কতকাল আর মিথ্যে ইতিহাসের কবলে পড়ে মিথ্যেকে লালন করে আত্মহত্যার মত পাপ করবেন !! গৌরব না করে নিরক্ষর ব্যক্তির মত তেলবাজি বাদ দিয়ে সাদাকে সাদা,কালোকে কালো বলতে শিখুন ৷
—————————————————————————————শের আলী আফ্রিদি - যে নামটি ব্রিটিশরা মুছে ফেলতে চেয়েছিল
ব্রিটিশ ভারতের ২০০ বছরের ইতিহাসে ভাইসরয় ছিল সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তাকে বলা হতো ভারতের মুকুটহীন সম্রাট। তার নিরাপত্তা ছিল নিশ্ছিদ্র, তার আদেশে লাখো মানুষের ভাগ্য নির্ধারিত হতো। সেই ইতিহাসে মাত্র একবার, মাত্র একজন মানুষ সেই অজেয় ক্ষমতার বুকে ছুরি বসাতে পেরেছিলেন। তার নাম শের আলী আফ্রিদি।
অথচ আশ্চর্যের বিষয়, যে ইতিহাসে ব্যর্থ বিপ্লবীদের নিয়েও মহাকাব্য লেখা হয়, সেখানে সফল হওয়া এই একমাত্র বীরের নামটি আজ বিস্মৃত।
পেশোয়ারের পাহাড় থেকে ব্রিটিশ ঘোড়সওয়ার
শের আলী আফ্রিদির জন্ম ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের পেশোয়ার জেলার খাইবারের তিরাহ উপত্যকায়। তিনি ছিলেন আফ্রিদি গোত্রের একজন খাঁটি পাঠান। পাঠানদের রক্তে যে স্বাধীনচেতা জেদ আর তেজ থাকে, শের আলীর মধ্যেও তার কোনো কমতি ছিল না।
যৌবনে তিনি ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর পাঞ্জাবের একটি অশ্বারোহী বাহিনীতে যোগ দেন। নিজের যোগ্যতায় তিনি ঘোড়সওয়ার থেকে পদোন্নতি পেয়ে অফিসারও হয়েছিলেন। পরবর্তীতে তিনি পুলিশ বাহিনীতেও কাজ করেন। অর্থাৎ তিনি ব্রিটিশ সিস্টেমের ভেতর থেকেই ব্রিটিশদের চিনেছিলেন।
কিন্তু পাহাড়ি সমাজের চিরন্তন ব্যাধি - পারিবারিক শত্রুতা। ১৮৬৭ সালে নিজের বংশের শত্রু হায়াত নামে এক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগে ব্রিটিশ আদালত তাকে গ্রেফতার করে। বিচারে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। আর শাস্তি ভোগের জন্য বেছে নেওয়া হয় তখনকার সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা - কালাপানি, আন্দামানের সেলুলার জেল।
কালাপানি - যেখানে মানুষ জীবন্ত কবর পেত
তখন আন্দামান ছিল পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন এক নরক। যাকে সেখানে পাঠানো হতো, ধরে নেওয়া হতো সে আর কখনো মূল ভূখণ্ডে ফিরবে না।
শের আলীকে প্রথমে সেলুলার জেলে রাখা হলেও পরে তার ভালো আচরণের জন্য তাকে পোর্ট ব্লেয়ারের হোপটাউন এলাকায় কিছুটা খোলামেলা জায়গায় কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি কখনো বাবুর্চির কাজ করতেন, কখনো নাপিতের। এই স্বাধীনভাবে চলাফেরার কারণেই তিনি জেলের অন্য এক জগতের সাথে পরিচিত হন।
সেখানে তিনি দেখা পান ওয়াহাবি আন্দোলনের বন্দী, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের বেঁচে যাওয়া সৈনিক এবং বাংলার বিভিন্ন রাজনৈতিক বন্দীদের। তাদের মুখে তিনি শুনতেন কীভাবে ব্রিটিশরা পুরো ভারতবর্ষকে লুট করছে, কীভাবে মসজিদের আজান বন্ধ করা হচ্ছে, কীভাবে কৃষকের ফসল কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ব্রিটিশদের সম্পর্কে তার যে ক্ষোভ ছিল, তা ব্যক্তিগত প্রতিশোধ থেকে হয়ে উঠল জাতীয় চেতনা। তিনি বুঝতে পারলেন, তার শত্রু শুধু একজন নয়, পুরো ব্রিটিশ শাসন।
তিনি অপেক্ষা করতে লাগলেন। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতেন, যেন মৃত্যুর আগে দেশের জন্য বড় কিছু করে যেতে পারেন।
লর্ড মেয়ো - অহংকারের প্রতীক
অন্যদিকে, ১৮৬৯ সালে ভারতের ভাইসরয় হয়ে আসেন লর্ড মেয়ো, পুরো নাম রিচার্ড সাউথওয়েল বোর্ক। তিনি ছিলেন অত্যন্ত অহংকারী, কঠোর এবং আয়ারল্যান্ডে কৃষক বিদ্রোহ দমনে কুখ্যাত একজন শাসক।
তিনি ঠিক করলেন আন্দামানের জেল ব্যবস্থা কতটা উন্নত হয়েছে তা তিনি নিজে পরিদর্শন করবেন। তার এই সফর ছিল মূলত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের শক্তি প্রদর্শনের সফর।
১৮৭২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বিশাল লটবহর নিয়ে আন্দামানে আসেন। তার সাথে উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা, গভর্নর, পুলিশ প্রধান। চারপাশে কড়া নিরাপত্তা।
৮ ফেব্রুয়ারি, ১৮৭২ - সেই সন্ধ্যা
সারাদিন ধরে তিনি মাউন্ট হ্যারিয়েট পাহাড়, রস দ্বীপ এবং বিভিন্ন কয়েদি স্টেশন পরিদর্শন করেন। সন্ধ্যা ৭টার দিকে তিনি জেটিতে ফিরে আসেন। তার স্ত্রী লেডি মেয়ো জেটির কাছেই একটি স্টিম বোটে তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
সূর্য ডুবে গেছে, চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। শুধু মশালের আলো জ্বলছে। ভাইসরয় জেটি দিয়ে বোটের দিকে হাঁটছেন। তার দুই পাশে দুইজন উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ অফিসার, পেছনে সশস্ত্র দেহরক্ষী।
আর ঠিক সেই অন্ধকারের মধ্যেই দাঁড়িয়ে ছিলেন শের আলী। তিনি আগে থেকেই জানতেন আজ বড়লাট আসবে। তিনি তার লুঙ্গির ভাঁজে একটি ধারালো ছুরি এবং একটি নাপিতের ক্ষুর লুকিয়ে রেখেছিলেন।
নিরাপত্তার বেষ্টনী ভেদ করে তিনি বাঘের মতো লাফিয়ে পড়লেন লর্ড মেয়োর উপর। কেউ কিছু বোঝার আগেই তিনি উপর্যুপরি দুবার আঘাত করলেন। একটি আঘাত পিঠে, আরেকটি ঘাড়ে। এতটাই গভীর ছিল আঘাত যে লর্ড মেয়ো আর্তনাদ করে অগভীর পানিতে পড়ে গেলেন।
মুহূর্তের মধ্যে হুলস্থুল পড়ে গেল। রক্ষীরা শের আলীকে ধরে ফেলল এবং মাটিতে ফেলে বেধড়ক মারধর শুরু করল। লর্ড মেয়োকে রক্তাক্ত অবস্থায় তুলে বোটে নেওয়া হলো, কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে বোটেই তার মৃত্যু হয়।
ভারতের ইতিহাসে এই প্রথম, একজন কর্মরত ভাইসরয়, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভারতীয় প্রতিনিধি, একজন ভারতীয়ের হাতে নিহত হলেন।
জবানবন্দি ও শাহাদাত
ধরা পড়ার পর যখন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো, তিনি একটুও ভয় পাননি। ব্রিটিশ বিচারক যখন জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি কেন তাকে হত্যা করলে?"
শের আলী অত্যন্ত শান্ত গলায় জবাব দিয়েছিলেন, "আমি অনেক দিন ধরে আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলাম, যেন আমি কোনো বড় কাফেরকে মারতে পারি। আল্লাহ আজ আমার দোয়া কবুল করেছেন। আমি কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতার জন্য মারিনি, আমি আমার দেশের শত্রুকে মেরেছি। এটা খোদার হুকুম ছিল।"
ব্রিটিশরা ভেবেছিল এর পেছনে বড় কোনো ষড়যন্ত্র আছে। কিন্তু তদন্তে কোনো ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি একাই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
এরপর কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে মাত্র এক মাসের মধ্যে বিচার শেষ করা হয়। ১৮৭৩ সালের ১১ মার্চ আন্দামানের ভাইপার দ্বীপে তাকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
কেন আমরা তাকে মনে রাখিনি?
আজ আমাদের পাঠ্যবইয়ে আমরা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের গল্প পড়ি, যিনি পাহাড়তলী ইউরোপীয়ান ক্লাবে হামলা করে ব্যর্থ হয়ে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছিলেন। আমরা ক্ষুদিরাম বসুর গল্প পড়ি, যিনি কিংসফোর্ডকে মারতে গিয়ে ভুল করে দুজন নিরপরাধ ইংরেজ নারীকে মেরে ফেলেছিলেন।
তাদের আত্মত্যাগ অবশ্যই শ্রদ্ধার যোগ্য, তাদের সাহস নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু তারা তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যে সফল হতে পারেননি।
অথচ শের আলী আফ্রিদি, যিনি সফল হয়েছিলেন, যিনি করে দেখিয়েছিলেন যা আর কেউ পারেনি, তাকে আমরা ভুলে গেছি। কারণ কি তিনি মুসলিম ছিলেন বলে? কারণ কি তিনি পাঠান ছিলেন বলে? নাকি কারণ ব্রিটিশদের লেখা ইতিহাসে ইচ্ছা করেই একজন মুসলিম বীরকে জায়গা দেওয়া হয়নি, আর স্বাধীনতার পরেও আমরা সেই ব্রিটিশদের লেখা ইতিহাসই আঁকড়ে ধরে আছি?
এটাই আমাদের বড় ব্যর্থতা। আমরা আমাদের নিজেদের স্বর্ণালী ইতিহাস জানি না, আর যে ইতিহাস আমাদের জানানো হয়, তা অর্ধেক সত্য আর অর্ধেক মিথ্যা।
তথ্যলিপি
#simantosokun

No comments:
Post a Comment