Search This Blog

Sunday, September 13, 2026

ইতিহাসের বই আমাদের শেখায়, ভারত ভাগ হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। কিন্তু এটি আংশিক সত্য কথা।


ইতিহাসের বই আমাদের শেখায়, ভারত ভাগ হয়েছিল ১৯৪৭ সালে। কিন্তু এটি আংশিক সত্য কথা।

ভারত ভাগের আসল দলিল সই হয়েছিল তারও ২৭ বছর আগে, ১৯২০ সালের এক ধুলোমলিন বিকেলে।

নাগপুরের এক জনাকীর্ণ প্যান্ডেলে সেদিন প্রায় ৫ হাজার মানুষের সামনে একজন মানুষকে অপমান করে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

সেই মানুষটি কোনো পাল্টা চিৎকার করেননি। তিনি শুধু শান্ত পায়ে সভা ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন তিনি একা বের হননি, তার সঙ্গে বেরিয়ে গিয়েছিল ভারতের অখণ্ডতা।

কে ছিলেন সেই ব্যক্তি। আর কংগ্রেসের অন্দরমহলে ঠিক কী ঘটেছিল, যা একজন হিন্দু মুসলিম ঐক্যের দূতকে বানিয়ে দিল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় খলনায়ক।

১৯২০ সালের নাগপুর অধিবেশন-

সাল ১৯২০, ডিসেম্বর মাস। স্থান নাগপুর। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশন চলছে। প্যান্ডেলের নিচে প্রায় ৫ হাজার মানুষ। বাতাসে ধুলো আর চরম উত্তেজনা।

মঞ্চে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ। পরনে লন্ডনের সেভিল রো থেকে বানানো দামি স্যুট, চোখে মুখে আভিজাত্যের ছাপ। তিনি কথা বলতে চাইলেন, কিন্তু ৫ হাজার মানুষের জনসমুদ্র তাকে থামিয়ে দিল।

চারপাশ থেকে ধেয়ে আসছে টিটকারি, চিৎকার এবং অপমান।

মঞ্চে দাঁড়ানো লোকটির অপরাধ, তিনি মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে মহাত্মা ডাকতে অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন মিস্টার গান্ধী। অপমানে ও ক্ষোভে সেই ব্যক্তি মঞ্চ থেকে নেমে সোজা বেরিয়ে গেলেন অধিবেশন থেকে। আর কখনো তিনি কংগ্রেসে ফিরে আসেননি।

যিনি বেরিয়ে গেলেন, তিনি আর কেউ নন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

ঐতিহাসিকদের পর্যবেক্ষণ

অথচ মাত্র চার বছর আগেও এই কংগ্রেসেই তাকে ডাকা হতো হিন্দু মুসলিম ঐক্যের দূত বলে। ইতিহাসের পাতায় এই ঘটনাটি কেবল একজন নেতার দলত্যাগ নয়। ঐতিহাসিকরা বলেন, ১৯২০ সালের সেই নাগপুর অধিবেশনই আসলে ১৯৪৭ সালের দেশভাগের বীজ বুনে দিয়েছিল।

কিন্তু কেন কংগ্রেসের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রটি নিজের ঘরেই এমন কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন।

জিন্নাহর প্রারম্ভিক রাজনীতি ও লখনৌ চুক্তি

গল্পের শুরুটা কিন্তু এমন ছিল না। ১৯১৫ সাল পর্যন্ত জিন্নাহ ছিলেন কংগ্রেসের অন্যতম প্রধান নেতা। তিনি ছিলেন একজন পুরোদস্তুর সাংবিধানিক রাজনীতিবিদ। ধর্ম বা আবেগ নয়, তিনি বিশ্বাস করতেন যুক্তি আর তর্কে।

বিখ্যাত কবি ও রাজনীতিবিদ সরোজিনী নাইডু তখন জিন্নাহ সম্পর্কে বলেছিলেন, তিনি হিন্দু মুসলিম ঐক্যের প্রকৃত দূত, লম্বা, রাজকীয় এবং আমাদের ভবিষ্যতের আশা।

১৯১৬ সালে জিন্নাহর হাত ধরেই ঐতিহাসিক লখনৌ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগ, দুই মেরুর দুই দলকে তিনি এক মঞ্চে নিয়ে এসেছিলেন। তখন জিন্নাহর পরিচয় কোনো মুসলিম নেতা হিসেবে ছিল না। তিনি ছিলেন একজন ভারতীয় জাতীয়তাবাদী।

গান্ধীর উত্থান ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব

কিন্তু রাজনীতিতে খুব শীঘ্রই এমন এক ঝড় আসতে চলেছিল, যার জন্য জিন্নাহ নিজেও প্রস্তুত ছিলেন না। সেই ঝড়ের নাম মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী।

দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে গান্ধী ফিরলেন এক নতুন মন্ত্র নিয়ে। তার রাজনীতি ড্রয়িং রুমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি রাজনীতিকে নিয়ে গেলেন রাস্তায়, কৃষক আর শ্রমিকদের মাঝে।

জিন্নাহ ছিলেন যুক্তিবাদী ব্যারিস্টার, আর গান্ধী ছিলেন আধ্যাত্মিক পপুলিস্ট। জিন্নাহ কথা বলতেন ইংরেজিতে সংবিধান নিয়ে, আর গান্ধী কথা বলতেন অন্তরাত্মা ও ধর্ম নিয়ে।

বিখ্যাত ইতিহাসবিদ স্ট্যানলি ওলপার্ট তার জিন্নাহ অব পাকিস্তান বইয়ে এই সময়টাকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছেন, জিন্নাহ গান্ধীর রাজনীতিকে মনে করতেন বিশৃঙ্খল।

চরকা কাটা কিংবা ভজন গাওয়া, এগুলো জিন্নাহর কাছে রাজনীতি ছিল না। জিন্নাহ বিশ্বাস করতেন, সাধারণ জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন না করে রাস্তায় নামালে তা কেবল অরাজকতাই ডেকে আনবে।

কংগ্রেসের সাধারণ কর্মীরা ধীরে ধীরে গান্ধীর জাদুতে মুগ্ধ হতে শুরু করল, আর যুক্তিবাদী জিন্নাহ ক্রমশ একা হয়ে পড়লেন।

খিলাফত আন্দোলন ও ধর্মের রাজনীতি

কিন্তু আসল ফাটলটা ধরল যখন রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে আনা হলো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্কের খলিফাকে রক্ষার জন্য ভারতে শুরু হলো খিলাফত আন্দোলন।

গান্ধীজি দেখলেন, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বড় আন্দোলন গড়ে তুলতে হলে মুসলিমদের সমর্থন দরকার। তাই তিনি হিন্দুদের নেতা হয়েও এই ইসলামী আন্দোলনকে পূর্ণ সমর্থন দিলেন।

এখানেই জিন্নাহ থমকে গেলেন। তিনি ছিলেন একজন সেক্যুলার মানুষ। তিনি বিশ্বাস করতেন, ধর্মের সঙ্গে রাজনীতি মেশানো মানে বারুদের স্তূপে আগুন দেওয়া।

ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও লেখক জাসবন্ত সিং তার বইয়ে জিন্নাহর এই অসহায়তার কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, জিন্নাহ গান্ধীকে সাবধান করে বলেছিলেন, আপনি আগুনের সঙ্গে খেলছেন। মোল্লাতন্ত্রকে রাজনীতিতে ডেকে এনে আপনি এমন এক শক্তিকে জাগিয়ে তুলছেন, যাকে পরে আর নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না।

কিন্তু গান্ধীজি সেই সতর্কবার্তা শোনেননি।

সংবিধানের জনক বি আর আম্বেদকরও পরবর্তীকালে জিন্নাহর এই অবস্থানের প্রশংসা করে লিখেছিলেন, মিস্টার জিন্নাহ ছিলেন একমাত্র ব্যক্তি, যিনি খিলাফতের বিরোধিতা করার সাহস দেখিয়েছিলেন।

কংগ্রেস যখন মুসলিমদের খুশি করতে ব্যস্ত, তখন জিন্নাহ একা দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ধর্মীয় উন্মাদনা দিয়ে দেশের মুক্তি আসতে পারে না। কিন্তু কংগ্রেস তখন সংখ্যার লোভে জিন্নাহর যুক্তি শুনল না। তিনি নিজ দলেই হয়ে পড়লেন বহিরাগত।

চূড়ান্ত অপমান ও বিদায়

অবশেষে এলো সেই দিন, ১৯২০ সালের ডিসেম্বর মাস, নাগপুর অধিবেশন। গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব আনলেন। জিন্নাহ এর বিরোধিতা করতে মঞ্চে উঠলেন। তিনি চাইলেন আবেগের বদলে যুক্তি দিয়ে বোঝাতে।

মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে জিন্নাহ বললেন, আমি মিস্টার গান্ধীর প্রস্তাবের বিরোধিতা করছি।

মুহূর্তের মধ্যে হাজার হাজার মানুষ চিৎকার করে উঠল, মিস্টার গান্ধী নয়, মহাত্মা বলো, মহাত্মা বলো।

জিন্নাহ থামলেন। কিন্তু তিনি ভিড়ের কাছে মাথা নোয়ানোর পাত্র নন। তিনি আবার বললেন, আমি মিস্টার গান্ধীর কথা বলছি।

এবার ভিড় আরও হিংস্র হয়ে উঠল। কেউ জুতো ছুড়ল, কেউ বা গালি দিল।

জিন্নাহর প্রথম জীবনীকার হেক্টর বলিথো এই দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, এটি কেবল একটি রাজনৈতিক হার ছিল না। এটি ছিল জিন্নাহর জন্য চূড়ান্ত ব্যক্তিগত অপমান।

জিন্নাহ কোনো পাল্টা চিৎকার করলেন না। তিনি বক্তব্য শেষ করে মঞ্চ থেকে নেমে সোজা অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করলেন।

বলা হয়, জিন্নাহর সঙ্গে সেদিন তার স্ত্রী রুট্টি জিন্নাহও ছিলেন। তারা দুজন যখন ধীর পায়ে সেই কোলাহলপূর্ণ প্যান্ডেল ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন কংগ্রেসের সঙ্গে জিন্নাহর সম্পর্ক চিরতরে শেষ হয়ে যাচ্ছিল।

স্বেচ্ছা নির্বাসন ও উপসংহার

সেদিন রাতেই জিন্নাহ নাগপুর থেকে বোম্বাইয়ের ট্রেন ধরেন। সাংবাদিকরা যখন তাকে প্রশ্ন করলেন, তিনি বিষণ্ণ মনে বলেছিলেন, আমি কংগ্রেস এবং গান্ধীর সঙ্গ ত্যাগ করলাম, কারণ আমি জনতার উন্মাদনা দিয়ে রাজনীতি করায় বিশ্বাসী নই।

এরপর জিন্নাহ প্রায় এক দশকের জন্য নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে লন্ডনে চলে গেলেন স্বেচ্ছা নির্বাসনে। কিন্তু সেই ১৯২০ সালের অপমান তিনি কোনোদিনও ভুলতে পারেননি।

ঐতিহাসিক আয়েশা জালাল তার বিশ্লেষণে বলেন, জিন্নাহর কংগ্রেস ত্যাগ ছিল যুক্তিবাদী রাজনীতির বিদায়। জিন্নাহ সাম্প্রদায়িক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন অতিরিক্ত মাত্রায় সেক্যুলার, যিনি গান্ধীর ধর্মীয় পপুলিজমের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারেননি।

ট্র্যাজেডি হলো, যে মানুষটি ধর্মকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন, সেই মানুষটিকেই ইতিহাসের ফেরে পড়ে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ করতে হলো।

নাগপুরের সেই মঞ্চে যদি জিন্নাহকে কথা বলতে দেওয়া হতো, তাকে অপমান না করা হতো, তবে হয়তো ভারতের ইতিহাস অন্যরকম হতো।

১৯২০ সালে কংগ্রেস জিন্নাহকে কোণঠাসা করেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই কোণঠাসা বাঘটিই ফিরে এসে ১৯৪৭ সালে মানচিত্র ছিঁড়ে তার জবাব দিয়েছিলো।

-সাদিক রহমান।

#fyp #viral #trending #reach #foryou #followers #following #everyone #highlights #writer #writing

No comments:

Post a Comment