প্রয়াসে তিনি যুক্ত হতে প্রস্তুত, তাঁকে বাদ দিয়ে কোন পরিবর্তনের কথা তিনি চিন্তাও করতে পারেন না। সমস্ত প্রলােভন তিনি হেলায় প্রত্যাখান করেন। এর জন্য চরম মূল্য দিতেও তাঁর দ্বিধা ছিল না। মনে হয় তার নীতিবােধ ও নেতৃত্বকে মর্যাদা দেবার ক্ষমতা তখন বাংলাদেশের ছিল না। গভীর মানবিকতা, উজ্জ্বল আদর্শবাদ, নিপুণ কর্মপ্রণালী, মূল্যবােধের মাহাত্ম্য, অকপট আচরণ, সারল্য ও সহনশীলতা তাঁর নির্লোভ নিরাসক্ত হৃদয়কে এক অপূর্ব মহিমায় ভাস্বর করে তুলেছিল। তাঁর প্রতিভার ও চরিত্রগরিমার দীপ্তিতে যারা ম্লান হয়ে পড়েছেন তারাই ঈর্ষা ও মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে তাঁর চরিত্রহননের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রভাতসূর্যের আলাের মতই সত্য দিকদিগন্তে ছড়িয়ে সমস্ত কুয়াশা, সকল অন্ধকার দূর করে দেবে। দেশবাসীও এই দেশভক্ত সন্তানকে যােগ্য আসনে প্রতিষ্ঠিত করবে স্মরণের অমরতায়।
.
(২.৭.১৯৯৫)

গােলােক মজুমদার : ১৯৭১ সালে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের আইজি।
বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত।

Source: তাজউদ্দীন আহমদ - আলোকের অনন্তধারা

No comments:

Post a Comment