Search This Blog

Sunday, January 25, 2026

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী — মেজর এম এ জলিল


স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী — মেজর এম এ জলিল

মেজর এম এ জলিল—একটি নাম, যা স্বাধীনতার পরেও বন্দিত্বের প্রতীক। একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি বিজয়ের পতাকা দেখেছেন, কিন্তু স্বাধীনতার স্বাদ পাননি।

🇧🇩 স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী

১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১—বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। কিন্তু সেই স্বাধীনতার আলো মেজর এম এ জলিলের জীবনে পৌঁছাতে পারেনি। কারণ, তিনি অপরাধ করেছিলেন একটিই— জাতির সম্পদ রক্ষার অপরাধ।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণের সময় রেখে যাওয়া অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সামরিক সরঞ্জাম ভারতীয় সেনাবাহিনী ভারতে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বাধা দিয়েছিলেন। খুলনা সীমান্ত দিয়ে দেশের সম্পদ পাচারের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ করেছিলেন।

এই “অপরাধের” জন্যই ৩১ ডিসেম্বর ১৯৭১— মেজর এম এ জলিলকে গ্রেফতার করা হয়।

তাঁকে প্রথমে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে অবস্থিত সেনা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে কার্যত তাঁকে নজরবন্দী করে রাখা হয়।

একজন মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার— স্বাধীন দেশে পরিণত হলেন প্রথম রাজবন্দীতে।

🔥 যে প্রতিবাদ তাঁকে ইতিহাসে অমর করেছে

ভারতীয় সেনাবাহিনীর দ্বারা অস্ত্র, গোলাবারুদ লুটপাট ও সীমান্ত দিয়ে দেশের সম্পদ পাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানই তাঁকে করে তুলেছিল অনন্য।

মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন ৯ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার। সাহস, দৃঢ়তা আর নৈতিকতার কারণে তিনি শুধু একজন সামরিক কর্মকর্তা নন—তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রতিরোধের প্রতীক।

🌱 জন্ম ও শৈশব

১৯৪২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি—বরিশাল জেলার উজিরপুরে, নানার বাড়িতে জন্ম নেন মেজর এম এ জলিল।

পিতা: জোনাব আলী চৌধুরী মাতা: রাবেয়া খাতুন

তাঁর জন্মের মাত্র তিন মাস আগেই পিতৃহারা হন তিনি। উজিরপুরেই কেটেছে তাঁর শৈশব ও কৈশোর।

১৯৫৯ সালে উজিরপুর ডব্লিউ বি ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশন থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক পাশ করেন।

🐟 চাকরি থেকে সামরিক জীবনের পথে

শুরুতে ফিশারিজ ডিপার্টমেন্টে চাকরি করলেও পড়াশোনার টানে চাকরি ছেড়ে পশ্চিম পাকিস্তানে যান।

১৯৬১ সালে মারি ইয়ং ক্যাডেট ইনস্টিটিউশন থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন এবং একই সঙ্গে গ্রহণ করেন সামরিক শিক্ষা।

১৯৬২ সালে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে ট্রেনিং অফিসার হিসেবে যোগদান করেন। চাকুরিরত অবস্থায় বি.এ পাস করেন।

⚔️ একজন দক্ষ সেনা কর্মকর্তা

১৯৬৫ সালে কমিশনপ্রাপ্ত হয়ে ১২ নম্বর ট্যাঙ্ক ক্যাভালরি রেজিমেন্টের অফিসার হিসেবে পাক-ভারত যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

১৯৬৬ সালে যুদ্ধবিরতির পর পাকিস্তান একাডেমি থেকে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। পরে মুলতানে কর্মরত অবস্থায় ইতিহাসে এম.এ পাশ করেন।

১৯৭০ সালে তিনি মেজর পদে উন্নীত হন।

🔥 মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যাবর্তন

১৯৭১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি মায়ের অসুস্থতার কারণে এক মাসের ছুটি নিয়ে বরিশালে আসেন। মার্চেই যোগ দেন মহান মুক্তিযুদ্ধে।

তিনি নিযুক্ত হন ৯ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে। তাঁর নেতৃত্ব, কৌশল ও দেশপ্রেম মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।

🏅 অবহেলিত বীর

অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য—মেজর এম এ জলিলসহ কয়েকজন সেক্টর কমান্ডারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের কোনো খেতাব দেওয়া হয়নি।

কিন্তু ইতিহাস জানে— খেতাব না পেলেও তাঁর অবদান মুছে যায় না।

🕊️ ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এক বীর

মেজর এম এ জলিল প্রমাণ করেছিলেন— স্বাধীনতা শুধু শত্রু পরাজিত করার নাম নয়, স্বাধীনতা মানে নিজের দেশের সম্পদ, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদা রক্ষা করা।

তিনি ছিলেন সেই বিরল মুক্তিযোদ্ধা, যিনি বিজয়ের পরও মাথা নত করেননি।

📌 মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে তাঁর অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।

🇧🇩 শ্রদ্ধা ও সালাম—স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাজবন্দী মেজর এম এ জলিলকে।

এই লেখা যদি আপনাকে ভাবায়, স্পর্শ করে—শেয়ার করুন। নতুন প্রজন্ম জানুক, ইতিহাসের আড়ালে থাকা এই সাহসী অধ্যায়ের কথা।

✍️ Shariful Islam Razu

Thursday, January 15, 2026

হাবিলদার রজব আলী খাঁ।


১৮৫৭ সালের সিপাহি বিপ্লব উপমহাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই বিদ্রোহ ও বিপ্লব কেবল উত্তর বা মধ্য ভারতের দিল্লি, মিরাঠ কিংবা কানপুরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এর অত্যন্ত শক্তিশালী ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচিত হয়েছিল দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। এই অঞ্চলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের মধ্যমণি ছিলেন ৩৪ নম্বর ‘নেটিভ বেঙ্গল পদাতিক বাহিনী’র হাবিলদার রজব আলী খাঁ। আজ ৯ জানুয়ারি হাবিলদার রজব আলীর অন্তর্ধান দিবস।

• বিদ্রোহের লাভা : ৩৪নং রেজিমেন্ট
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অসন্তোষ থেকে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু ছিল ‘৩৪নং নেটিভ বেঙ্গল পদাতিক বাহিনী’। এই বাহিনীর সৈনিক মঙ্গল পাণ্ডে ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ ব্যারাকপুরে বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন।

মঙ্গল পাণ্ডের ঘটনার পর ৩৪ নম্বর রেজিমেন্টকে আংশিকভাবে ভেঙে দেওয়া হলে সিপাহিদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও সাম্রাজ্যবিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে পড়ে। চট্টগ্রামের সেনানিবাসে এই রেজিমেন্টের উল্লেখযোগ্য অংশ মোতায়েন ছিল। ব্যারাকপুরের বিদ্রোহের আগুণ চট্টগ্রামের সিপাহিদের মাধ্যমেই দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় পৌঁছেছিল।

• হাবিলদার রজব আলী : একজন বিদ্রোহী বীর
হাবিলদার রজব আলী খাঁর পরিচয় নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ আছে। অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, তিনি চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বাসিন্দা ছিলেন। তবে লোককাহিনি ও স্থানীয় গবেষণায় তার জন্মস্থান হিসেবে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া, লোহাগাড়া বা দোহাজারীর নামও উঠে আসে। রজব আলী ছিলেন ব্রিটিশ ভারতের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সৈনিক। যোগ্যতা, দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণের কারণে দ্রুত পদোন্নতি পেয়ে তিনি ৪ নম্বর কোম্পানির হাবিলদার হন।

রজব আলীর নেতৃত্ব ছিল মূলত প্রান্তিক পর্যায় থেকে উঠে আসা সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। বাহিনীর মধ্যে তিনি সামরিক শৃঙ্খলার পাশাপাশি স্বজাতির প্রতি ভালোবাসা এবং ধর্মীয় চেতনা জাগিয়ে তুলেছিলেন।

• চট্টগ্রাম বিদ্রোহ:
১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর। হাবিলদার রজব আলীর নেতৃত্বে ৩৪ নম্বর নেটিভ বেঙ্গল পদাতিক বাহিনীর প্রায় ৪০০ সিপাহি সশস্ত্র বিদ্রোহ করে। সিপাহিরা রাতের বেলা রাইফেলের ফাঁকা গুলি ছুড়ে বিদ্রোহের জানান দেয়। রজব আলীর নির্দেশে তারা প্রথমেই চট্টগ্রামের কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামী সব বন্দিকে মুক্ত করে। এরপর সরকারি কোষাগার এবং অস্ত্রাগারের দখল নেয়। ব্রিটিশ অফিসার ও সৈন্যরা শহর ছেড়ে বঙ্গোপসাগরে নোঙর করা জাহাজগুলোয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, এই অভিযানের ফলে চট্টগ্রাম প্রায় ৩০ ঘণ্টা ব্রিটিশ শাসন থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিল। এটি ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ শহরের জন্য বিরল এক বিজয়।

বিদ্রোহীরা কেবল বিদ্রোহ করেই ক্ষান্ত হয়নি, তারা দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে সেনানিবাস থেকে হাতি, গোলাবারুদ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় রসদ সংগ্রহ করে শহর ত্যাগ করে। তাদের পরিকল্পনা ছিল স্বাধীন ত্রিপুরা রাজ্যে আশ্রয় নেয়া ও আরো শক্তি সঞ্চয় করে ইংরেজদের ওপর আক্রমণ চালানো।

• চট্টগ্রাম পাহাড় থেকে সিলেটের অরণ্যে:
বিদ্রোহীরা চট্টগ্রাম থেকে অর্জিত গনিমত নিয়ে হাবিলদার রজব আলীর সুদক্ষ নেতৃত্বে ত্রিপুরার দিকে যাত্রা করে। এদিকে চট্টগ্রামের ব্রিটিশ কমিশনার ত্রিপুরার রাজা ঈশানচন্দ্র মাণিক্যকে বিদ্রোহীদের রুখে দেওয়ার নির্দেশ দেয়। ২ ডিসেম্বর তারা ত্রিপুরা সীমান্তে পৌঁছে দেখে—বহু সশস্ত্র সৈন্য তাদের প্রতিহত করার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।

এই পরিস্থিতিতে রজব আলী কৌশল পরিবর্তন করে দুর্গম পাহাড় এবং গহিন অরণ্যের মধ্য দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। প্রতিকূল পরিবেশ, খাবারের অভাব এবং ব্রিটিশ ও ত্রিপুরার বাহিনীর তাড়া খেয়েও অদম্য মনোবল তাদের এগিয়ে নিয়ে যায় সিলেটের দিকে। ডিসেম্বর মাসে সিপাহিরা সিলেটের মণিপুর সীমান্তে পৌঁছে।

১৮ ডিসেম্বর সিলেটের লাতু এলাকায় কমান্ডার মেজর বাইং তাদের ওপর আক্রমণ করেন। যুদ্ধের ময়দানে গোলার আঘাতে মেজর বাইং নিহত হন। কমান্ডারের মৃত্যুতে ব্রিটিশ বাহিনী সাময়িকভাবে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং বিদ্রোহীরা জয়লাভ করে।

করিমগঞ্জে হাবিলদার রজব আলী শেষবারের মতো যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। ১৮৫৮ সালের ৯ জানুয়ারি করিমগঞ্জের মালেগড় টিলায় ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহীদের চূড়ান্ত সংঘর্ষ হয়। স্থানীয় জমিদারদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে ব্রিটিশরা বিদ্রোহীদের অবস্থান জেনে ফেলে এবং লেফটেন্যান্ট রসের নেতৃত্বে অতর্কিত আক্রমণ চালায়। অবশিষ্ট সৈন্য নিয়ে রজব আলী বীরবিক্রমে লড়াই করেন। এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে প্রায় ৭০ জন বিদ্রোহী সিপাহি শহীদ হন। মালেগড় টিলার এই পরাজয় কার্যত চট্টগ্রামের সিপাহি বিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটায়। মালেগড়ের যুদ্ধে পরাজয়ের পর হাবিলদার রজব আলীর পরিণতি নিয়ে নির্দিষ্ট কিছু জানা যায় না। তার শেষ জীবন সম্পর্কে মূলত ভিন্ন দুটি বয়ান পাওয়া যায়। অধিকাংশ ঐতিহাসিক নথিপত্র এবং ব্রিটিশ সামরিক রিপোর্ট অনুযায়ী, মালেগড়ের যুদ্ধের পর হাবিলদার রজব আলী খাঁ এবং তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন সিপাহিকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। তারা মণিপুরের গহিন ও দুর্গম অরণ্যে হারিয়ে যায়। বহু চেষ্টার পরও তাদের কোনো সন্ধান মেলেনি।

অন্যদিকে একেএম মহিউদ্দিনের মতো কিছু জীবনীকার দাবি করেন, হাবিলদার রজব আলীকে শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশরা গ্রেপ্তার করে চট্টগ্রামে নিয়ে আসে এবং তড়িঘড়ি করে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে তাকে চট্টগ্রামের প্যারেড গ্রাউন্ডে ফাঁসি দেওয়া হয়। তবে সমসাময়িক ব্রিটিশ দালিল ও নথিতে তার ফাঁসির কোনো তথ্য নেই। তাই হাবিলদার রজব আলীর শেষ কিংবদন্তি এখনো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।

• মঙ্গল পাণ্ডে ও হাবিলদার রজব আলী:
১৮৫৭ সালের বিপ্লবের আলোচনায় মঙ্গল পাণ্ডেকে মহিমান্বিত করা হয়, কিন্তু হাবিলদার রজব আলী অনালোচিতই থেকে যান। অথচ বিদ্রোহ এবং তার ফলাফলের গভীরতা বিশ্লেষণে দেখা যায়, রজব আলীর ভূমিকা কোনো অংশে মঙ্গল পাণ্ডের চেয়ে কম ছিল না।

আমরা যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব, মঙ্গল পাণ্ডে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে একাই আক্রমণ করেছিলেন। অন্যদিকে হাবিলদার সুশৃঙ্খল ও সুসংগঠিত ৪০০ সিপাহি নিয়ে সামরিক বিদ্রোহ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন। পাণ্ডে টিকেছিলেন মাত্র কয়েক ঘণ্টা, অন্যদিকে হাবিলদার প্রায় দুই মাস নিজেদের অবস্থান ধরে রেখে ব্রিটিশদের মোকাবেলা করেছিলেন।

• হাবিলদার কেন অবহেলিত;
হাবিলদার রজব আলী বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে এক উপেক্ষিত বীর। কিন্তু তার প্রতি এত অবিচার কেন? উল্লেখযোগ্য কয়েকটা কারণ হলো—১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের আখ্যান মূলত দিল্লির সিংহাসন পুনরুদ্ধারের গল্পেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে, ফলত চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনপদে জ্বলে ওঠা এ বিদ্রোহের দাস্তান পাদটীকাতেই রয়ে গেছে। মূল রাজনৈতিক কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং ব্রিটিশদের নির্মম আক্রোশে নথিপত্র নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াও তার বিস্মৃত হওয়ার পেছনে দায়ী। তবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা সম্ভবত আমাদেরই। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাকে নিয়ে বড় কোনো একাডেমিক গবেষণা বা চর্চা আমরা করতে পারিনি। ফলত এই বীর সেনানি ও তার অসামান্য লড়াইয়ের ইতিহাস আজও নতুন প্রজন্মের কাছে প্রায় অজানাই রয়ে গেল।

• হাবিলদার রজব আলীর উত্তরাধিকার:
বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেলেও হাবিলদার রজব আলীর স্মৃতি আজও আসামের করিমগঞ্জ এবং চট্টগ্রামের মানুষের হৃদয়ে অম্লান। মালেগড় টিলার সেই শহীদদের স্মরণে আসাম সরকার একটি ‘ওয়ার মেমোরিয়াল’ নির্মাণ করেছে, যেখানে প্রতি বছর ১৮ ডিসেম্বর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

চট্টগ্রামের ‘জেল রোড’ একসময় রজব আলীর নামে থাকলেও এখন তা শুধু জেল রোড হিসেবেই পরিচিত। স্থানীয় ইতিহাস-সচেতন মানুষেরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছেন, যেন চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্যারেড গ্রাউন্ডের নাম ‘হাবিলদার রজব আলী স্কয়ার’ রাখা হয় এবং পাঠপুস্তকে তার জীবনী অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ইতিহাসের ধুলোকালি ঝেড়ে হাবিলদার রজব আলীকে প্রাপ্য মর্যাদা দেওয়া সময়ের দাবি। তার সেই দীর্ঘ পাহাড়ি যাত্রা, মেজর বাইংয়ের পরাজয় এবং মালেগড়ের আত্মত্যাগ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি কেবল চট্টগ্রামের নন, তিনি সমগ্র ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামের অনন্য মহানায়ক, যার আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তীকালে বাংলার অসংখ্য বিপ্লবী হয়েছিলেন উজ্জীবিত, কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন ব্রিটিশদের ভিত। হাবিলদার রজব আলীর লড়াই আমাদের আজও অনুপ্রাণিত করে। স্বাধীনতার জন্য আদর্শিক দৃঢ়তা এবং সাহসিকতা থাকলে অতি সামান্য শক্তি নিয়েও বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়।

লেখক: নাসরুল্লাহ ইবনে ইলিয়াস

#searchinghistory
#BengalMuslims 
#muslimhistory

Friday, December 5, 2025

ঈসা খাঁ


মসনদে তখন ‘মহামতি’ আকবর। যার হুংকারে কাবুল থেকে কান্দাহার, কাশ্মীর থেকে দাক্ষিণাত্য। পুরো হিন্দুস্তান তটস্থ। রাজপুতরা পর্যন্ত মাথা নত করে আত্মীয়তা পাতিয়েছে। কিন্তু বাদশাহর ঘুমে শান্তি নেই। মানচিত্রের পূর্ব কোণের একটি নদীমাতৃক জনপদ তাঁর গলার কাঁটা হয়ে বিঁধে আছে। নাম তার বাংলা। বলা ভালো ‘ভাটি বাংলা’। 

সেখানে মোগলদের বিশ্বজয়ী অশ্বারোহী বাহিনী অচল, বারুদভর্তি কামান অকেজো। মোগল সেনাপতিরা সেখানে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেন। কারণ তাঁরা জানতেন না, এই মাটির বীরদের ধমনীতে রক্তের সাথে স্রোতও বয়। ইতিহাসের পাতায় এই অধ্যায় কেবল সাহসের নয়, বরং এক বিস্ময়কর সামরিক প্রকৌশল ও রণকৌশলের বিজয়গাঁথা। তথাকথিত ‘বিশাল মোগল বাহিনী’র বিরুদ্ধে ঈসা খাঁ ও বারো ভুঁইয়াদের সেই লড়াইয়ের গভীরে যাওয়া যাক। 

সম্রাট আকবর বুঝতে পারেননি, বাংলা কোনো পাঞ্জাব বা হরিয়ানার সমতল ভূমি নয়। ঈসা খাঁ, কেদার রায়, চাঁদ রায়রা জানতেন, মোগলদের প্রধান শক্তি তাদের ভারী অশ্বারোহী বাহিনী (Cavalry) এবং বিশাল সব হাতি। তাই তাঁরা যুদ্ধের জন্য বেছে নিলেন বর্ষাকাল এবং ‘ভাটি’ অঞ্চল (বর্তমান কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ঢাকা ও কুমিল্লা)। বর্ষায় যখন পথঘাট ডুবে যেত, তখন মোগলদের আরবি ঘোড়া আর ভারী কামানের চাকা কাদায় দেবে যেত। মোগলদের শক্তিই হয়ে দাঁড়াত তাদের বোঝা। একে বলা হতো ‘মাটির ফাঁদ’। এ ছিল প্রযুক্তির এক অসম লড়াই, যেখানে বুদ্ধির জোরে জিতেছিল বাংলা। 

মোগল নৌবহর বা ‘নওয়ারা’ সাজানো ছিল বিশাল আকৃতির ভারী যুদ্ধজাহাজ দিয়ে, যার নাম ছিল ‘গুরব’ বা ‘বজরা’। এগুলো গভীর পানি ছাড়া চলতে পারত না, ঘোরাতে সময় লাগত প্রচুর। এদিকে বারো ভুঁইয়ারা তৈরি করলেন এক বিশেষ ধরণের রণতরী ‘কোষা’। শাল ও সেগুন কাঠে তৈরি এই নৌকাগুলো ছিল দীর্ঘ, সরু এবং অত্যন্ত দ্রুতগামী। যা অগভীর জলেও তীরের বেগে ছুটত।

মোগলদের ভারী জাহাজগুলো যখন চরায় আটকে যেত, চারপাশ থেকে ঝপ করে ঘিরে ফেলত বাংলার ছোট ছোট ‘ঝালুয়া’ আর ‘কোষা’ নৌকা। শ্রীপুরের জমিদার কেদার রায় ছিলেন নৌযুদ্ধের জাদুকর। তিনি বুঝেছিলেন, শুধু সাহস দিয়ে হবে না, দরকার উন্নত আগ্নেয়াস্ত্র। তিনি তাঁর বাহিনীতে যুক্ত করলেন পর্তুগিজ নৌ-সেনাপতি ডমিনিক ডি কার্ভালোকে। 

কার্ভালোর কাছে ছিল ইউরোপীয় উন্নত কামানের প্রযুক্তি। ১৫৮৮ থেকে ১৬০৩ সময়টায় মেঘনা আর পদ্মায় কেদার রায় মোগলদের রক্তে জল লাল করে দিয়েছিলেন। মানসিংহের মতো সেনাপতিও কেদার রায়ের নৌশক্তির কাছে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন। 

সাল ১৫৯৭। বিক্রমপুর থেকে ১২ মাইল দূরে, বর্তমান কাঠরাবো এলাকা। মোগল সেনাপতি মানসিংহ তাঁর ছেলে দুর্জন সিংহকে পাঠালেন ঈসা খাঁকে চূড়ান্তভাবে দমন করতে। মোগলদের সাথে ছিল ভারী কামান। কিন্তু ঈসা খাঁ সম্মুখযুদ্ধে না গিয়ে ‘গেরিলা’ কায়দায় মোগল বাহিনীকে ঘিরে ফেললেন। মোগলদের কামানের পাল্লা যেখানে শেষ, ঠিক সেখান থেকে বারো ভুঁইয়ারা আক্রমণ শুরু করলেন। 

ফলাফল? মোগল নৌবহর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেল। মানসিংহের নিজের ছেলে দুর্জন সিংহ এই যুদ্ধে নিহত হলেন। ছেলের মৃত্যু সংবাদ আর পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে মানসিংহকে শূন্য হাতে আগ্রায় ফিরতে হয়েছিল। ইতিহাসবিদ আবুল ফজল ‘আকবরনামা’য় এই পরাজয়ের কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। মোগলরা হাতির পিঠে বড় কামান (গজনাল) বহন করত যা লক্ষ্যভেদে ছিল ধীর। বিপরীতে বারো ভুঁইয়ারা নৌকায় ব্যবহার করতেন ছোট ও হালকা কামান (হাতনাল) এবং তোপ। যা দ্রুত লোড করা যেত এবং নিমিষেই দিক পরিবর্তন করে শত্রুকে ঘায়েল করা যেত। ঈসা খাঁ কেবল যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন তুখোড় রাজনীতিবিদ।

তিনি জানতেন মোগল সাম্রাজ্যের বিশাল সম্পদের সাথে অনন্তকাল যুদ্ধ চালানো কঠিন। তাই তিনি যুদ্ধজয়ের পর অনেক সময় মৌখিক বশ্যতা স্বীকার করতেন বা উপহার পাঠাতেন, কিন্তু কখনোই নিজের ভূখণ্ডের খাজনা বা প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ দিল্লির হাতে তুলে দেননি। একেই বলে ‘কৌশলগত বিজয়’। 

সারকথা, আকবর তাঁর জীবদ্দশায় কখনোই ভাটি বাংলাকে পুরোপুরি বশ করতে পারেননি। জাহাঙ্গীরের আমল (১৬১০) পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল এই জনপদকে পদানত করতে, এবং সেটাও হয়েছিল নিজেদের মধ্যে বিভেদ তৈরির মাধ্যমে। বারো ভুঁইয়ারা প্রমাণ করেছিলেন, কেবল সৈন্যসংখ্যা দিয়ে যুদ্ধ জয় করা যায় না। মাটির বৈশিষ্ট্য চেনা, আবহাওয়াকে কাজে লাগানো এবং সঠিক রণকৌশলই পারে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্যকেও হাঁটু গেড়ে বসাতে। 

তাঁরা আমাদের শিখিয়ে গেছেন, অস্ত্রের চেয়ে মেরুদণ্ড অনেক বেশি শক্তিশালী।

#Clarifying_Light_বাংলা_fc

"মগের মুল্লুক"


মেঘনার মোহনা, ভুলুয়া (বর্তমান নোয়াখালী)।

​পুরো গ্রাম নিস্তব্ধ।

অমাবস্যার রাত, কিন্তু কোনো ঘরে প্রদীপ জ্বলছে না। মায়েরা শিশুদের মুখে কাপড় গুঁজে ধরে আছে, যেন কান্নার আওয়াজ বের না হয়।

বাতাসের শব্দেও গ্রামের পুরুষেরা আঁতকে উঠছে। তাদের হাতে লাঠিসোঁটা, কিন্তু চোখেমুখে মৃত্যুর ভয়।

​কারণ তারা আসছে।

নদীর বুকে দ্রুতগামী ‘জেলবা’ নৌকাগুলোর ছপ ছপ শব্দ শোনা যাচ্ছে।

ওরা মগ। আরাকানের জলদস্যু। সাথে আছে তাদের দোসর, পর্তুগিজ হার্মাদরা।

​এরা লুঠ করতে আসে না। এরা আসে ‘শিকার’ করতে।

মানুষ শিকার।

​যাকে পাবে, তাকেই ধরে নিয়ে যাবে।

তারপর হাতের তালু ফুঁড়ে সরু বেতের রশি দিয়ে বেঁধে ফেলবে। জাহাজের অন্ধকার খোলে গাদাগাদি করে ফেলে রাখবে দিনের পর দিন। খাবার হিসেবে ছুড়ে দেবে মুঠোভরা কাঁচা চাল।

গন্তব্য, আরাকানের দাস বাজার। অথবা ওলন্দাজ বনিকদের জাহাজ, যারা এই বাঙালিদের পাঠিয়ে দেবে সুদূর ইন্দোনেশিয়ায়।

​বাংলার দক্ষিণ উপকূল তখন এক মৃত্যুপুরী।

যেখানে আইন নেই, বিচার নেই, শুধু আছে বাঁচার আর্তনাদ।

লোকেরা এই অরাজকতার নাম দিয়েছিল, "মগের মুল্লুক"।

​দিল্লির মসনদ তখন অনেক দূরে।

মোগল সুবাদাররা আসেন আর যান। ডাঙায় তাদের দাপট থাকলেও, জলের ওপর তারা অসহায়।

মোগলদের ভারী জাহাজগুলো মগদের ক্ষিপ্রগতির নৌকার সাথে পেরে ওঠে না।

​ঠিক এই চরম মুহূর্তে, ১৬৬৩ সালে বাংলার সুবাদার হয়ে এলেন এক বৃদ্ধ।

শায়েস্তা খান।

বয়স তেষট্টি। জীবনের শেষ সায়াহ্নে।

​সবাই ভেবেছিল, এই বয়োবৃদ্ধ শাসক আর কী করবেন? হয়তো কদিন পর তিনিও হাল ছেড়ে দেবেন।

কিন্তু শায়েস্তা খান জানতেন, শুধু তলোয়ার দিয়ে এই দস্যুদের দমানো যাবে না। এদের দমাতে হবে বুদ্ধি দিয়ে।

​তিনি এক অদ্ভুত ফরমান জারি করলেন।

"নৌকা বানাও।"

পুরো ঢাকা শহর এক বিশাল কারখানায় পরিণত হলো। কাঠমিস্ত্রি, কামার, কারিগর, দিনরাত এক করে কাজ করতে লাগল।

এক বছরের মধ্যে শূন্য থেকে গড়ে উঠল ৩০০ জাহাজের এক বিশাল নৌবহর।

​কিন্তু শায়েস্তা খান জানতেন, মগদের আসল শক্তি তাদের সাহস নয়, তাদের শক্তি হলো তাদের সাথে থাকা পর্তুগিজ ফিরিঙ্গিরা। এদের কাছে আছে উন্নত মানের কামানের জ্ঞান।

​শায়েস্তা খান এবার চাললেন এক মোক্ষম চাল।

তিনি সন্দ্বীপে থাকা পর্তুগিজ দলনেতাকে গোপনে প্রস্তাব পাঠালেন,

"আরাকানের রাজার গোলামি করে কী পাবে? আমার সাথে এসো। নিরাপত্তা, সম্পদ আর সম্মান, সব দেব।"

​লোভ আর ভয়, দুটোই কাজ করল। ফিরিঙ্গিরা মগদের পক্ষ ত্যাগ করে শায়েস্তা খানের দলে ভিড়ে গেল।

যুদ্ধের আগেই আরাকানের রাজার ডান হাত ভেঙে গেল।

​জানুয়ারি, ১৬৬৬ সাল।

কুয়াশাচ্ছন্ন কর্ণফুলী নদী।

​মগরা তাদের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি চট্টগ্রামে বসে আছে। তারা নিশ্চিন্ত। গত একশো বছরে কেউ তাদের এই জলসীমায় হারাতে পারেনি।

কিন্তু তারা জানত না, দিগন্তের ওপার থেকে ধেয়ে আসছে এক প্রলয়।

​সামনে ইবনে হোসেনের নেতৃত্বে মোগল নৌবহর ‘নওয়ারা’। আর জঙ্গল মাড়িয়ে ডাঙা পথে এগিয়ে আসছেন সুবাদারের পুত্র বুজুর্গ উমেদ খান।

​সাঙ্গু নদীর মোহনায় শুরু হলো সেই ঐতিহাসিক লড়াই।

মগরা তাদের ‘জেলবা’ আর ‘খালু’ নৌকা নিয়ে মরণকামড় দিতে চাইল।

কিন্তু এবার দৃশ্যপট ভিন্ন।

​মোগলদের নতুন নৌবহর আর ফিরিঙ্গিদের কামানের নিখুঁত নিশানায় মগদের জাহাজগুলো খড়কুটোর মতো উড়ে যেতে লাগল।

টানা ছত্রিশ ঘণ্টা চলল কামানের গর্জন। নদীর পানি রক্তে লাল হয়ে গেল।

​১৩৫টি মগ জাহাজ দখল করে নিল মোগলরা। বাকিগুলো আগুনে ভস্মীভূত হলো।

মগরা পালালো। তাদের অজেয় দুর্গ চুরমার হয়ে গেল।

​উদ্ধার হলো হাজার হাজার বাঙালি বন্দি। তাদের আনন্দাশ্রুতে ভিজে গেল চট্টগ্রামের মাটি।

দীর্ঘ দিন পর দক্ষিণ বাংলার মানুষ বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল।

​শায়েস্তা খান চট্টগ্রাম জয় করে নাম রাখলেন, ‘ইসলামাবাদ’।

​শায়েস্তা খান যখন ঢাকা ছেড়ে যান, তখন তিনি এক নতুন ইতিহাস রচনা করে গেছেন।

আমরা তাঁকে মনে রেখেছি টাকায় আট মণ চালের জন্য।

কিন্তু তাঁর আসল অবদান সস্তা চাল নয়।

​তিনি যদি সেদিন ওই বয়সে আরাম আয়েশ ছেড়ে এই অসম্ভব লড়াইয়ে না নামতেন, তবে আজকের সুন্দরবন আর দক্ষিণ বাংলা হয়তো জনমানবহীন জঙ্গল হয়েই থাকত।

তিনি মগদের বিতাড়িত করে বাংলাকে বাসযোগ্য করেছিলেন।

তিনি ‘মগের মুল্লুক’ শব্দটিকে চিরতরে একটি প্রবাদ বাক্যে পরিণত করে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করেছিলেন।

​আজ যখন আমরা নির্ভয়ে কুয়াকাটা বা পতেঙ্গার সৈকতে দাঁড়াই, তখন হয়তো আমরা ভুলেই যাই,

এই বাতাসের প্রতিটি ঝাপটায় মিশে আছে আমাদের পূর্বপুরুষদের ২০০ বছরের দীর্ঘশ্বাস,

আর একজন তেষট্টি বছরের বৃদ্ধের অদম্য জেদ।

#Clarifying_Light_বাংলা_fc

আওয়ামিলীগ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কে বিক্রি করে দিয়েছে ১৯৭১ এর বিজয় দিবসে........!!!!!!


আওয়ামিলীগ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কে বিক্রি করে দিয়েছে ১৯৭১ এর বিজয় দিবসে........!!!!!!
মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধীনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানী কে 🇧🇩, যদি সেদিন জেনারেল আরোরার জায়গায় জেনারেল ওসমানীকে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ পত্রে স্বাক্ষর করতে দিতো। কিন্তু তা কেড়ে নিয়ে তুলে দেওয়া হলো ভারতের কোলে। 

ভারত আমাদের বন্ধু না শত্রু❓
১৯৭১ সালে বাংলাদেশকে সাহায্য করতে এসে ভারতের প্রাপ্তি
লেখক: আরিফুল হক( সাবেক বিশিষ্ট নাট্যাভিনেতা)

ভারতের আর্থিক প্রাপ্তি (জাতিসংঘের মাধ্যমে):
১) যুক্তরাষ্ট্র থেকে: ৮,৯১৫,৭০০ ডলার
২) যুক্তরাজ্য থেকে: ৩,৮১১,২১৩ ডলার
৩) কানাডা থেকে: ২,৩২৬,৩৬০ ডলার
৪) সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে: ২০,০০০,০০০ ডলার
৫) মায়ামী থেকে: ১২৬ কোটি ডলার
৬) জাতিসংঘের ৬৮টি দেশ থেকে: ৫৭৪,১৬২ ডলার

এই অনুদানের মোট পরিমাণ ছিল তখনকার হিসেবে ১২,৩১২,৯৫২৯৪ টাকা।

পাকিস্তানের কাছ থেকে প্রাপ্তি:
যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ: ৫৯,৩৫১,৪২৯৪ রুপি।  এসব কিছুই পেত বাংলাদেশ 🇧🇩, যদি সেদিন জেনারেল আরোরার জায়গায় জেনারেল ওসমানীকে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ পত্রে স্বাক্ষর করতে দিতো।  কিন্তু তা কেড়ে নিয়ে তুলে দেওয়া হলো ভারতের কোলে। 

★ ২০২২-২৩ সালে আজারবাইজান ও আর্মেনিয়ার মধ্যে তুমুল যু"দ্ধ হলো।  ৩০ বছর পর আজারবাইজান যু"দ্ধে জয়লাভ করে।  তার হারানো ভূমিসমূহ উদ্ধার করে নেয়। এ যু"দ্ধে আজারবাইজান এর পক্ষে মূল কারিগর  ছিল"" তুরস্ক ""।  আর "" পাকিস্তান """।  পাকিস্তানি এসএসজি কমান্ডোরা আজারবাইজানের পক্ষে যু"দ্ধ করে।  তুরস্ক তার বাইরাখতার টিভি টু ড্রোনের কারিশমা দেখায় সারা বিশ্বকে।  

অপরদিকে,  আর্মেনিয়ার পক্ষে রাশিয়া,  ভারত,  ইরান সহায়তা করে।  

যাইহোক,  এ যু"দ্ধের পর তুর্কী ও আজারবাইজান তাদের বিভিন্ন মহরা, সামরিক চুক্তি করে,  তবে তারা কি তুর্কী ও পাকিস্তানকে ঘাটি বা অতিরঞ্জিত কিছু করেছে?????  না করেনি। 

আবার,  তালেবানরা ২০২১ সালে আফগান পুনরায় দখল করে। আমেরিকার সেনারা পালিয়ে বাঁচে।  আফগানদের এ সাফল্য কি একার???  তারা কি অন্যদেশকে আমাদের মতো স্বামী-স্ত্রী তকমা দিয়ে অতিরিক্ত কিছু করেছে????  না সেটাও হয় নি...। 

আমরা যু"দ্ধ করেছি।  সুতরাং আমাদের স্বাধীনতার সহায়ক ভারত।  তবে যু"দ্ধ আমাদের,  র"ক্ত আমাদের। তাই পাকিরা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কাছেই আত্মসমর্পণ করবে, যেমনটা "" বৃটিশরা ১৭৭৬ সালে জর্জ ওয়াশিংটন এর মার্কিনবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে, আমেরিকার স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়।  তখন আমেরিকা আজকের মতো বিশাল দেশ বা জাতি ছিল...????  না ছিল না।  

তাহলে,  ১৯৫ বছর পর "" বাংলাদেশের 🇧🇩 মহান মুক্তিযু"দ্ধ "" পাকিস্তানি মোট ১,০০,০০০ সেনারাও "" জেনারেল ওসমানীর নিকট আত্মসমর্পণ করতে পারতো।  কিন্তু কৌশলে তা হতে দিলো না,  মুক্তিযু"দ্ধে কোলকাতায় আরাম-আয়েশ করা  আমাদেরই নেতা নামক গাদ্দাররা। 

তাহলে আজ আমরা হতাম বীরের জাতি।  আমাদের হতো সম্মান।  আজ আমরা যতই বলি আমাদের মহান মুক্তিযু"দ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন হয়েছি, বিশ্ব জানে পাক- ভারতের যু"দ্ধে "" বাংলাদেশ 🇧🇩 "" স্বাধীন হয়েছে। 

যেমনটা ঃ ২য় বিশ্বযু"দ্ধে জার্মান-জাপান ও রাশিয়া- আমেরিকার  মধ্যে হলেও আরও বহুদেশের মধ্যে হয়েছে,  তা কি আমরা জানি??????  

যাইহোক..... 
পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া অ"স্ত্র ও সরঞ্জাম: কেবল ৮৭টি ট্যাঙ্কের মূল্যই ছিল প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন ডলার

শুধু খুলনা অঞ্চল থেকেই বিভিন্ন সামগ্রী (যেমন মেশিনারিজ, মালামাল) লুটে নেওয়া হয়েছিল প্রায় ২.২ মিলিয়ন ডলারের

এছাড়া, দোকানপাট থেকে সোনার গহনা, ইলেকট্রনিকস, শিল্প কারখানার যন্ত্রাংশ, দামি গাড়ি ইত্যাদি শত শত ওয়াগনে করে নিয়ে যাওয়া হয়—যার সুনির্দিষ্ট হিসাব আজও নেই।

এর পাশাপাশি নদী, বন্দর, সড়ক, ব্রিজ এবং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতেও ভারতের প্রভাব বিস্তার ঘটে। তবুও আজ শুনতে হয়, আমরা নাকি ভারতের কাছে কৃতজ্ঞ! আর তারপর, শেখ হাসিনা সরকার এত কিছু উজাড় করে দিয়েছে যে, ভারত হয়তো তা আজীবন মনে রাখবে!
>>>
মুক্তিযু"দ্ধের বিষয়টা বলতে গেলে এমন দাড়ায়,  যেমন ঃ আপনার বাসায় মেহমান দাওয়াত করলেন,  তাদের জন্য বাজার করলেন, রান্না করলেন, খাওয়ালেন,সবকিছু আপনার, খরচ আপনার, পেট ভরে খেয়েও গেল, আবার যাওয়ার সময় নিয়েও গেল, কিন্তু আপনারা রাতে ঝোল আর কোন রকমে ডিম ভাজি করে ভাত খেয়ে শুয়ে পড়লেন। 
বিষয়টি এমনই। 

আবার,  
আপনি বিয়ে করলেন।  বহু শখের বিয়ে। বহু খরচ করে জিনিষপত্র দিয়ে সাজিয়ে, লক্ষ টাকার কাবিন করে, ঘরে তুললেন।  কিন্তু বাসর করবেন।  ঘরে ঢুকে দেখলেন বউ পালিয়েছে।  সে রাতে তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে বাসর হলো। 
সবকিছু আপনিই করলেন, কিন্তু মজা মারলো ফজা ভাই। 

মুক্তিযু"দ্ধের বিষয়টা তেমনই।  
যু"দ্ধে ভারত ট্রেইনিং দিয়ে আতাউল গনি ওসমানীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করে তা ঠিক,  কিন্তু মুক্তিবাহিনীর তেমন কোন ভারী অ"স্ত্র ছিল না।  হালকা কামান, শর্ট রেঞ্জের মর্টার, আর গ্রে"নেড, আর কিছু রাই"ফেল,  হালকা এসএম"জি, এইতো।  

এ.জি. ওসমানী বহুবার ভারী অ"স্ত্র চেয়েছিলেন।  অস্হায়ী সরকারকে দিয়ে ভারত সরকারের কাছে অ"স্ত্র সরবরাহ  দাবী করে ছিলেন।  ফল শূন্য।

ভারত রিস্ক নিতে চায়নি। মিশন ব্যর্থ হলে সব যাবে জলে,  এই ভেবে।  তাদের চিন্তা ছিল, দীর্ঘ মেয়াদী গৃহযু"দ্ধ।  ফলে একদিকে পাকিস্তান দূর্বল হয়ে পড়বে এবং ভারত হবে এশিয়া কিং ও পাকিস্তান কাস্মীর বিষয়ে ভারতের সাথে সমঝোতা করতে বাধ্য হবে।  ভারত কখনো কল্পনাই করেনাই,  কালা, চিকনা- পাতলা, খাটা বাঙ্গালী.. ৫৬ ইঞ্চির চওড়া বুকের, লম্বা, ফর্সা, স্বাথ্যবান পাঠান পাকিস্তানিদের প্রায় খালি হাতেই হারিয়ে দিবে এক"" ওসমানীর """ সুদক্ষ নেতৃত্বে।  

৬৫ সালে শিয়ালকোটে এই কর্নেল ওসমানীর "" ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙ্গালী সেনাদের কাছে হারে, এই ওসমানীই ছিল ভারতের অসহ্যকর পাত্র।  নানাভাবে তাকে সরানোর চেষ্টা করে। একবার তো ওসমানী পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়ে সরে যেতে চেয়েছিলেন।  তবে অস্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ গ্রহণ না করে তাকে দায়িত্ব পালন করতে অনুরোধ করেন।  কেননা, ওসমানী ব্যাতীত এ যু"দ্ধ চালানো সম্ভব হবে না। 

অ"স্ত্রের তেমন যোগান নাই  তবুও হাল ছাড়েনি ওসমানী বাহিনী। বীর বাঙ্গালি সেই স্বল্প অ"স্ত্র নিয়েই পাকিস্তানের ঘাটি দখল করতে থাকে, তাদের হতে উদ্ধারকৃত অ"স্ত্র নিয়ে লড়তে থাকে। 

এরই মধ্যে মুক্তিবাহিনীকে কাউন্টার করতে মামা বাহিনী, মুজিব বাহিনী  সহ নানান গেরিলা বাহিনী তৈরী করে। 

উদ্দেশ্য ঃ ভারতের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা,  মুক্তিবাহিনীকে কাউন্টার করা, যাতে একেকভাবে সর্ব এলাকা কব্জা করতে না পারে, এবং পাক- সরকার ভারতের সাথে দরকষাকষিতে বাধ্য হয় ফলে একদিকে কাস্মীর নিরাপদ থাকবে অন্যদিকে পাক- সরকার বিছিন্নতাবাদীদের নিয়ে ব্যস্ত থাকে । 

★★★ হয়তো লেখা গুলো আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না,  তবে এটাই সত্যি। 

যাই হোক,  স্বাধীনতার থেকে ১৩ দিন যখন দূরে, ২রা ডিসেম্বর   পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে যু"দ্ধ ঘোষণা করে বসে। এমনিতেই পূর্ব পাকিস্তানে কোনঠাসা, ভারত স্হল, আকাশ, সমুদ্রসীমা বন্ধ করে দেয় ফলে পাকিস্তান হতে আর সেনা, রসদ আসছিলো না।  যা ছিল শেষের পথে।  শেষদিকে,  আমেরিকা তার সপ্তম নৌবহর পাঠালে,  ভারতের মিত্র সোভিয়েত রাশিয়া নবম নৌবহর পাঠায়।  ফলে,  এ যাত্রায় আর তৃতীয় বিশ্বযু"দ্ধ লাগেনি। 

শেষ ভরসা,  চীনা বিমান আসার কথা থাকলেও আন্তর্জাতিক চাপে চীন আসতে পারেনি। 

ফলাফল ঃ ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণ। 

যু"দ্ধ করলো বাংলার 🇧🇩 দামাল সন্তানরা।  আর গাদ্দারদের সহায়তার ভারত নিয়ে গেল স্বাধীনতার চুক্তিপত্রে স্বাক্ষরসহ সমস্ত ক্রেডিট ও লাভের অংশ। ও ২৫ বছর গোলামী চুক্তি  এবং সেনা রাখার নিশ্চয়তা, ভারত নির্দেশিতপররাষ্ট্র নীতি। 

এই হলোস্বাধীনতার নামে  পরাধীনতার লাল  স্বাধীনতা। 🤧🛩️🇧🇩 কপিরাইট। #বাংলাদেশের #ইতিহাস #স্বাধীনতা #ভারত #পাকিস্তান #যুদ্ধ #মুক্তিযোদ্ধা

Saturday, November 29, 2025

বাঙালি জাতির নেপাল বিজয়; সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের নেপাল বিজয়ের ৬৭৫তম বিজয়বার্ষিকী।


বাঙালি জাতির নেপাল বিজয়; সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহের নেপাল বিজয়ের ৬৭৫তম বিজয়বার্ষিকী।

১৩৫০ সালের ২৭ নভেম্বর,
বাংলার সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ নেপালের তরাই অঞ্চলে এক দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন। ইতঃপূর্বে কোনো মুসলিম বাহিনী, কোন বাংলার শাসক, বাংলার অধিবাসী এ অঞ্চলে প্রবেশ করতে পারে নি। তিনি রাজধানী কাঠমুন্ডু পর্যন্ত অগ্রসর হন এবং বিপুল ধনসম্পদ নিয়ে ফিরে আসেন।
নেপাল রাজ বংশাবলিতে পূর্ব দেশীয় সুলতান শামসুদ্দীনের নেপাল আক্রমণের উল্লেখ আছে ।
কাঠমণ্ডুর নিকটস্থ স্বয়ম্ভুনাথের মন্দিরে প্রাপ্ত শিলালিপিতে এই আক্রমণের প্রমান পাওয়া যায় এবং এই লিপিতে আক্রমণের তারিখ ৪৭০ নেওয়ারী সম্বৎ (১৩৫০খৃষ্টাব্দ) বলে উল্লিখিত আছে ।

মধ্যযুগের বাংলার সুলতানদের মধ্যে সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ এক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। তিনি শুধুমাত্র ইলিয়াস শাহী বংশেরই প্রতিষ্ঠাতা নন, তিনি বাঙালী জাতীয়তাবাদেরও জনক। তিনিই প্রথম বাঙ্গালি জাতিকে বাঙ্গালি হিসেবে পরিচিত করেন। তিনি উড়িষ্যা ও নেপাল এলাকার ত্রিহুত পর্যন্ত বাংলার সীমানায় অন্তর্ভুক্ত করেন। তাঁর প্রভাব কাশী-বেনারস পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তিনিই প্রথম ‘‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’’ উপাধি ধারন করেন। তিনিই প্রথম শাসক যিনি বাংলা নামক বর্তমান যে অঞ্চলগুলোকে বোঝানো হয় সেসব অঞ্চলকে সর্বপ্রথম ভৌগলিকভাবে একীভূত করার কৃতিত্বের দাবীদার। এর আগে বাংলার বিভিন্ন এলাকা বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিল, যেমন গৌড়, রাঢ়, পুন্ড্রবর্ধণ, সমতট ইত্যাদি। তাদের শাসন ব্যবস্থাও ছিল আলাদা আলাদা। তিনি ১৩৪২ সাল থেকে ১৩৫৮ সাল পর্যন্ত রাজত্বকালে উড়িষ্যা, নেপাল এবং কামরূপ বাংলার সাম্রাজ্যভুক্ত করে এতদাঞ্চলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি এ সম্মিলিত রাজ্যের নামকরণ করেন বাঙ্গালাহ এবং এর অধিবাসীদের বাঙালী নামে অভিহিত করেন।

ইলিয়াস শাহ পূর্ব পারস্যের সিজিস্তানের অধিবাসী ছিলেন। তার পিতার নাম ছিল সুলতান। প্রাথমিক জীবনে তিনি দিল্লীর মালিক ফিরোজের অধীনে চাকরী করতেন। কিন্তু সেখানে কোন এক অপরাধ করে তিনি বাংলায় পালিয়ে আসেন এবং সাতগাঁও এর শাসক ইজ্জুদ্দীন ইয়াহইয়ার অধীনে চাকরী নেন। নিজ যোগ্যতাবলে তিনি মালিক পদে উন্নীত হন। পরবর্তীতে ইজ্জুদ্দীনের মৃত্যুর পরে তিনি ১৩৩৮ সালে সাতগাঁওয়ের অধীশ্বর হন। নানা প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে ইলিয়াস শাহ ১৩৪২ সনে বাংলার ক্ষমতায় আরোহণ করেন। বাংলার রাজধানী তিনি লক্ষণাবতী (গৌড়) থেকে পান্ডুয়ায় সরিয়ে নেন। পান্ডুয়ার অবস্থান ছিল গৌড়ের ৩২ কিলোমিটার উত্তরে। তারপর থেকে পান্ডুয়া একটি গুরুত্বপূর্ন নগর হিসেবে গড়ে ওঠে। পান্ডুয়ার বর্তমান অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলায়।

তিনি যখন সিংহাসনে বসেন তখন দিল্লীতে তুঘলক বংশের ফিরোজ শাহ তুঘলকের শাসন চলতেছিল। গিয়াসউদ্দীন তুঘলক বাংলাকে তিন ভাগে ভাগ করেছিলেন যেমন– (ক) লক্ষ্মণাবতী; (খ) সাতগাঁও বা সপ্তগ্রাম; (গ) সোনারগাঁও। এই তিন প্রদেশের রাজধানীও ছিল আলাদা এবং শাসনকর্তা ছিলেন তিনজন। এরা ছিলেন দিল্লির অধিনস্ত এবং এই তিনজন শাসনকর্তার মধ্যে বিরোধ অব্যাহত ছিল। সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ এই সুযোগটি গ্রহন করলেন। তিনি ১৩৫২ সালে ইখতিয়ারউদ্দীন গাজী শাহকে পরাজিত করে সোনারগাও দখল করেন। এরূপে তিনি সমগ্র বাংলা অঞ্চলের অধিপতি হন। বাংলার তিনটি প্রদেশ জয় করে বাংলাকে একীভূত করে ‘শাহ–ই–বাঙ্গালিয়ান’ উপাধি গ্রহন করলেন। বাংলার ইতিহাসে বাংলা এই প্রথম ‘বাঙ্গলা’ নামে পরিচিত হল। এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা সন্দেহ নেই। কেননা, এর আগে বাংলা প্রাচীন কাল থেকে গৌড়, পুন্ড্র, বঙ্গ এসব জনপদে বিভক্ত ছিল।
এর পূর্বে ১৩৪৪ সালে ত্রিহুত ও ১৩৫০ সালে নেপাল অভিযান করেন। বাংলা অঞ্চলকে একীভূত করার সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে তিনি জাজনগর (উড়িষ্যা) আক্রমন করেন। অতঃপর ইলিয়াস শাহ ১৩৫৩ সালে বিহার আক্রমন করেন। বিহারের পরেও তিনি তাঁর কর্তৃত্ব চম্পারন, গোরখপূর, ও বেনারস পর্যন্ত বিস্তৃত করেন। রাজত্বের শেষদিকে ১৩৫৭ সালে তিনি কামরূপ দখল করেন।

ইলিয়াস শাহ তাঁর সাম্রাজ্য সম্প্রসারন করতে গিয়ে দিল্লীর শাসক ফিরোজ শাহ তুঘলকের বিরোধিতার মুখে পড়েছিলেন, ফিরোজ শাহ তাকে দমন করার জন্য বাংলা অভিযান করলে অভিজ্ঞ কূটনীতিকের মত সময় ও সুযোগের অপেক্ষা করে তাঁর দিল্লীর আক্রমন মোকাবিলা করেছেন। সাহসী যোদ্ধা ইলিয়াস শাহ সফল সামরিক গুনের অধিকারী ছিলেন। তিনি বাংলা ও বাংলার বাইরে তাঁর প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কৃতিত্বপূর্ন বিজয় অর্জন করেন।

সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ শুধুমাত্র বাংলা অঞ্চলকে একীভূত করেই ক্ষান্ত হননি, তিনি এতদাঞ্চলে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ব্রতী হন এবং বাংলার স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখতে জনসমর্থন লাভে প্রয়সী হন। স্থানীয় জনগনকে উদারভাবে সুযোগ সুবিধা দিয়ে শাসনব্যাবস্থাকে গনশাসনে রূপ দেন। তিনিই সর্বপ্রথম স্থানীয় জনগনকে অধিক সংখ্যায় সামরিক বাহিনীতে চাকরীর সুযোগ দেন।

বাঙালী জাতির প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তিনিই সর্বপ্রথম লক্ষ্মণাবতী, সাতগাঁও বা সপ্তগ্রাম এবং সোনারগাঁও এই তিন অঞ্চলে বিভক্ত বাংলাকে একত্রিত করে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষাভাষীদের মাঝে জাতীয়তাবাদের চেতনা জাগ্রত করেন।
জিয়াউদ্দীন বারানীই হলেন প্রথম মুসলিম ঐতিহাসিক যিনি ইকলিম-ই-বাঙ্গালাহ অথবা দিয়ার-ই-বাঙ্গালাহ (যার দ্বারা তিনি বাংলাকে বুঝিয়েছেন) শব্দগুলি ব্যবহার করেন। ইলিয়াস শাহ কর্তৃক লখনৌতি,সাতগাঁও এবং সোনারগাঁও একত্রিত হওয়ার পর শামস-ই-সিরাজ ইলিয়াস শাহকে ‘শাহ-ই-বাঙ্গালাহ’, ‘সুলতান-ই-বাঙ্গালাহ’ এবং ‘শাহ-ই-বাঙালিয়ান’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ইলিয়াস শাহ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন সালতানাত প্রায় দুশ বছর টিকে ছিল এবং এ সময় বাঙ্গালাহ নামের বহুল পরিচিতি ঘটে। এ অঞ্চলে মুগলদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মুগলগণ বাঙ্গালাহকে মুগল সাম্রাজ্যে একটি সুবাহ (প্রদেশ) হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন এবং এ প্রদেশ সুবাহ-ই-বাঙ্গালাহ নামে পরিচিতি লাভ করে। এ নামই পর্তুগিজ বিবরণে বেঙ্গালা রূপে দেখা যায়। ইংরেজরা বেঙ্গলাকে বেঙ্গল বলে অভিহিত করেন। এভাবে দেখা যায় যে, চৌদ্দ শতক থেকেই বাঙ্গালাহ নামের পরিচিতি ঘটে এবং এ অঞ্চল বলতে বর্তমানের বাংলাদেশ ও ভারতীয় পশ্চিম বাংলা প্রদেশের অন্তর্গত প্রায় সব ভূভাগকেই বোঝায়।

তথ্যসূত্র:
১। ভারতবর্ষের ইতিহাস-কোকো আন্তোনোভা,
২। শাসসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ ও বাঙালীজাতিয়তাবাদ-সানাউল্লাহ সামি,
৩। তারিখ-ই-ফিরোজশাহী-জিয়াউদ্দিন বারানী,
৪। বাংলার ইতিহাস-সুলতানি আমল-আবদুল করিম
৫। বাংলার ইতিহাসের দুশো বছর-শ্রীসুখময় মুখোপাধ্যায়

কলমেঃ শেখ নজরুল 

ইতিহাসের নানা জানা-অজানা তথ্যাবলি জানতে ও জানাতে যুক্ত হতে পারেন আমাদের পেজ ইতিহাস অন্বেষণ এ।

Friday, November 21, 2025

সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীর


আজ ১৯ নভেম্বর, সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীর এর ১৯৪ তম শা'হাদাত বার্ষিকী....

বি'প্লবী ও বি'দ্রোহী মীর নিসার আলী সর্বাধিক পরিচিত শ'হিদ তিতুমীর হিসাবে। তিনি শুধু ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই করেননি, বাংলার জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষকদের সংগঠিত করেছিলেন, প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন বাঁশের কেল্লা থেকে। তিনিই সর্বপ্রথম ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে লড়াই করে শা'হাদাত বরণ করেন। ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে মীর নিসার আলী তিতুমীরের নাম উজ্জল হয়ে আছে।

সমাজ সংস্কার ও বিপ্ল'বের চেতনায় আলোকোজ্জ্বল একটি নাম: তিতুমীর। যুগ যুগ ধরে অন্যায়, জুলুম ও পরাধীনতার বিরুদ্ধে এ নাম বিদ্রো'হের প্রেরণা হয়ে থাকবে। ❤️

Poster Design & Edit: Md Ashraf Ullah
#ঐতিহাসিক_উক্তি #Titumir #Freedom #Birturk